“স্কুল পড়ুয়া কিশোরী পাঁচ বোনের পছন্দের নায়ক ছিলেন সালমান শাহ্। সেইসময়ে তাঁরা টিফিনের টাকা দিয়ে প্রিয় নায়কের ভিউকার্ড কিনে ফটো এ্যালবামে রাখতেন খুব যতনে!”
সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমা যখন মুক্তি পায় তখন এই সিনেমার ব্যাপক জনপ্রিয়তার জোয়ারে ভাসছে পুরো বাংলাদেশ। সকলেই দলবেঁধে সিনেমা হলে যাচ্ছেন, এবং ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমায় প্রথমবারের মতো অভিনয় করা সালমান শাহ্-মৌসুমীর মনকাড়া অসাধারণ অভিনয় দেখে এসে আবেগ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। ইয়াসরীব আরা গণি তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন। বড় বোন জেসমীন আরা গণিসহ বাবা-মায়ের কাছে আকুতি জানালেন, তাঁরা হলে গিয়ে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমা দেখতে চান। বাবা-মা তাঁদের এই আকুতি সেদিন উপেক্ষা করেননি। তাঁদেরকে হলে গিয়ে এই সিনেমা দেখার অনুমতি দিয়ে দেন।
হলের পর্দায় তাঁরা ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমা উপভোগ করেন। এবং সালমান শাহ্-মৌসুমী জুটির অসাধারণ অভিনয় দেখে মুগ্ধও হয়েছেন তাঁরা! বিশেষ করে এই সিনেমার শেষের দৃশ্য তাঁদের মনে গেঁথে যায়। এভাবেই তাঁরা সালমান শাহ্’র ভক্ত হয়ে যান।
ইয়াসরীব আরা গণির আপন ফুফা সেই সময়ে এফডিসির কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি যখন গাইবান্ধায় তাঁদের বাড়ি বেড়াতে যেতেন, তখন তাঁরা ফুফার নিকট সালমান শাহ্’র বিষয়ে গল্প শুনতে চাইতেন। এবং সালমান শাহ্ যে তাঁদের পছন্দের নায়ক, তাও নির্দ্বিধায় ফুফার নিকট প্রকাশ করতেন। বড় বোন জেসমীন আরা গণি সালমানের প্রতি তাঁদের ভালোলাগার কথা জানিয়ে একটি চিঠিও লিখেছিলেন সালমান শাহ্কে উদ্দেশ্য করে। এবং তাঁর লেখা সেই চিঠি যেন সালমানের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়, ফুফার হাতে চিঠিটা ধরিয়ে দিয়ে এই কথাটাই বললেন জেসমীন আরা গণি। এফডিসির একজন কর্মকর্তা হওয়ায় তাঁদের লেখা চিঠিটা ফুফা সরাসরি সালমান শাহ্’র হাতেই তুলে দেন। এবং সালমানকে তিনি বলেন তাঁর এই কিশোরী ভক্তদের কথা। শুনলে অবাক হবেন। চিঠি পড়ে সালমান শাহ্ তাঁর এই ভক্তদের চিঠির জবাবে নিজ হাতেই একটি চিঠি লিখেন। চিঠির সাথে তাঁর একটি ছবি সংযুক্ত করে দেন সালমান। পরবর্তীতে ফুফার মাধ্যমেই ভক্তদেরকে লেখা সালমানের সেই চিঠি পৌঁছে যায় তাঁদের হাতে। প্রিয় নায়কের নিজ হাতে লেখা চিঠি ও ছবি পেয়ে খুশিতে তাঁরা আত্মহারা! সালমানের লেখা সেই চিঠি কতবার যে পড়েছেন তাঁর হিসেব অজানা।
ইয়াসরীব আরা গণি ও তাঁর বোনেরা যে স্কুলে পড়াশুনা করতেন তাঁর পাশেই ছিল ষ্টেশনারীর দোকান। সেখানে সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ভিউকার্ডও পাওয়া যেত। স্কুলে টিফিন খাওয়ার জন্য বাবা তাঁদেরকে যে টাকা দিতেন, সেখান থেকে টাকা জমিয়ে তাঁরা প্রিয় নায়ক সালমানের ভিউকার্ড কিনতেন। আর স্টুডিও থেকে ফটো এ্যালবাম কিনে এনে ভিউকার্ডগুলো খুব যত্নে রেখে দিতেন। যখন প্রিয় নায়ককে দেখতে ইচ্ছে করত, পড়ার টেবিলের ড্রয়ার থেকে ফটো এ্যালবামে থাকা সালমানের ভিউকার্ডগুলো বের করে দেখতেন।
একদিন বিকেলে হঠাৎ করেই তাঁরা জানতে পারলেন সালমান শাহ্ মারা গেছেন! এমন অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদ শুনে তাঁরা সবাই শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সেই ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বিকেলবেলায়। কিছুতেই যেন তাঁদের বিশ্বাস হচ্ছিলো না যে প্রিয় নায়ক সালমান শাহ্ আর এই দুনিয়াতে নেই! কিন্তু এই নির্মম সত্যকে যে মেনে নিতেই হয়েছে অন্যসব ভক্তদের মতো। অনেক প্রিয় এই নায়কের অকাল মৃত্যুতে তাঁদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন কিছুটা হলেও ব্যাহত হয়েছিলো। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করতে ইচ্ছে করত না, ঘুম আসত না। এমন কি পড়াশুনায়ও মন দিতে পারেননি কিছুদিন। চোখ বন্ধ করলেই প্রিয় নায়ক সালমানের মায়াভরা মুখটি ভেসে উঠত চোখের সামনে। সালমান শাহ্ জীবিত নেই, এই কথা মনে হলেই বুকের ভেতরে কেমন যেন হাহাকার অনুভব করতেন। আর তখন ফটো এ্যালবামে রাখা সালমানের সেই ভিউকার্ডগুলো বের করে বারবার দেখতেন সবাই মিলে।
পড়াশুনা শেষ হতেই বিয়ে হয়ে যায় ইয়াসরীব আরা গণির ও তাঁর বড় এবং মেঝো বোনের। বাবার বাড়ি ছেড়ে স্বামীর বাড়িতে চলে যান তাঁরা। বড় তিন বোন এখন যার যার স্বামী, সন্তান ও সংসার নিয়ে খুব ব্যস্ততম জীবন পার করছেন। আর ছোট দুই বোনের একজন ইঞ্জিনিয়ার ও একজন ডাক্তারি পড়ছেন। দেখতে দেখতে অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে ঠিকই। তবে তাঁদের টিফিনের টাকায় কেনা প্রিয় নায়ক সালমান শাহ্’র সেই ভিউকার্ডগুলো বাবার বাড়িতেই রয়ে গেছে। বিশেষ কোনো দিবস বা অনুষ্ঠান উপলক্ষে তাঁরা পাঁচ বোন যখন বাবার বাড়িতে একত্রে মিলিত হন। তখন আবার সেই ভিউকার্ডের বিশাল সংগ্রহ তাঁরা সবাই বের করে দেখেন। ফিরে যান ফেলে আসা কৈশোরের আনন্দে রাঙানো সেই রঙিন দিনগুলোতে।
কয়েকমাস আগে আমাদের “সালমান শাহ্ স্মৃতি সংসদ” -এর ফেসবুক পেজের এক পোস্টে ইয়াসরীব আরা গণি কমেন্ট করে জানান, তাঁদের কাছে নাকি সালমান শাহ্’র ভিউকার্ড আছে একহাজারেরও বেশি। তিনি সেই ভিউকার্ড “সালমান শাহ্ স্মৃতি সংসদ”কে দিতে চান। এর পরেই আমি তাঁর সাথে ও তাঁর স্বামী চলচ্চিত্র নির্মাতা, আবাসন ব্যবসায়ী খন্দকার সুমন সাহেবের সাথে এই বিষয়ে যোগাযোগ করি। তাঁরা আমাকে আশ্বস্ত করে বলেন, সালমানের ভিউকার্ডের এই বিশাল সংগ্রহ আমার হাতে তুলে দেওয়া হবে। ইয়াসরীব আরা গণি আপু ফেসবুকে ইনবক্স করে আমাকে বলেন, সালমানের এই ভিউকার্ডগুলো তাঁদের চেয়েও বেশি যত্নে নাকি আমার কাছে থাকবে। তবে ভিউকার্ডগুলো তাঁর বাবার বাড়িতে আছে। সেখান থেকে এনেই তবে দিতে পারবেন।
গত রোজার ঈদে স্বামী, সন্তানসহ তাঁরা বাবার বাড়ি গাইবান্ধাতে ঈদ উদযাপন করার জন্য যান। আর ঢাকায় ফেরার সময় সাথে করে নিয়ে আসেন আমাদের সকলের প্রিয় নায়কের দুর্লভ কিছু ভিউকার্ড। কয়েকদিন আগেই তাঁরা তাঁদের সংগ্রহে থাকা এই ভিউকার্ডগুলো আমার হাতে তুলে দেন। ইয়াসরীব আরা গণির স্বামী সুমন ভাইয়ের সাথে কথা বলেই জানতে পারলাম সালমানের এই পাঁচ ভক্তের কথা ও তাঁদের ভিউকার্ড সংগ্রহের নেপথ্য কথা। সেদিন সুমন ভাইয়ের সাথে নানা বিষয়ে অনেক কথা হয়েছে। দুপুরের খাবার একসাথেই খেয়েছি। এরপরে তাঁর কথা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আমি শুনছিলাম। অসম্ভব গুণী ও বিনয়ী একজন মানুষ। তিনিও সালমান ভক্ত। সালমানকে পছন্দ করতেন খুব। এমনকি এই নায়কের স্টাইলও তিনি সেইসময়ে ফলো করতেন। তাঁর বন্ধুরাও সালমানের স্টাইল ফলো করতেন। আমাদের কথাবার্তা চলাকালীন সময়ে সুমন ভাইয়ের স্ত্রী ইয়াসরীব আরা গণি তাঁদের ছোট মেয়ে থিয়াকে নিয়ে চলে এসেছেন তাঁদের আবাসন ব্যবসার অফিসে। তাঁর সাথেও সালমান শাহ্ বিষয়ে কথা হল কিছুক্ষণ। তবে তিনি খুব আফসোস করলেন এই জন্য যে, বেশকিছু ভিউকার্ড, বড় বড় ছবি ছিল যা বাড়ির কাজ করানোর সময় নষ্ট হয়ে গেছে। তাঁদের চিঠির উত্তরে সালমান শাহ্ নিজ হাতে যে চিঠি ও ছবি তাঁদেরকে দিয়েছিলেন, তা তিনি আমাকে দিতে পারেননি। কারন, সেই চিঠি তাঁর ছোট বোনের কাছে আছে। তিনি সিলেটে বসবাস করেন। তবে খুব শিগ্রই সেই চিঠি স্ক্যান করে আমার হাতে তুলে দিবেন বলেছেন।
আমি খুব অবাক হয়েছি ফটো এ্যালবাম ও এ্যালবামে থাকা ভিউকার্ডগুলো দেখে। ২৩/২৪ বছর আগের এসব সংগ্রহ এখনো নতুনের মত ঝকঝকে! দেখেই বুঝেছি প্রিয় নায়কের এই দুর্লভ স্মৃতি তাঁরা কতটা যত্নে রেখেছিলেন। “সালমান শাহ্ স্মৃতি সংসদ” ও সালমানের সকল ভক্তদের পক্ষ থেকে এই পাঁচ বোনকে স্যালুট জানাই। আপনারা সালমানের এই স্মৃতি খুব যত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছেন বলেই আজ তা আমরা দেখতে পেলাম। এবং এই ভার্চুয়াল জগতের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মও দেখতে পারবে আমাদের বাংলা সিনেমার কালজয়ী মহানায়ক সালমান শাহ্কে। এবার আমি সালমান শাহ্কে নিয়ে একটি ওয়েবসাইট ও ডকুমেন্টারি অবশ্যই নির্মাণ করবো। কারন, আমি চাই এই অনলাইন যুগে সালমান শাহ্ ভক্তরা ও তরুণ প্রজন্ম এক ক্লিকে এক স্থান থেকেই কালজয়ী এই মহানায়কের বিষয়ে কিছুটা হলেও ধারণা পাক।





