লাইট ক্যামেরা অ্যাকশন...ক্যামেরার সামনে আর দাড়াবেন না বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক। করবেন না অভিনয়। রাজ্জাক ভক্তরা আর নতুন করে দেখবেন না তাদের প্রিয় অভিনেতার মুখ।

নায়করাজের মৃত্যুতে শোকাহত চলচ্চিত্র পরিবার। রাজ্জাকের মৃত্যুতে শোকাহত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। অভিনয় জীবনে অনেক শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন এই অভিনেতা। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক।

ঢালিউড কিংবা টালিউড। দুই বাংলাই খ্যাতি অর্জন করেছেন প্রয়াত নায়ক রাজ রাজ্জাক। ২১ আগষ্ট (সোমবার) রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, সন্তানসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

এই মহানায়কের যে শূন্যতা তা আর পূরণ হবে না বলে মনে করছেন অনেক প্রবীণ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। এমনকি অনেকে বলছেন নায়করাজের মৃত্যুর সাথে সাথে রুপালী পর্দার অর্ধেক ছিড়ে গেছে। যা আগামী ১’শ বছরেও পূরণ হবার না। একজন অবিভাবককে হারিয়ে শোকে কাতর পুরো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি। সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন মহানায়ক রাজ্জাক।

ষাটের দশকের মাঝের দিকে তিনি চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ষাটের দশকের বাকি বছরগুলোতে এবং সত্তরের দশকেও তাঁকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের প্রধান অভিনেতা হিসেবে বিবেচনা করা হত। রাজ্জাক চলচ্চিত্র পরিচালনায়ও সফলতা অর্জন করেন। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র অনন্ত প্রেম ১৯৭৭ সালে মুক্তি পায়। তার পরিচালিত সর্বশেষ চলচ্চিত্র আয়না কাহিনী মুক্তি পায় ২০১৪ সালে। তিনি সব মিলিয়ে প্রায় ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন।

রাজ্জাক ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাড়ি জমান। প্রথমদিকে রাজ্জাক তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে ‘ঘরোয়া’ নামের ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় পান। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি আব্দুল জব্বার খানের সাথে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। সালাউদ্দিন প্রোডাকশন্সের তেরো নাম্বার ফেকু ওস্তাগড় লেন এবং কার বউ, ডাক বাবু, আখেরী স্টেশন-সহ আরও বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন।

১৯৯০ সাল পর্যন্ত বেশ দাপটের সাথেই ঢালিউডে সেরা নায়ক হয়ে অভিনয় করেন রাজ্জাক। এর মধ্য দিয়েই তিনি অর্জন করেন নায়করাজ রাজ্জাক খেতাব। অর্জন করেন একাধিক সম্মাননা। এছাড়াও, রাজ্জাক জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে কাজ করছেন।

নায়করাজ রাজ্জাক প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন ‘কি যে করি’ ছবিতে অভিনয় করে। পাঁচবার তিনি জাতীয় সম্মাননা পান। ২০১৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনি আজীবন সম্মাননা অর্জন করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কার পেয়েছেন অসংখ্যবার।

বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্রে খুব কমই অভিনয় করছেন নায়করাজ রাজ্জাক। শুধু নায়ক হিসেবেই নয়, পরিচালক হিসেবেও বেশ সফল। ‘আয়না কাহিনী’ ছবিটি নির্মাণ করেন রাজ্জাক। নায়ক হিসেবে নায়করাজ প্রথম অভিনয় করেন জহির রায়হান পরিচালিত ‘বেহুলা’ ছবিতে। এতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন সুচন্দা।

‘অবুঝ মন’, ‘আলোর মিছিল’ ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘রংবাজ’, ‘বাবা কেন চাকর’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘জীবন থেকে নেওয়া’ ‘পিচঢালা পথ’, ‘অশিক্ষিত’, ‘বড় ভালো লোক ছিল’সহ অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করা রাজ্জাক সর্বশেষ অভিনয় করেছেন ছেলে বাপ্পারাজ পরিচালিত ‘কার্তুজ’ ছবিতে।

চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ ডাকলে তাতে সাড়া দিতেন ‘বেহুলা’, ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘এতটুকু আশা’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’, ‘ওরা ১১ জন’, ‘অবুঝ মন’-এ অভিনয় করা রাজ্জাক। আমৃত্যু এই শিল্পের সঙ্গেই থাকতে চাওয়ার কথা জানিয়ে একসময় বলছিলেন, ‘আমি রাজ্জাক হয়তো অন্য কোনো চাকরি করতাম অথবা ঘুরে বেড়াতাম। কিন্তু ছোটবেলার অভিনয় প্রচেষ্টাকে আমি হারাতে দিইনি। আমি নাটক থেকে চলচ্চিত্রে এসেছি। সবাই আমাকে চিনেছে। পেয়েছি সাফল্যও। বাংলার মানুষজন আমাকে একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবেই দেখেন ও আমাকে ভালোবাসেন। আজকে আমার যা কিছু হয়েছে, সবই এই চলচ্চিত্রশিল্পের কল্যাণে।

রাজ্জাক এ-ও বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের ছোট একটি দেশ হতে পারে, তারপরও এই দেশের একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে আমি গর্ববোধ করি। যাঁদের জন্য আমি রাজ্জাক হয়েছি, আমি সব সময় তাঁদের কাছাকাছি থাকতে চাই।

এই মহানায়কের শেষ বিদায়ে ভারি হয়ে উঠে এফডিসির আকাশ। সহকর্মীরা এই কিংবদন্তির বিদায় মেনে নিতে পারছেন না। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সবাই। প্রবীণ থেকে তরুণ। সকল অভিনেতা-অভিনেত্রীর আদর্শ ছিলেন নায়করাজ। মহানায়কের শেষ বিদায়ে এফডিসি চত্ত্বর শোকের ছায়া নেমে আসে।

জানাজার নামাজের শেষে এফডিসি চত্ত্বরে কথা হয় প্রবীণ অভিনেতা আহমেদ শরীফ, জনপ্রিয় অভিনেত্রী সিমলা ও জনপ্রিয় অভিনেতা সুব্রত বড়ুয়ার।

আহমেদ শরীফ বলেন, ‘রাজ্জাক ভাই চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। আর আমি তখন সাধারণ সম্পাদন ছিলাম। তিনি আমাকে সব সময় ভালো পরামর্শ দিতেন। আমি শুধু এতটুকু বলব, আল্লাহ রাজ্জাক ভাইকে জান্নাতে জায়গা করে দিন। আপনারাও তার জন্য দোয়া করবেন। রাজ্জাক ভাই আজ আমাদের মাঝে নেই এটা ভাবতেই পারছি না। (এ কথা বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন)। রাজ্জাক ভাই এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন এটা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। তারপরও তার মৃত্যু বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। তিনি ঘরে বসে দুটো কথা বললেও সেটা আমাদের মাথার মণি হয়ে থাকত। চলচ্চিত্রের দুঃসময়ে তার কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল’।

অভিনেত্রী সিমলা বলেন, ‘নায়করাজ রাজ্জাক স্যার ছিলেন আমাদের অবিভাবক। ওনার চলে যাওয়া আমি মানতে পারছি না। আমাদের অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি কখনও পুষাবে না। আমার সৌভাগ্য হয়নি এই মহানায়কের সাথে একই ফ্রেমে কাজ করার। আমি রাজ্জাক স্যারের সাথে টিভি পর্দার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলাম। ওনাকে নিয়ে বলার মত যোগ্যতা আমার নাই। আমি ওনার বিদেহী আত্ত্বার মাগফিরাত কামনা করছি’।

অভিনেতা সুব্রত বড়ুয়া বলেন, ‘রাজ্জাক ছিলেন আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র। আমরা একজন নেতা হারালাম। আমরা মর্মাহত, শোকাহত। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য অনেক কিছু করেছেন। শেষদিন পযর্ন্ত আমাদের চলচ্চিত্র নিয়ে তিনি ভেবেছেন’।