বরিশাল সিটি নির্বাচনে যখন রাঘব বোয়ালরা প্রচুর অর্থ কড়ি খরচ করে করে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে সেখানে এই মহিলা প্রার্থী সুধু মাটির ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা নিয়ে চালিয়েছে নির্বাচন প্রচারণা। ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো দেশের বৃহত্তর দুই দলের প্রার্থীদের সাথে এই লড়াইায়ে কতটুকু এগিয়ে যেতে পারবেন এই নারী সেটিই সবার মুখে মুখে। বরিশালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সর্বমহলে আলোচিত মেয়রপ্রার্থী সেই নারী হলেন ডা: মনীষা চক্রবর্তী।
তিনিই প্রথম নারী মেয়র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। যেখানে বড় দুই দলের প্রার্থীদের প্রচার প্রচারণায় যোগ দিয়েছেন সাবেক ও বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, তার বিপরীতে মনীষার প্রচারে লড়ছেন বরিশালের শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষ, বস্তিবাসী, রিকশাওয়ালা ও জাহাজঘাটের কুলি। তবে পরিবর্তনর্শীল মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন তিনি।
পেশায় একজন চিকিৎসক হলেও এই নারী গত কয়েক বছর ধরে বরিশালের স্থানীয় বাসদের রাজনীতিতে একজন আলোচিত মুখ। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে রাজপথে সোচ্চার হওয়ায় বিভিন্ন সময় তাঁকে যেতে হয়েছে জেলে। তবে সব সময় সাহসের সাথে সামনেই এগিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর অদম্য সাহসের কারণে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল তাঁকে বরিশালে বাসদের সদস্য সচিব করে। এবারের বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বাসদ থেকে মই প্রতীকে মেয়র পদে লড়ছেন তিনি।
বরিশাল নগরীতে বেড়ে ওঠা ডা: মনীষা নগরীর মল্লিকা কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি এবং এসএসসিতে জিপিএ-৫ (গোল্ডেন-এ প্লাস) পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন অমৃত লাল দে কলেজে। সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাস করে বরিশাল শেরে-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন মনীষা।
এরপর এমবিবিএস পাশ করার পরে ৩৪তম বিসিএসে নিয়োগ পান তিনি। কিন্তু সরকারি চাকুরিতে যোগদান না করে তিনি যুক্ত হন বাসদের রাজনীতিতে।পাশাপাশি চালিয়ে যান চিকিৎসা পেশা। শ্রমজীবী, সাধারণ মানুষ ও বস্তিবাসীর জন্যে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়ে ‘গরিবের ডাক্তার’ খেতাব পান ডা. মনীষা।
প্রগতিশীল পরিবারে জন্ম নেওয়া ডা. মনীষা চক্রবর্তীর পিতামহ আইনজীবী সুধীর কুমার চক্রবর্তীকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় রাজাকার বাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করে। তার বাবা আইনজীবী সর্বজন পরিচিত তপন কুমার চক্রবর্তী মুক্তিযুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তবে বাবা দাদার পরিচয়ের বাইরে খুব অল্প সময়ে নিজের কাজ দ্বারা ডা. মনীষা স্থান করে মানুষের হৃদয়ে এবং নিজের পরিচয়ে নিজেই এগিয়ে যেতে থাকেন।
মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময়ই শিক্ষা-স্বাস্থ্যের অধিকার রক্ষা, শোষণ-লুটপাট থেকে দেশ এবং মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে যুক্ত হন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের রাজনীতির সঙ্গে। বরিশাল নগরীর হোল্ডিং প্রতিবাদে আন্দোলন, ভোলার গ্যাস বরিশালে এনে গ্যাসভিত্তিক শিল্পকারখানা নির্মাণ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির আন্দোলন, দোকান কর্মচারী-হোটেল শ্রমিক-নির্মাণ শ্রমিক-নৌযান শ্রমিক-রিকশা শ্রমিকদের ধারাবাহিক আন্দোলন, খাসজমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণের আন্দোলন, রসুলপুর চরে বস্তি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সফল আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন তিনি।
স্থানীয় আন্দোলনের পাশাপাশি মেডিকেলে কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে ঢাকায় কেন্দ্রীয় আন্দোলনে নেতৃত্বও দেন।এছাড়াও ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক হিসেবে রাশিয়ার সোচিতে ১৫৪টি দেশের ছাত্র-যুবকদের অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক ছাত্র-যুব সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের শিক্ষাস্বাস্থ্যে ব্যবস্থার চিত্র এবং করণীয় তুলে ধরেন।
পেশায় চিকিৎসক মনীষা চক্রবর্তী বিনা পয়সায় গরিব মানুষকে চিকিৎসা দেন। মনীষা বলেছেন, মানুষের চিকিৎসাকে আমি ব্যবসায় হিসেবে দেখি না। চিকিৎসা সেবামূলক হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। আমি স্কুল-কলেজে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প করেছি, বস্তিবাসীদের ফ্রি চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি।
খেটে খাওয়া মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা তাঁর। শ্রমিক ও বস্তিবাসীর ‘দিদি’ মনি মনীষা সিটি নির্বাচনে ভালো ভোট পাবেন বলে বাসদ নেতাদের ধারণা। মনীষার দাদা শহীদ মুক্তিযোদ্বা, বাবাও মুক্তিযোদ্ধা। পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণেও তাঁকে নিয়ে আগ্রহ আছে মানুষের। অন্যদিকে মেয়র পদে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণকে ইতিবাচক দেখছে এখানকার জনগণ। মনীষা বলেন, নির্বাচনে শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষেরাই আমার পাশে আছে। জনগণের মাটির ব্যাংকে সঞ্চয় করা টাকা দিয়েই আমার নির্বাচনের ব্যয় চালাচ্ছি আমি।
নির্বাচনের প্রতিশ্রুতিতে মনীষা বলেন, আমরা নির্বাচিত হতে পারলে নগর কাউন্সিল তৈরি করে উন্নয়ন করব। লাখো মানুষ ফেসবুকে তাকে মানসিক সমর্থন দিয়ে যাওয়াকেই তিনি তার প্রাথমিক বিজয় হিসেবে মনে করছেন। অন্য প্রার্থীদের তুলনায় বয়সের দিক থেকে সবচেয়ে তরুণ আমি। ভোটের রাজনীতিতে তারুণ্য পিছিয়ে থাকবে না। তরুণ ভোটার ও নারীদের একটি বড় অংশ আমাকে ভোট দেবেন বলে আমি আশা রাখি।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে, ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে মনীষার জনপ্রিয়তার কথা। শ্রমজীবী মানুষের জন্য কাজ করা, তাদের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করার কারণে নগরীতে বেশ জনপ্রিয়তা আছে তার।
নারী ভোটারদের কাছেও বেশ জনপ্রিয় তিনি। এক নারী ভোটার বলেন, ‘বয়সে অল্প সামনে আরো ভালো কাজ করতে পারবে যদি মেয়র হওয়ার সুযোগ পায় সে। তাছাড়া সে কিন্তু জনপ্রিয়তা দিয়ে এই পর্যন্ত এসেছে। একজন নারী হিসেবে আমার ভোট তাকেই দিব আমি।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বরিশাল শাখার সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন , মনীষা চক্রবর্তীর বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রথম নারী মেয়র প্রার্থী। মনীষা শিক্ষিত, মার্জিত। এ কারণে তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বেশি। তাঁর মাটির ব্যাংককেন্দ্রিক ধারণাও ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে তরুণদের কাছে টানতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব তিনি ও তার দল। নতুন ভোটার হওয়া ৩০ হাজার তরুণের ভোটের উপর আস্তা রেখে দিনরাত কাজ করেছেন তিনি। শিক্ষিত তরুণ সমাজ গড়ার প্রত্যায়ও তার নির্বাচনী ইশতেহারে আছে। অধিকারবঞ্চিত ও অনুন্নত এলাকার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিটা বাস্তব হবে যদি মনীষা নির্বাচিত হন। কৃষি পণ্য মজুদ, ইলিশ সংরক্ষণ ও রপ্তানীর জন্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য পোর্ট তৈরি, শহেরর জলাবদ্ধতা নিরসন এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অঙ্গীকার আদয়ে বরিশালবাসী কি মেয়র হিসাবে নির্বাচিত করবে মনীষা কে?





