বিপুল ভোটের ব্যবধানে বরিশাল সিটি মেয়র নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। ১২৩ কেন্দ্রের মধ্যে ৭৬ কেন্দ্রের প্রাপ্ত ফলাফলে তিনি পেয়েছেন ৭৭৭৫১ ভোট এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরওয়ার পেয়েছেন ১০৬৭৩ ভোট। ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন

এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে সাদিক ১৮ বছর পর বরিশালে তার বাবা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর হারানো সাম্রাজ্য পুনঃরুদ্ধার করেন।

সাদিক আবদুল্লাহর বাবা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ ও সংসদ সদস্য। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণ করার লক্ষ্যে গঠিত চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক। তিনি একজন মন্ত্রীর সমকক্ষ মর্যাদা, বেতন-ভাতা ও আনুসাঙ্গিক অন্যন্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন।

সাদিক আবদুল্লাহর দাদা আবদুর রব সেরনিয়াবাত ১৯৭৫ পর্যন্ত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী। ১৫ আগস্ট ঘাতকরা তাকে হত্যা করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে ঘাতকদের বুলেটে শহীদ হন হাসানাতের বাবা তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ভাই আরিফ আবদুল্লাহ, বোন বেবী সেরনিয়াবাত, বড় ছেলে সুকান্ত বাবু, চাচাতো ভাই সাংবাদিক শহীদ সেরনিয়াবাত।

ওই দিন তাদের বাসায় বেড়াতে গিয়ে নিহত হন বরিশালের ক্রিডেন্স ব্যান্ডের গিটারিস্ট আব্দুন নঈম খান রিন্টু। ঘাতদের বুলেটে আহত হন হাসানাতের মা আমেনা বেগম, স্ত্রী শাহানারা আবদুল্লাহ, ছোট ভাই আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকনসহ তাদের বাসায় বেড়াতে যাওয়া ক্রিডেন্স ব্যান্ডের সদস্য জিল্লুর রহমান, টুটুল, সৈয়দ মাহমুদ, মুকুল দাস ও ললিত দাস। হামলার বীভৎস দৃশ্য দেখে একটি লুঙ্গি পরে ঘাতকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজের জীবন বাঁচিয়ে ছিলেন সাদিক আবদুল্লাহর বাবা হাসানাত আবদুল্লাহ।

১৯৯৬ সালে সংসদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চিফ হুইপ ছিলেন আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের বিপুল বিজয়ের রাতেই আত্মগোপনে চলে যান হাসানাত আবদুল্লাহ। সাড়ে আট বছর তিনি ছিলেন তার নির্বাচনী এলাকা তথা বরিশালের বাইরে। তার দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে তারই হাত ধরে আওয়ামী লীগে আসা এক সময়ের জাতীয় পার্টির নেতা প্রয়াত শওকত হোসেন হিরণ অনেকটা সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নেন। হাসানাত অনুসারী নেতা-কর্মীদের কোণঠাসা করে রেখে জাতীয় পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে আসা নেতা-কর্মীদের নিয়ে শক্ত বলয় তৈরি করেন তৎকালীন মহানগর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক হিরণ।

২০০৮ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থনে মেয়র নির্বাচিত হয়ে হিরণ তার অবস্থান আরও দৃঢ় করেন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আমলে দায়ের হওয়া দুটো মামলার আইনি ঝামেলা কাটিয়ে ব্যাপক শোডাউন করে মহাসমারোহে বরিশালে ফেরেন হাসানাত আবদুল্লাহ। হিরণ প্রকাশ্যে আনুগত্য দেখালেও দুজনের মধ্যে হয়তো মনস্তাত্ত্বিক এক দ্বন্দ্ব ছিল।

২০১৩ সালের ১৫ জুনের সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী হিরণ তার পরাজয়ের জন্য হাসানাতকে দায়ী করেন। সিটি নির্বাচনে পরাজয়ের পর হিরণ বলয়ে কিছুটা ভাটা পড়লেও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল সদর আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হিরণ এমপি নির্বাচিত হলে আবার ঘুরে দাঁড়ায় তারা। কিন্তু একই বছরের ২২ মার্চ হিরণ এক দুর্ঘটনায় সংজ্ঞাহীন হওয়ার পর ৯ এপ্রিল মারা যান।

হিরণ মারা যাওয়ার পর হাসানাতের বড় ছেলে কেন্দ্রীয় যুবলীগ সদস্য সাদিক আবদুল্লাহর উত্থান ঘটে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। একে একে হিরণ অনুসারীদের কাছে টানেন তিনি। গত দুই বছরেরও অধিক সময়ে অভাবনীয় উত্থানই শুধু নয়, হাসানাতের পক্ষ ত্যাগ করে হিরণ অনুসারী বনে যাওয়া নেতাদের আবার হাসানাতমুখী করেছেন সাদিক। পদ-পদবি না থাকলেও হাসানাতপুত্র সাদিক সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আইকন হয়ে যায়।

সাদিকের কারিশমার ফলেই বরিশাল আওয়ামী লীগে হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার হয় হাসানাতের। হিরণের কট্টর অনুসারী কিছু নেতা ছাড়া সবাই এখন হাসানাত বলয়ে।

হাসানাতের বড় ছেলে সাদিক আবদুল্লাহ জানান, ১৯৬৮ সালের আগে জগন্নাথ কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় তার বাবার। পরে তিনি বরিশালের শ্রমিক রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেন। ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে মুজিব বাহিনীর প্রধান ছিলেন আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। ১৯৭৩ সালে দলীয় প্রার্থী জাহিদ হোসেন জাহাঙ্গীরকে হারিয়ে মাত্র ২৬ বছর বয়সে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশে বরিশাল পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন হাসানাত। ’৭৪ সালে যুবলীগ প্রতিষ্ঠিত হলে বরিশাল জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান তিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে ঘাতকদের বুলেটে শহীদ হন হাসানাতের বাবা তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ভাই আরিফ আবদুল্লাহ, বোন বেবী সেরনিয়াবাত, বড় ছেলে সুকান্ত বাবু, চাচাতো ভাই সাংবাদিক শহীদ সেরনিয়াবাত। ওই দিন তাদের বাসায় বেড়াতে গিয়ে নিহত হন বরিশালের ক্রিডেন্স ব্যান্ডের গিটারিস্ট আব্দুন নঈম খান রিন্টু। ঘাতদের বুলেটে আহত হন হাসানাতের মা আমেনা বেগম, স্ত্রী শাহানারা আবদুল্লাহ, ছোট ভাই আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকনসহ তাদের বাসায় বেড়াতে যাওয়া ক্রিডেন্স ব্যান্ডের সদস্য জিল্লুর রহমান, টুটুল, সৈয়দ মাহমুদ, মুকুল দাস ও ললিত দাস। হামলার বীভৎস দৃশ্য দেখে একটি লুঙ্গি পরে ঘাতকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজের জীবন বাঁচিয়ে ছিলেন হাসানাত আবদুল্লাহ।