সম্প্রতি সুলতানা কামালের এক বক্তব্যকে ঘিরে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে তার গ্রেফতার দাবি ও হুমকির প্রেক্ষাপটে এ সংলাপের আয়োজন করে মুক্ত চিন্তাশীল আট তরুণ।
অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, হেফাজতের এ হুমকি একজন ব্যক্তি সুলতানা কামালের ওপর নয়, মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জন ও বাংলাদেশের ওপর আক্রমণ। এ রকম হুমকি মানুষের চিন্তা ও কথা বলার স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করার প্রয়াস।
শুক্রবার রাজধানীর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে ‘সংলাপসূত্র’ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন,’ এক সময় এ দেশের মানুষ ধর্মীয় নেতৃত্ব পেছনে ফেলে গণতান্ত্রিক শক্তির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক কোনও ধার্মিক লোক ছিলেন না। শেখ মুজিবুর রহমানও ধার্মিক লোক ছিলেন না। তবে তারা ধর্মবিরোধীও ছিলেন না। কিন্তু ধর্ম থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করেছিলেন এবং অগ্রগতি ছিল গণতন্ত্রের দিকে। এখন গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের মনোযোগ হারিয়ে গেছে। রাজনীতি মধ্যে রাজনীতি নেই, ক্ষমতার লড়াই হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আর এক বছর পাঁচ মাস আছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের। এ সময়ের মধ্যে কী কী পরিবর্তন হবে? যারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তারা কিন্তু নিষ্ক্রিয় নয়। তাদের দলীয় শক্তি দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু বহুলোক আছে যারা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে না। এখন প্রশ্ন হলো হেফাজতে ইসলাম কি আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে? সরকার হেফাজতে ইসলামের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। তার একটা কারণ আগামী নির্বাচনে তাদের সমর্থন পাওয়া।’
সভায় বক্তারা বলেন, মানুষের আস্থা হারিয়ে গেছে গণতন্ত্রের প্রতি আর তাই রাজনীতিতে এখন রাজনীতি নেই, ক্ষমতার লড়াই হয়ে গেছে। উন্নয়ন হয়েছে রাজনীতির বিকল্প। স্বৈরাচার সরকারের সময়ে ঢাকসু নির্বাচন হয়েছিল, কিন্তু এখন হচ্ছে না। হেফাজতের সঙ্গে লড়াই করতে হবে। তাদের সঙ্গেও কথা বলতে হবে। স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়নি। এ দেশের মানুষ চায় দেশ সঠিক পথে চলুক।
অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল বলেন, একেকটি কওমি মাদরাসার বিপরীতে একেকটি স্কুল গড়ে তুলতে হবে, যেখানে গরিব ছেলেমেয়েদের ফ্রি পড়াশোনার ব্যবস্থা হবে। তা না করে হেফাজত-আর কওমিদের বকাঝকা করে তো লাভ নেই। তিনি আরও বলেন, আজকে তারা ১০ হাজার লোক নিয়ে এসে সুলতানা কামালকে হুমকি দিয়েছে। প্রয়োজনে আমাদেরও ১০ হাজার নামানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
জাফর ইকবাল বলেন, আমাদের মধ্যে তো এখন সহনশীলতা নেই। এই যে সেদিন ছাত্রলীগ ইমরানকে (ইমরান এইচ সরকার) কুত্তার মতো পেটাব বলল। এটা কি ঠিক হল? কেউ তো প্রতিবাদ করল না। অধ্যাপক ড. আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, স্বাধীনতাবিরেধীরা নিষ্ক্রিয় নয়। ভোটের রাজনীতি বা নির্বাচনী কৌশল হিসেবে সরকার যেটা করেছে, তাদের ভেবে দেখতে হবে হেফাজত আদৌ তাদের ভোট দেবে কিনা।
অনুষ্ঠানে কবি ও প্রাবন্ধিক আহমদ রফিক বলেন, ‘এতো ঘটনা ঘটছে, আজকে সমাজ প্রতিবাদহীন। মৌলবাদী ও উগ্রবাদী যারা, তাদের উত্থান বিস্ময়কর। আন্দোলনের বিকল্প নেই। আরেকটি গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি করতে হবে।’
মাহফুজা খানম বলেন, ‘বুদ্ধিজীবীরা বিক্রি হয়ে গেছেন। রাতের আঁধারে তাদের কাছে খাম চলে যায়। তারা এখন আর সত্য বলতে পারেন না।’
ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘দেশে এখন আর রাজনীতি নেই, উন্নয়ন হয়েছে রাজনীতির বিকল্প। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলার সময় আমরা আবেগে আপ্লুত হয়ে যাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা সবাইকে এক করেছিলাম, কিন্তু এমনিতেই সবাই এক হয়নি, তার জন্য নেতৃত্ব ছিল। এখানে সরিষার মধ্যে ভূত আছে। আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে, আমরা নিজেরা সরিষা, নাকি আমরাই ভূত। বাংলাদেশে একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণি ছিল, আমরা কেউ শ্রেণি শব্দটা উচ্চারণ করি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাহিত্য নিয়ে নানা রকম তর্ক আছে বামপন্থীদের মধ্যে। আমার দুভার্গ্য যে আমি বামপন্থীদের মধ্যে ঘোরাফেরা করি। আমাদের সব সাইনবোর্ড যদি বাংলায় হয় তাহলে কি শোষণ বন্ধ হয়ে যাবে? আমি তো শোষণ বন্ধ করতে চাচ্ছি না, আমি সাইনবোর্ড বাংলা করতে চাই। বিচার বিভাগে এখনও বাংলার প্রচলন চালু হয়নি, এটা বললে কি আদালত অবমাননা হবে? আদালতকে ‘মাই লর্ড বলতে হয়, কিন্তু একটি রিপালিক দেশে মাই লর্ড বলা সংবিধান বিরোধী। এ বিষয়ে কোনও প্রতিবাদ হচ্ছে না। এ মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি।’ খুশি কবির বলেন, ‘দেশের ভেতরে একটি নয়, অনেকগুলো সমাজ আছে। সবাই এক চিন্তা করছে না। ধর্মকে ব্যবহার করে ভায়োলেন্স করা হচ্ছে। যারা ভায়োলেন্স করছে, তারা নিজের, নিজের সন্তানের জীবন বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করছে না। তবে এখনও সমাজের বড় একটা অংশ আছে যারা উগ্র চিন্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। এদেশের মানুষ চায়, দেশ সঠিক পথে চলুক।’
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাষ্ট্রি ড. সরওয়ার আলী বলেন, ‘১৯৭২ সালে ২২ ভাগ লোক ছিল যারা অমুসলিম। ২০১১ সালে সেটি হয়েছে ৯ ভাগ। অমুসলিমরা বাংলাদেশকে নিরাপদ মনে করছেন না। বড় সমস্যা হচ্ছে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার শুরু হয়েছে, যা ১৯৭২ সালে বন্ধ করা হয়েছিল। ৫ মে যারা তান্ডব করেছিল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছিল। এটি সম্ভবত নির্বাচনি কৌশল, কিন্তু কৌশলের কাছে নীতি পরাস্ত হয়েছে।’
শিল্পী লুবনা মরিয়ম বলেন, ‘প্রগতিশীল রাজনীতি থাকতে হবে। কেউ বিক্ষিপ্তভাবে কথা বলছে মৌলবাদ নিয়ে, কেউ নারীবাদ নিয়ে, আমাদের সামগ্রিক রাজনীতি বুঝতে হবে। কিন্তু অভাগা দেশ, প্রগতিশীল রাজনীতি নেই। মেনন ভাই, মতিয়া আপারা প্রগতিশীল রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, এখন দেখি মনেন ভাই হজ করতে যান।’
তারেক আলী বলেন, ‘সুলতানা কামালকে হুমকি দেওয়ার পর সরকার ব্যবস্থা না নেওয়ায় আমরা মর্মাহত। নাগরিক জীবনে বৈষম্য বাড়ছে। বৈষম্য কমানোর জন্য আমাদের সরকারের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
সাবেক তথ্য কমিশনার সাদেকা হালিম বলেন, ‘আামাদের প্রান্তিক জনগণের কাছে যেতে হবে। স্বৈরাচার সরকারের সময়ে ঢাকসু নির্বাচন হয়েছিল, কিন্তু এখন হচ্ছে না। হেফাজতের সঙ্গে আমাদের লড়াই করতে হবে, তাদের সঙ্গেও কথা বলতে হবে।’
আলোচনার শুরুতে সংলাপসূত্রের পক্ষে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জুলফিকার আলি মাণিক। এছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন- কাজী খলিকুজ্জামান, অজয় রায়, শিফা হাফিজা, সুভাস সিংহ রায়, কবি রাজু আলাউদ্দিন, সাংবাদিক মুন্নি সাহা, উন্নয়ন কর্মী আসিম মুনির প্রমুখ।





