কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একটি ধানক্ষেত থেকে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রামে তার ভাইয়ের বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান। তিনি জানান, চট্টগ্রামে ভাইয়ের বাসা থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে কুমিল্লায় নিয়ে আসা হচ্ছে। তবে এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত রয়েছেন কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সুমন কুমিল্লার বাগমারা দক্ষিণের জয়নগর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। প্রায় এক মাস আগে সেখানকার বসতঘর বিক্রি করে অন্যত্র চলে যান তিনি। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সুমন মাদকাসক্ত ছিলেন।

গ্রেপ্তারের আগে স্বজনদের জিজ্ঞাসাবাদ

সুমনকে গ্রেপ্তারের আগে বৃহস্পতিবার তার বোন, বোনের স্বামী ও খালা-শাশুড়িকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয় বলে জানা গেছে।

এদিকে সুমনের একটি রিল ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

ঘটনাস্থলে মরদেহের পাশেই একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়া যায়। অটোরিকশাটির চালক সুমন বলে জানা গেছে। গাড়ির মালিকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অটোরিকশাটির নিবন্ধন রয়েছে।

সিসিটিভি ফুটেজে তাজমিনের শেষ চলাচলের দৃশ্য

ঘটনার আগের রাতের বেশ কিছু সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকার নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন।

বাস থেকে নামার পর তাকে হোটেলের পাশের একটি খাবারের দোকান এবং পশ্চিম পাশের কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যেতে দেখা যায়।

একপর্যায়ে একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথা বলে তাজমিন। এ সময় দোকানিকে তাকে কিছু দেখাতে কিংবা দিকনির্দেশনা দিতে দেখা যায়।

রাত ১২টার দিকে দোকানের সামনে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর অন্য পাশে চলে যায় সে। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান হোটেল এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়।

এরপর বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে তাজমিন সুমনের চালানো সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে বলে জানা গেছে।

বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে গিয়েছিল তাজমিন

নিহত তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, গত ৪ অক্টোবর তার একমাত্র মেয়ে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্সের ধানমন্ডি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হয়।

শহরে এক বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বের হলেও পরে ওই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায় তাজমিন। সেখান থেকে বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা হয় সে।

ওই রাতে মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার ফোন করেন আবদুল আলীম। কিন্তু ফোন রিসিভ না করায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

বাবাকে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল তাজমিন

তাজমিনের বাবা জানান, বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক পৌনে দুইটার দিকে তার মুঠোফোনে একটি বার্তা পাঠায় মেয়ে। একই সঙ্গে নিজের অবস্থান জানিয়ে লাইভ লোকেশনও শেয়ার করে।

বার্তায় বাবাকে সেখানে গিয়ে তাকে নিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছিল তাজমিন।

আবদুল আলীম বলেন, ‘তখন আমি ঘুমে ছিলাম। পরে সকালে মেসেজ দেখি। তারপর লাইভ লোকেশনে এসে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে দেখতে পাই।’

ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে পুলিশের তদন্ত

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, তাজমিনের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তিনি জানান, উদ্ধারের সময় মরদেহটির পরিচয় জানা ছিল না। পরে অনুসন্ধানের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।

ওসি আরও জানান, সিএনজিচালক সুমন মুঠোফোন ব্যবহার করেন না। তার জাতীয় পরিচয়পত্রও (এনআইডি) নেই।