ভদ্রপাড়ার কথা জানি না, আমাদের পাড়ায় ভাগাভাগি করে পশু কোরবানি দেওয়ার চল আছে। গবাদি পশুর চড়া দাম অধিকাংশ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে থাকায়, তারা শরিক হয়ে কোরবানি দিয়ে থাকেন।
এক্ষেত্রে কোরবানি খরচা যায় মাথাপিছু ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। যা হোক, মাথাপিছু এই খরচা যোগ করে ২০১৫ সালে দেখা গিয়েছে শুধুমাত্র পশু কোরবানির পেছনে বাংলাদেশিরা খরচ করেছে ১৯ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। প্রতি বছরই আমাদের দেশে বাড়ে পশুর চাহিদা। ২০১৬ পেরিয়ে এখন আমরা ২০১৭ এর ঈদ-উল-আজহা তথা কোরবানির ঈদের দোরগোড়ায়।
এদিকে দেশের বন্যা পরিস্থিতির অবস্থা ভয়াবহ। দরকার প্রচুর পরিমাণ ত্রান সহায়তা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় তথ্য অনুযায়ী এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩ লাখ মানুষ! মন্ত্রণালয়ের সচিবের চলতি দায়িত্বে থাকা গোলাম মোস্তফার প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ ৫২ হাজার পরিবার আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছে ৩৭ জন। এখন পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে ১ হাজার ৫৯৯টি। এগুলোতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা ৪ লাখ ১১ হাজার।
সুতরাং মানবতা ও ধর্ম কর্ম-এই দুই বিষয়ে প্রয়োজন নগদ অর্থ। সমস্যা হচ্ছে- কোন খাতকে প্রাধান্য দিয়ে অর্থ ব্যয় করবে মানুষ? কোনটির প্রাধান্য বেশি? এ নিয়ে শুরু হয়েছে বিতণ্ডা।
অভিনেত্রী সোহানা সাবা তার নিজ ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কোরবানি ও বন্যার্তদের সহায়তা বিষয়ক একটি স্ট্যাটাসে লিখেছেন- ‘কোরবানি ঈদ সবার জন্যেই খুব আনন্দের। আমারও। নিজের অর্জিত টাকার কিছু অংশ দিয়ে গরু, খাসি, উট কোরবানি দিয়ে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেই সেই মাংস। সত্যিই আনন্দের এই বণ্টনে শরিক হতে পারাটা। কিন্তু এবার ভাবুন তো- বন্যা কবলিত মানুষদের কি পরিমাণ সহায়তা প্রয়োজন? আমরা কি এক বেলার মাংসের স্বাদ না দিয়ে বন্যার ত্রাণ নিয়ে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারি না? একবার ভেবে দেখুন তো’।
স্ট্যাটাস প্রসঙ্গে প্রিয়.কম যোগাযোগ করেছিল সোহানা সাবার সঙ্গে। তার কাছে প্রশ্ন ছিল, ‘আপনি কি কোরবানি না দিয়ে বন্যার্তদের সহায়তা করার কথা বলছেন? নাকি, কোরবানি দিয়ে সেই মাংস বন্যার্তদের বিলিয়ে দিতে বলছেন’? উত্তরে তিনি বলেন- ‘না দিয়ে সেই টাকা বন্যার্তদের দিতে বলেছি’।
অন্যদিকে অভিনেতা আদনান ফারুক হিল্লোল তার নিজ ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন- ‘এবার সকলের কোরবানির টাকা ত্রাণ তহবিলে প্রদান বাধ্যতামূলক করা বড় জরুরী মনে হচ্ছে’।
তার স্ট্যাটাসের নিচে মিজান দেওয়ান নামক একজন কমেন্ট করেছেন- ‘কোরবানীর প্রতি অনীহা কেন? যার কোরবানির সামর্থ আছে সে আলাদা করে ত্রাণ তহবিলেও দান করার ক্ষমতা রাখে। সুতরাং ইসলামের আইনকে লংঘন করার পরামর্শ দিয়ে উদার সাজতে চাওয়া ঠিক না।
মিজানের কমেন্টের প্রতি উত্তরে আদনান ফারুক হিল্লোল লিখেছেন- ‘আপনার হয়তো আছে, কিন্তু আমার নেই। আমার যে কোন একটি করার সামর্থ্য আছে। এখন কোরবানি দেবো না আল্লাহর বান্দা বাঁচানোর জন্য কাজ করব?
অভিনেত্রী শামীমা তুষ্টি ফেসবুকে লিখেছেন- ‘সামনে কোরবানির ঈদ। কোরবানি আপনারা অনেকেই দেবেন। কোরবানিও ত্যাগ, এটাও। আচ্ছা, কোরবানি না দিয়ে সে টাকাটা দুর্গতদের জন্য ব্যবহার করা যায় না? এবং এই ত্যাগ যার দেখার কথা, তিনি নিশ্চয় সেটা দেখবেন ও আমলে নেবেন। আর, যারা কোরবানি দেবেনই, তারাও অন্যান্য খরচ বাঁচিয়ে আপনার তরফ থেকে সহায়তার হাত প্রশস্ত রাখুন। মানুষের পাশে থাকুন। এদিকে বন্যার ভয়াবহ তাণ্ডব। সম্ভবত স্মরণকালের সবচেয়ে নির্মম বন্যা আমরা দেখতে যাচ্ছি। একবার তাদের কথা ভাবুন, যারা সরাসরি আক্রান্ত হবেন। আমরা যখন ঈদের আনন্দে, তখন অসংখ্য মানুষ থাকবে পানিবন্দি, দীর্ঘ অনাহারে’। (এর সঙ্গে তিনি যুক্ত করেছেন ফোন নম্বর। অযাচিত বিড়ম্বনা এড়াতে তার স্ট্যাটাসে দেওয়া ফোন নম্বর এখানে দেওয়া হয়নি)
যা হোক, ‘মানবতা ও কোরবানি’ প্রসঙ্গে প্রিয়.কমের ইসলাম বিভাগের প্রধান মাওলানা মিরাজ রহমান একটি বক্তব্য দিয়েছেন।
মাওলানা মিরাজ রহমান বলেছেন- ‘কোরবানি ও বন্যাদুর্গতদের সহায়তা- এ দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ, দুটি বিষয়েই মানুষের সম্পৃক্ত থাকা উচিত। কোরবানি ইসলামের একটি ওয়াজিব বিধান। যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব তাকে অবশ্যই কোরবানি দিতে হবে বা এই বিধান পালন করতে হবে। কেউ যদি মনে করেন যে, ওয়াজিব কোরবানি বাদ দিয়ে সেই টাকাটা বন্যাগ্রস্ত মানুষকে বা কোনো অভাবীকে দান করবেন, সেটা মোটেও সঠিক হবে না এবং এটি ইসলামি হুকুম পরিপন্থী হবে। যদি কারো উপর কোরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকে এবং তিনি সেই ওয়াজিব কোরবানি আদায় না করে টাকা বন্যার্তদের দান করেন বা অভাবীকে দিয়ে দেন, তবে সেই দানের দ্বারা তিনি সওয়াব পাবেন কিন্তু কোরবানি করার দায়িত্ব পালিত হবে না। এই ক্ষেত্রে করণীয় কী?
করণীয় হলো- সর্বনিম্ন পরিমাণ অর্থ খরচ করে কোরবানির ওয়াজিব হুকুম আদায় করতে হবে। এর বাইরে যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী বন্যাগ্রস্ত বা অভাবী মানুষকে সহযোগিতা করবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- কারো অভ্যাস তিনি প্রতি বছর এক লাখ টাকা মূল্য মানের গরু কুরবানি করেন, তার উচিত হবে এবার তিনি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে কোরবানির ওয়াজিব হুকুম আদায় করবেন এবং বাকি টাকাটা বন্যাগ্রস্ত বা অভাবীদের দান করে দেবেন। এই দানকে ইসলাম শুধু অনুমোদনই করেননি বরং ভালো বলেছে। এছাড়া যিনি দুটি বা তিনটি গরু কোরবানি করতেন, তিনি এবার একটি গরু কোরবানি করবেন এবং বাকি টাকা দান করে দিবেন। আর কারো যদি বেশি টাকা বা বেশি পরিমাণ গরু কোরবানি করার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে তিনি কী করবেন? সামর্থ্য কম থাকা মানুষের ক্ষেত্রেও একই বিধান। মোটকথা হলো, কোরবানির ওয়াজিব বিধানটি সবাই সর্বনিম্ন যত টাকায় সম্ভব আদায় করবেন এবং বাকি টাকা বন্যাগ্রস্ত মানুষকে দান করে দেবেন। আরো একটি কাজ করা যেতে পারে সেটা হলো- আমরা যারা কোরবানি দেই সবাই তো কোরবানির গোশত বা মাংস দান করি। এবার আমরা কোরবানির গরুর মাংস বা গোশত বন্যাগ্রস্ত মানুষের মাঝে বেশি পরিমাণে দান করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে পারি’।





