বশির ভাইকে (ছদ্মনাম) আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। জেলার উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা। কর্মস্থলে তার বেশ সুনাম রয়েছে। সবকিছুতে যেমন তৎপর তেমন সৎ ও দক্ষ। পরিবার থাকে ঢাকায়। ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন

পরিবার বলতে স্ত্রী আর দু’ছেলেমেয়ে। আসলে ছেলেমেয়ের পড়াশোনার জন্যই তাদের বাড়ি ভাড়া করে ঢাকায় রেখেছেন। তিনি জেলা সদরে থেকে সব খেয়াল করছেন। আমি সেভাবেই জানি। এক মিটিংয়ে তার সঙ্গে পরিচয়।

এক সকালে তিনি হঠাৎ ফোন করেন। কোনো কথা বলেননি। কেবল বলেছেন, ‘খুব বিপদে আছি। দেখা করা জরুরি’।

সন্ধ্যায় চেম্বারে ঢুকেই বললেন, ‘ভাই আমি একটু সময় নিয়ে কথা বলতে চাই। জানি না আপনি আমাকে কী ভাববেন। আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমি নিরুপায়। এখন আমার বাঁচা-মরা সমান। আজ আমি একজন ব্যর্থ মানুষ, ব্যর্থ বাবা, ব্যর্থ সব…’। তার চোখ ছলছল করতে লাগল।

কিছুটা চমকে উঠলাম, কী ব্যাপার, কী হলো! অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত নামিদামি সৎ নির্ভীক একজন মানুষের এ কেমন অশ্রুস্নাত অসহায় আত্মসমর্পণ। বললাম, ‘ভাই কী ব্যাপার। কি হয়েছে..?’

‘আমি শেষ। লজ্জায় আমি কাউকে মুখ দেখাতে পারছি না এখন। আমার সব পরিশ্রম, সব আশাভরসা সবই ধুলোয় মিশে গেছে। কেন আমার মরণ হলো না…’, কান্নায় তার গলা ধরে এলো, তিনি হাত দুটো দিয়ে চোখমুখ গুঁজলেন।

কী বলব বুঝতে পারছি না। বললাম, ‘কী হয়েছে বশির ভাই…?’

‘ভাই, আমার দুই ছেলেমেয়ে ইয়াবা আসক্ত হয়ে পড়েছে..’, আর কিছু বলতে পারলেন না। হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলেন। পুরুষ মানুষরা সাধারণত কাঁদে না, কাঁদলে বুঝতে হবে ভয়ানক কোনো কিছুর আভাস।

‘এ কীভাবে হলো? ইয়াবাতে ছেলেমেয়েরা হঠাৎ করে আসক্ত হয় না। কিছু কিছু লক্ষণ দেখলে আগে থেকেই টের পাওয়া যায়। আপনারা খেয়াল করেননি?’

‘না, বুঝতে পারিনি। আমি তো ওদের সঙ্গে থাকি না, আমি তো এখানে থাকি…’।

আসলে তার জন্য না জানাটাই স্বাভাবিক। চাকরি করেন ঢাকার বাইরে। স্ত্রী ছেলেমেয়েদের রাখছেন ঢাকায়। তাদের পড়শোনা করাচ্ছেন অভিজাত এলাকার একটা নামিদিম ইংলিশ মিডিয়াম কলেজে। মা’ই তাদের দেখভাল করতেন। কিন্তু সহজ-সরল মা তাদের দিন দিন ইয়াবা আসক্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়টা একেবারেই ধরতে পারেননি।

ভাইবোন একই কলেজে পড়াশোনা, সব সময় একসঙ্গেই থাকত। রাতে বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ স্টাডি কথা বলে, কিংবা গানবাজনা কলেজের ফাংশনের কথা গিটার নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যেত প্রথম প্রথম। মা ভাবতেন, ভাইবোন এক সঙ্গেই তো যাচ্ছে। কী আর হবে। তার এ বিশ্বাস বা বেখেয়াল’টাই কাল হয়েছে।

ভাইবোন দুজনে একসঙ্গেই ইয়াবাসেবী সহপাঠী ও ইয়াবা চোরাকারবারদের টার্গেটে পড়ে যায়। তাছাড়া সহপাঠী, বন্ধু যারা ইয়াবা খায় তারা পয়সার সংকুলান করতে না পেরে একপর্যায়ে নিত্যনতুন ধনীক বন্ধুদের কৌশলে ইয়াবা বা মাদক খাওয়াতে থাকে। এটার ওটার সঙ্গে মিশিয়ে খাইয়ে ফায় ফুর্তির কথা বলে তাকে আসক্ত করে তুলে।

প্রথম প্রথম নানান ছুতোয় ফ্রি খাওয়ায়। আসক্তি করে তুলে ইয়াবাসেবীদের সবাইকে নিয়ে একটা চেইন তৈরি করে। এ জন্য তারা টার্গেট করে বন্ধনহীন, অভিভাবকশুন্য বা ব্রেকআপ ফ্যামিলি এবং ক্ষমতাবান ধনিক পরিবারের সহজ-সরল সন্তানদের। ক্ষমতাবান টার্গেট করে এ জন্য যাতে ফেঁসে না যায়, পাশাপাশি মাদক কেনার পয়সাকড়ির অভাব যাতে না হয়।

যা হোক বশির সাহেব জানালেন, কিছু বন্ধুসহ দুদিন আগে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের আটক করেছে স্কুলেরই তত্ত্বাবধানে থাকা এক হোস্টেল থেকে চরম আপত্তিকর আর নেশাগ্রস্ত অবস্থায়। পরে অভিভাবক ডেকে কলেজ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, সবাইকেই।

তার কান্না থামাতে বললাম, বশির ভাই, ‘ভেঙে পড়বেন না, ওরা কই, সঙ্গে এনেছেন..?’

‘জি এনেছি। জোর করে ধরে বেঁধে এনেছি। আসতে চায় না। দু’তিন দিন থেকে আমার কাছে এনেছি। আটকে রেখেছি। কিন্তু দুজনেই এখন পাগলের মতো আচরণ করছে। আসবাবপত্র ভাঙচুর করছে। একবার ভেবেছিলাম দুটাকে মেরে নিজে আত্মহত্যা করি…, কিন্তু পারলাম না…’। তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। মাথা নিচু করে বসে রইলেন।

বললাম, ‘ঠিক আছে। কাঁদবেন না। কান্নায় তো লাভ হবে না। ধৈর্য ধরুন। ওদের ভেতরে পাঠিয়ে দিন। আমি কথা বলে দেখি। হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কয়েক দিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। ইনশাআল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে। বড় ধরনের কোন দুর্ঘটনা যে হয়নি এতেই শুকরিয়া। নেশাগ্রস্তরা নেশার টাকা না পেলে চুরি, ছিনতাই, নানান অনাচার, অসামাজিক কাজ করতে দ্বিধা করে না। এমন কি খুন-খারাবিতে জড়িয়ে যায়। ভাগ্য ভালো আপনার, এসব কিছু হয়নি। ওদের ভেতরে আনুন…’।