আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণা করবে ঢাকার পঞ্চম জজ আদালত। এ মামলায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সাজা হবে কী হবে না এ নিয়ে আলোচনা এখন সর্বত্র! এছাড়া রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা হলে কীভাবে চলবে বিএনপি? এ প্রশ্নটি দলটির তৃণমূল থেকে হাইকমান্ড নেতাকর্মীদের মধ্যে এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারপার্সনের অনুপস্থিতিতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান দলের নেতৃত্ব দেবেন। কিন্তু তিনিও বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। শিগগিরই তার দেশে ফেরার নেই কোনো সম্ভাবনাও।
অন্যদিকে দলটির একটি অংশ চাইছে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানকে নেতৃত্বে আনার। তবে দলের হাইকমান্ডের একটি অংশ তা মানতে নারাজ। ফলে জোবাইদার নেতৃত্বে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
তাহলে কে বা কারা পাচ্ছেন খালেদা জিয়ার অবর্তমানে বিএনপির নেতৃত্ব? এমন প্রশ্নের জবাবে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বলছেন, তারা এ বিষয়ে কোনো চিন্তা ভাবনা করতে প্রস্তুত নয়। আর যদিও এমন কিছু হয়, তাহলে এককভাবে কারো ওপর সে দায়িত্ব দেওয়া হবে না সেটা প্রায় শতভাগ সত্য।
এ বিষয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ অর্থসূচককে বলেন, এ মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হবে, তা ভাবছি না। কারণ এটি একটি মিথ্যা মামালা। আমরা মনে করি, চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বেকসুর খালাস পাবেন। বিশ্বাস করি না, বিশ্বাস করতেও চাই না উনাকে দণ্ড দেবে। যে মামলার ওপর ভিত্তি করে মামলার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেটা দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষই অবগত আছে। রায় কী হবে সেটা আদলাত ভালো জানে।
দলটির অপর স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহাবুবুর রহমান বলেন, সত্যি কথা বলতে কি দেশ এখন কোন দিকে এগুচ্ছে তা বলা মুশকিল। তা না হলে বাংলাদেশের তিন বারের প্রধানমন্ত্রী তাকে কারগারে যেতে হবে এমন প্রশ্ন জনমনে উঠবে কেন? তবে আমি বিশ্বাস করি বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এ মামলার খালাস পাবেন।
দলের পরবর্তী নেতৃত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, আর দলের নেতৃত্ব এটা সময়েই বলে দিবে। তবে ওই সময় গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা নেই। শুধু রুটিন কর্মকাণ্ড চালানো হবে। আর তা সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হবে জ্যেষ্ঠ কয়েক নেতার ওপর।
এদিকে দলটির সিনিয়র যুগ্ন মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অর্থসূচককে জানান, আজ বিকেলে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলবেন। বিকেল ৫ টায় খালেদা জিয়ার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তীতে দলটির স্থায়ী কমিটির সঙ্গে বৈঠকে বসবেন তিনি। রাত সাড়ে ৮ টায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলন বিষয়ে জানতে চাইলে রিজভী বলেন, বিএনপি সব সময় ইতিবাচক। আমরা বিশ্বাস করি রায়ে খালেদা জিয়া খালাস পাবেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে সবেই সম্ভব। গত কয়েক বছরের রেকর্ড তাই বলছে। তাই আমরা বিষয়টিকে উড়িয়েও দিতে পারছি না। রায় নেতিবাচক হলে দল কীভাবে চলবে সে বিষয়ে এ বৈঠকে দিকনির্দেশনা দেবেন খালেদা জিয়া।
এ বিষয়ে বিএনপির অপর স্থায়ী কমিটির সদস্যা খন্দকার মোশাররফ বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অসত্য রায় দেওয়া হলে মুক্তির আন্দোলন নয়, সরাসরি সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হবে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, আজ বিএনপি প্রধান সংবাদ সম্মেলনে দলের অবস্থান দেশবাসির কাছে তুলে ধরবেন। পরবর্তীতে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পরবর্তী কর্মসূচি বা কর্মকাণ্ড নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির এক উপদেষ্টা বলেন, কোনো কারণে খালেদা জিয়ার সাজা হলে বা তার সঙ্গে দেখা করা সম্ভব না হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের পরামর্শ নেওয়া হবে। সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটি ও সিনিয়র নেতারা সে অনুযায়ী করণীয় নির্ধারণ করবেন। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন। খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরকালেও এভাবে দল পরিচালিত হয়েছে। ওই সময় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সেভাবেই নেওয়া হয়।
দলটির গঠনতন্ত্র (৭-এর গ ধারা) অনুযায়ী, চেয়ারপার্সনের অনুপস্থিতিতে দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান স্থায়ী কমিটি ও নির্বাহী কমিটির সভা ডাকাসহ চেয়ারপার্সনের অন্য সব ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। এই দুইজন ছাড়া অন্য কেউ দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠক ডাকতে পারেন না। আর এ বৈঠক না হলে কোনো সিদ্ধান্ত অনুমোদন পায় না।
জানা গেছে, খালেদা জিয়া কারগারে গেলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দল পরিচালনা করবেন। এছাড়া খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের ভেতর যাতে ভাঙন সৃষ্টি করতে না পারে সে ব্যাপারে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। গঠনতন্ত্রের কোনো ধারার সুযোগ নিয়ে দলে যাতে বিতর্ক সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য ৭ ধারাটি বাতিল করা হয়েছে।
উল্লেখ, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার ২ কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের এ মামলার প্রধান আসামি খালেদা জিয়া ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন, দলটির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগনে মমিনুর রহমান।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে এ মামলায় খালেদা জিয়ার সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। সেক্ষেত্রে আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়ার অযোগ্য হয়ে পড়বেন সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী।





