পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে রাতের নীরবতা। জমাট অন্ধকার ডাকসু ভবনটাতেও। আলো জ্বলছে সেই মধুর ক্যান্টিনে। গোটা দেশে আলো ছড়ানো বহু রাজনীতিকের তীর্থস্থান এটি। ছাত্র রাজনীতির এই সুতিকাগারে ফুটেছে নতুন ফুল। ঐহিত্যবাহী ছাত্রলীগের হাল ধরেছেন নতুন কান্ডারি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন

সাংগঠনিক নেত্রী। কমিটি ঘোষণার পর নতুন নেতৃত্বকে বরণ করে নেওয়ার রেশ চলছিল।সেই রাতে মধুর ক্যান্টিনের রাজনৈতিক আড্ডার মধ্যমনি ছিলেন রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। মাত্র তিনদিন আগে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন। হরেক রকম ব্যস্ততা, তবুও খানিকটা সময় পূর্বপশ্চিমের জন্য আলাদা করে রেখেছিলেন দেশের বৃহত্তম ছাত্র সংগঠনের এই শীর্ষনেতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে মুখোমুখি হয়ে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মাকসুদুল হক ইমু, ছবি তুলেছেন নাজমুল হাসান

জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান সবসময় বলতেন, ছাত্রলীগের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর সেই উক্তি মোটেও অতিরঞ্জিত ছিল না। কালের স্রোতে ভেসে গেছে কত দল, কালের ধূলোতে ঢাকা পড়ে গেছে কতো না সংগঠন। ব্যতিক্রম বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর পূর্ণ করার পরও ছাত্রলীগ ধরে রেখেছে তারুণ্য। ঐতিহ্যবাহী এ ছাত্র সংগঠন থেকে যুগে যুগে দেশ পেয়েছে বলিষ্ঠ সব নেতাকে। ছাত্রলীগের রাজনীতিতে শাণিত হওয়া অনেক নেতাই সাফল্য পেয়েছেন জাতীয় রাজনীতিতে। সেই ধারাবাহিকতায় সাংগঠনিক নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনেক যাচাইবাছাইয়ের পর ছাত্রলীগকে নের্তৃত্ব দেওয়ার জন্য মনোনীত করেছেন রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্র বেড়ে ওঠেছেন কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর আওয়ামী ঘরানার পরিবারে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতিতে ওই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম শোভন।

পূর্বপশ্চিমের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে কী বললেন ছাত্রলীগের সভাপতি, চলুন চোখ রাখি।

পূর্বপশ্চিম: আমরা জানি, আপনার দাদা আওয়ামী লীগ থেকে কুড়িগ্রাম ভুরুঙ্গামারি-নাগেশ্বরী এলাকার সংসদ সদস্য ছিলেন। আপনার বাবাও একসময় ছাত্রলীগ করতেন। এখন তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। সবকিছু মিলিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে আপনার যুক্ত হওয়ার গল্পটা জানতে চাই।

শোভন: আসলে আমার জন্মটাই হয়েছে রাজনৈতিক একটি পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই আমি রাজনৈতিক একটা বলয়ের মাঝে বেড়ে উঠেছি। আমাদের ভুরুঙ্গামারীতে আমরাই আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব করতাম। একথায় যদি বলি আমার রক্তে মিশে আছে রাজনীতি। আমার বাবা আমাদের এলাকায় ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন, যুবলীগের সভাপতি ছিলেন, আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। মূলত আমি স্কুলে পড়াশোনাকালীন আমার দাদা, বাবার কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে শুনতাম। ছাত্রলীগ সম্পর্কে তারা বিভিন্ন আলোচনা করতেন। তখন থেকে আস্তে আস্তে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করলাম। এরপর থেকে মিছিল মিটিংয়ে নিজেকে জড়িয়েছি।

পূর্বপশ্চিম: আপনার সভাপতি পদে আসাটাকে অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছেন, আবার অনেকেই অপ্রত্যাশিত বলছেন। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কি?

শোভন: এ বিষয়ে বলবো, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করি, বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতি আমার একটা আবেগ ভালবাসা আছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলাম সে হিসেবেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকে উভয় পদের জন্য ফরম কিনেছিলাম। বাকীটা মূল্যায়ন করেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আমার উপর যে গুরু দ্বায়িত্ব দিয়েছেন তাতে আসলে আনন্দিত হবার কিছু নেই, এটা আমার কাছে একটা চ্যালেঞ্জ বলে আমি মনে করি। তিনি আমাকে যে দুই বছর সময় দিয়েছেন এই দুই বছরের মধ্যে ছাত্রলীগকে একটি রুল মডেল হিসেবে দেখাতে চাই।

পূর্বপশ্চিম: ছাত্র রাজনীতি একসময় শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখা হলেও চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও মাদক ব্যবসায় ছাত্রনেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায়, ছাত্র রাজনীতি আর ছাত্রনেতা নিয়ে মানুষের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য।

শোভন: এই কথার সাথে একমত নই। ছাত্র রাজনীতিকে এখনো শ্রদ্ধার সাথেই দেখা হয়। ছাত্রলীগ করে কারা? যারা ছাত্র তারাই কিন্তু ছাত্রলীগ করে। যারা চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ তারা কিভাবে ছাত্র হয়? তারা তো ছাত্র না। তার মানে তাদের সাথে ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততা নাই। আর চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও মাদক ব্যবসায় ছাত্রনেতাদের জড়িত থাকবার এমন অভিযোগ আসলে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এ ষড়যন্ত্র আগেও ছিল। নিজেদের কাটতি বাড়াতেই আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হচ্ছে গণমাধ্যমে। আমাদের সঙ্গে কথা না বলে ঢালাওভাবে লেখা হয় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ হয়েছে, ছাত্রলীগের অমুক নেতা ছিনতাই করেছে। আবার কখনো কখনো অনেক জায়গায় লেখা হয় ‘সাবেক ছাত্রলীগ নেতা’। তার মানে ‘ছাত্রলীগ’ শব্দটি না লিখলে যেন খবরেই হয় না। তবে এটা ঠিক যে, ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে অনেকে অপরাধ করে থাকে। ছাত্রলীগের কোনো নেতা-কর্মী অপরাধ করলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব। কোনো ছাড় দেয়া হবে না।

পূর্বপশ্চিম: ছাত্রদের প্রধান কাজ পড়াশোনা করা, কিন্তু নব্বইয়ের পর থেকে বাড়তি উপার্জনের জন্য ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনকে ব্যানার হিসেবে ব্যবহার করে ধান্ধাবাজিতে মেতে ওঠার অভিয়োগ আছে ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে। এ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি?

শোভন: ছাত্রলীগ কিন্তু বরাবরই সাধারণ ছাত্রদের পক্ষে, দেশের পক্ষে। ১৯৪৮ সাল থেকে এইভাবে ছিল এখনো আছে এবং সামনেও থাকবে। তবে যেসব কারণে ছাত্রলীগের ইমেজ নষ্ট হয় সেসব কাজ থেকে সংগঠনের নেতাকর্মীদেরকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করবো। সমর্থিত ছাত্র সংগঠনকে ব্যানার হিসেবে ব্যবহার করে ধান্ধাবাজিতে মেতে ওঠার অভিযোগ কারো বিরুদ্ধে থাকলে তার বিরুদ্ধে আমরা সাংগঠনিক ব্যাবস্থা নেব।

পূর্বপশ্চিম: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে থাকে ‘রাজনীতি মুক্ত’ পরিবেশ, তার মানে কি এই নয় যে, ছাত্র রাজনীতি পরিবেশকে কলুষিত করে। ছাত্র রাজনীতি নিয়ে এধরনের নেতিবাচক প্রচারণা কিভাবে দেখেন? প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের রাজনীতি চর্চার আওতায় আনতে কোনো চিন্তাভাবনা করছেন কি?

শোভন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতি নেই এমন কথা বলা যাবে না। সেখানে রয়েছে নীরব রাজনীতি। সরব রাজনীতি না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকছেন। এই প্রবণতা বন্ধ করতে সেখানে ছাত্রলীগের ছাত্ররাজনীতির চর্চা উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। আর সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বেশ কিছু বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটি রয়েছে যারা আমাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নিয়ে থাকে। আর আপনি যে বলছেন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে বলা হয় যে ‘রাজনীতি মুক্ত পরিবেশ’ তা মূলত তাদের শিক্ষাঙ্গনের পরিসর ছোট বলে। আর এর মানে এই নয় যে ছাত্র রাজনীতি তাদের পরিবেশকে কলুষিত করে, তার মানে এই যে তাদের ক্যাম্পাসটা ছোট। রাজনীতির পরিবেশ টা সৃষ্টি করলে তাদের ক্যাম্পাসে স্থান সংকুলন হবে না এটাও এর একটা বড় কারণ।

পূর্বপশ্চিম: ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা দিয়েছিলেন, ছাত্রলীগ হবে নতুন মডেলের। এ বিষয়ে আপনার কাছ থেকে একটা পরিস্কার ধারণা পেতে চাই।

শোভন: নতুন মডেলের ছাত্রলীগ মানে ভিন্ন কিছু নয়। সময়ের প্রয়োজনেই ছাত্রলীগের এগিয়ে চলা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়ার জন্য ছাত্রলীগ নেতা কর্মীদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নে সকলকে অধিক উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে হবে। ছাত্রলীগ মূলত শিক্ষার্থী বান্ধব একটি সংগঠন। তাই সবসময় আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়েই তাদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি। আশা করছি সবময় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করে যাবে। ছাত্রলীগের প্রতিদিনের সব কর্মকাণ্ড হবে ছাত্রদের কল্যাণকে ঘিরে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কোন ইস্যু, কোন প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য ছাত্রসংগঠনের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল কোন ইস্যুতে সেটাও দেখুন। জন্ম অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। তারপর যত আন্দোলন হয়েছে দেশে, তাতে ছাত্রলীগের বিপুল অবদান রয়েছে। এখনো ছাত্রদের নানান অধিকার আদায়ে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

পূর্বপশ্চিম: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সহাবস্থানের একটা বিষয় আছে। অতীতে দেখা গেছে, ক্যাম্পাসে সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য সংগঠনকে দাঁড়াতেই দিচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে কেমন হবে নতুন মডেলের ছাত্রলীগের দৃষ্টিভঙ্গি?

শোভন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে মূলত যা পড়াশোনা করে তারাই তো মূলত ক্যান্টিনে আড্ডা দিবে এর বাহিরে তো না। সাধারণ ছাত্র হলে তারা অবশ্যই আসবে। ক্যাম্পাসে কেউ যদি সহাবস্থানে আসতে চায় কিংবা মধুর ক্যান্টিনে আসতে চায়, তাদের অবশ্যই ছাত্র হতে হবে। তা না হলে কীভাবে আসবেন? তারা যদি প্রকৃতই ছাত্র হয় তাদের সঙ্গে সহাবস্থান হবে। কিন্তু যাদের ছাত্রত্ব শেষ হয়ে গেছে তারা কি করে ক্যাম্পাসে সহাবস্থান চায়? ছাত্রত্ব না থাকলে তো ছাত্ররাজনীতি হতে পারে না। সব প্রগতিশীল সংগঠনই ক্যাম্পাসে আসতে পারবে। তবে তাদের নেতৃত্বকে অবশ্যই নিয়মিত ছাত্র হতে হবে।

পূর্বপশ্চিম: সামরিক শাসনামলে ছাত্র রাজনীতিকে অস্ত্রের ঝনঝনানি কলুষিত করেছিল। গড়ে ওঠেছিল ক্যাডারভিত্তিক গ্রুপিং। অবৈধ অস্ত্রের বিষয়টি এখন সেভাবে ওঠে না এলেও বলপ্রয়োগ বা পেশিশক্তির ব্যবহার অব্যাহত আছে। বড় সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের সব শাখাতে আছে বহু গ্রুপিং, আছে অনুপ্রবেশকারী। এসব সমস্যার সমাধান কীভাবে করবেন?

শোভন: আসলে ছাত্রলীগ বড় একটা ছাত্র সংগঠন। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যাবে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের প্রতিটা জাতীয় ঘটনাগুলোতে ছাত্রলীগের প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে কিছু সংখ্যক সদস্যের কারণে সংগঠনটির ওপর কালিমা লেগেছে। ক্যাম্পাসগুলোতে অস্ত্রের রাজনীতি শুরু করে তারা। আমরা সেই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে চাই। কেননা বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের অভিভাবক। তিনি ছাত্রদের হাতে বই ও কলম তুলে দিয়েছেন। পাশাপাশি ছাত্রলীগে যারা অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করছে বা করেছে তাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। এটা আরো জোরদার করা হবে। যদি কেউ নিজের স্বার্থে সংগঠনে শিবির বা ছাত্রদলের কাউকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করে তাকেও ছাড় দেয়া হবে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগর, জেলা, উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে যারা নেতৃত্বে আসবে তাদের অবশ্যই নিয়মিত ছাত্র হতে হবে। অবিবাহিত হতে হবে। এর বাইরে যারা কমিটি করার চেষ্টা করবে সংগঠন থেকে তাদের বিরুদ্ধে গঠনতন্ত্র মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু এত কিছু প্রাপ্তির পরও কতিপয় অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছাত্রলীগকে সমালোচনার মুখে ফেলে দেয়। এসব বিষয়ে তৎক্ষণাত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে।

পূর্বপশ্চিম: আপনারা তো ইতোমধ্যেই আপনাদের কেন্দ্রীয় কমিটি সহ বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি দিবেন, সেক্ষেত্রে কি করে নতুন নেতৃত্ব বাছাই করবেন?

শোভন: নতুন কোন কমিটি বা ইউনিট ঘোষণার ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করবো। যাচাই বাছাই করবো।আর একটা কথা আমি বলতে চাই যে যেসকল ছাত্রনেতার পূর্বে বিভিন্ন কমিটিতে পোষ্ট ছিল বা আছে তাদেরকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে। একদম নতুন কোন ছেলেকে হঠাত করে ধরে এনে পদ পদবী দেয়া হবে না। দলের জন্য,সংগঠনের জন্য যাদের পরিশ্রম আছে তাদেরকে মূল্যায়ন করা হবে।

পূর্বপশ্চিম: ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, বিশেষ করে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে শিক্ষকদের সম্পর্ক এখন কি স্বাভাবিক পর্যায়ে আছে? কেমন হওয়া উচিত?

শোভন: পিতামাতার সঙ্গে মানুষের যেমন নাড়ির সম্পর্ক, তেমনি শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের সম্পর্ক আত্মার। শিক্ষকরা আমাদের আত্মবোধ গড়ে দেন। তারাই আমাদের আত্মার আত্মীয়, আপনজন। পিতামাতা-সন্তানের সম্পর্কের মতো ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক এক অবিচ্ছেদ্য অনিন্দ্য সুন্দর সম্পর্ক। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমাদের ছাত্রনেতাদের সম্পর্ক খুব মধুর। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক অভিভাবকতুল্য ও বন্ধুসুলভ। আসলে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক একটি চমৎকার পরিপূরক সম্পর্ক।

পূর্বপশ্চিম: ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে আপনার কমিটির কার্যক্রম কি হবে?

শোভন: ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের রূপকল্প হাতে নিয়েছে তা বাস্তবায়নে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব দিবে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকেই তথ্যপ্রযুক্তিকে মানুষের দোড় গোড়ায় পৌছে দেয়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ একটি প্রত্যয়, একটি স্বপ্ন। আর এই স্বপ্ন দেখিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য ছেলে ও তার তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। ২০০৯ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণার পর সজীব ওয়াজেদ জয় ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার কাজে নিজে আত্মনিয়োগ করেন। সজীব ওয়াজেদ জয়ের মেধা ও দক্ষতায় আজ ইন্টারনেটসেবা দেশের গ্রামের মানুষের হাতের মুঠোয় এসে পৌঁছেছে। এক্ষেত্রে আমরা ছাত্রলীগ এই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়বার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখবো এবগ সর্বদা সচেষ্ট থাকবো।

পূর্বপশ্চিম: নির্বাচনের বছর ছাত্রলীগের শীর্ষ নের্তৃত্বে এসেছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কী কী এজেন্ডাকে অগ্রাধিকার দিতে চান?

শোভন: ছাত্রলীগকে আরো সাংগঠনিকভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলা আমাদের কাজ। যে কোনো মূল্যে সংগঠনের চেইন অব কমান্ড বজায় রাখা হবে। তাছাড়া তরুণ প্রজন্মকে ছাত্ররাজনীতির দিকে আকৃষ্ট করবো। আর যেহেতু সামনেই জাতীয় নির্বাচন সেদিকে মূল লক্ষ্য রেখেই কাজ করে যাবে বর্তমান ছাত্রলীগ। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণে প্রস্তুতি নিচ্ছে ছাত্রলীগ। নির্বাচনকে সামনে রেখেই সংগঠনকে সাজানো হচ্ছে। নেতাকর্মীদের তৈরি করা হচ্ছে। ছাত্রলীগ আন্দোলন সংগ্রামে যেমন নেতৃত্ব দেয় তেমনি আগামী নির্বাচনেও অগ্র সেনানীর ভূমিকা পালন করবে। নির্বাচনী যুদ্ধের ময়দান থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আবারও জনগণের সেবা করার সুযোগ দিতে সর্বাত্মক চেষ্টা করবে ছাত্রলীগ। যারা নতুন এবং তরুণ ভোটার রয়েছেন মূলত তাদেরকে আকৃষ্ট করবে ছাত্রলীগ।

পূর্বপশ্চিম: ব্যক্তিজীবনে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা জানতে চাই।

শোভন: আমি বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসি, আমি বাংলাদেশকে ভালবাসি। সেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মানে নেত্রী আমাকে একটা গুরু দ্বায়িত্ব দিয়েছেন। আমি যতদিন এই পদে আছি উনার দেয়া এই দ্বায়িত্ব যথাযত পালন করবো। এটা আমার ভালোবাসার জায়গা। এখানে আমি কোন কিছু পাবার জন্য আসিনি। এটা আমার কাজ, এটা আমার দ্বায়িত্ব। ছাত্রলীগ নিয়ে আমার বেশ কিছু পরিকল্পনা আছে। তার মাঝে জাতির পিতার আদর্শ বাস্তবায়ন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন-২০২১ ও ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নে কাজ করা এবং একটি সুশৃঙ্খল ছাত্রলীগ গঠনে কাজ করা আমার পরিকল্পনার একটি অন্যতম অংশ।

পূর্বপশ্চিম: সংগঠনের প্রধান দায়িত্বে আসার পর ছাত্রলীগের তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বস্তরের নেতাকর্মীর উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

শোভন: বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এমন একটি সংগঠন যা সারা বাংলাদেশের সাধারন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব করে। সেজন্যেই সাধারন ছাত্র-ছাত্রীরাও আমাদের নতুন নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যন্ত ছাত্রলীগের প্রতিটি পরিক্ষীত কর্মীই নিজের সর্বোচ্চ উজার করে দিতে চায় শেখ হাসিনাকে। প্রতিটি কর্মীর মতামত এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আমি চেষ্টা করবো সবসময় তৃণমূল ছাত্রলীগকে বেশি করে সময় দিতে। যাতে করে আমাদের বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আরো বেশি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ হয়। আমি বলতে চাই, আমাদের বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীকে আরো বেশী মানবিক হতে হবে। সকল অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। সর্বোপরি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা ও আমাদের তরুণদের অহংকার সজীব ওয়াজেদ জয়ের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে।