খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর পরাজয়েও ‘রাজনৈতিকভাবে জয়’ দেখছে বিএনপি। দলের সিনিয়র নেতারা মনে করছেন, ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল ও জাল ভোটের ঘটনায় আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে তাদের ‘নির্দলীয় সরকারে’র দাবির যৌক্তিকতা আরও জোরদার হয়েছে। ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন
তবে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর পরাজয়ের নেপথ্যে ৮টি কারণ চিহ্নিত করেছেন তার ঘনিষ্ঠরা। এগুলো হচ্ছে কেন্দ্রীয় নেতারা কথার শক্তির সঙ্গে কাজের শক্তির মিল না থাকা, দলীয় সংহতি সৃষ্টি না হওয়া, দলীয় বিশৃঙ্খলা, মতানৈক্য ও অন্তর্কোন্দল নিরসন না করে চেপে রাখা, মামলা ও সম্ভাব্য গ্রেফতার নিয়ে তৃণমূল কর্মীদের উদ্বেগ ও প্রকাশ্যে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে না পারা, বিগত দিনে উন্নয়ন বঞ্চনার প্রচারের যুক্তিসঙ্গত জবাব দিতে না পারা, ব্যক্তি মঞ্জুর প্রতি ক্ষোভ ভুলতে না পারা ও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বেশ কয়েকজনের ফাঁসি হওয়ার পরও প্রকাশ্যে জামায়াত সংশ্লিষ্টতা।
তার নির্বাচনি কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, এবারের নির্বাচনে বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থীরা সংঘবদ্ধ ভোট চাওয়ার চেয়ে একক ভোট পেতে তৎপর ছিলেন। মঞ্জু এলাকায় গেলে ওই সব প্রার্থী সঙ্গে ছিলেন মঞ্জুর দলীয় কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে প্রচার পেতে। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে যখন তারা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি প্রচারণা চালিয়েছেন সেখানে কেবল নিজের জন্যই ভোট চেয়েছেন।
এছাড়াও সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলো জানা সত্ত্বেও মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনার সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হওয়ায় ভারসাম্যহীনতা নষ্ট হয়। পরে অবশ্য মনাকে তার প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট করা হয়। একইসঙ্গে বিএনপি নেতা আলী আসগর লবী গ্রুপের নেতা-কর্মীরা মাঠে প্রকাশ্যে না থাকাটাও ছিল চোখে পড়ার মতো।
অপরদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেকের জয়ে উজ্জীবিত আওয়ামী লীগ। ভোটের পরদিন বুধবার দলটির কার্যালয়, বিভিন্ন নেতার বাসা ও অফিসে নেতাকর্মীদের ঢল নামে। দলটির নেতারা জানান, উন্নয়ন স্লোগান দিয়ে জনগণের মধ্যে সাড়া জাগানো ও সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নামানোসহ মূলত চার কারণে দলীয় প্রার্থীর জয় হয়েছে।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য। এদিকে নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভোট পড়ার সংখ্যার দিক থেকে কেন্দ্রগুলোতে বড় ব্যবধান রয়েছে। এ নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে সর্বনিম্ন ২২ দশমিক ৬৫ শতাংশ ভোট পড়েছে।
অপরদিকে আরেকটি ভোট কেন্দ্রে ৯৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। খালিশপুরের নয়াবাটী হাজী শরীয়ত উল্লাহ বিদ্যাপীঠ (মাধ্যমিক) কেন্দ্রে একটি বাদে সব ভোট পড়েছে; যা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। এছাড়া একটি কেন্দ্রে ৯৭ দশমিক ৬০ শতাংশ ও আরেকটিতে ৯১ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোট পড়েছে।
তিনটিতেই নৌকা প্রতীকে বড় ব্যবধানে বেশি ভোট পেয়েছে। ভোট পড়ার এমন হার অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জে. (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ভোটের এ হার অস্বাভাবিক। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ ভোট পড়তে পারে। কিন্তু ৯০ ভাগ বা তার ওপরে ভোট পড়া অস্বাভাবিক। এ বিষয়টি অবশ্যই ইসির খতিয়ে দেখা উচিত।
ফল বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে গড়ে ৬২ দশমিক ১৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। ২৮৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ৯টিতে ৮০-৮৯ শতাংশ ও ৫৭টি ভোট কেন্দ্রে ৭০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। তিনটিতে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে।
১১টিতে ৭৬-৭৯ শতাংশ ও ৩৭টিতে ৭০-৭৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। অনিয়মের কারণে তিনটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। অপরদিকে ৫০ শতাংশের কম ভোট পড়েছে ২০টি কেন্দ্রে। দু’শর বেশি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৫১-৬৯ শতাংশ।
এ সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৫১ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর চেয়ে ৬৫ হাজার ৬০০ ভোট বেশি পেয়েছেন খালেক। আর মঞ্জু পেয়েছেন ১ লাখ ৯ হাজার ২৫১ ভোট।
এ নির্বাচনে মোট ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯৩ ভোটের মধ্যে ৩ লাখ ৭১ হাজার ভোট পড়েছে। এর মধ্যে ভোট বাতিল হয়েছে ৬ হাজার ৫৬৫টি ও বৈধ ভোট ৩ লাখ ৬ হাজার ৬৩৬টি। অন্য তিন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. মুজাম্মিল হক ১৪ হাজার ৩৬৩টি, জাতীয় পার্টির এসএম শফিকুর রহমান ১ হাজার ৭২টি ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী মিজানুর রহমান বাবু ৫৩৪টি ভোট পেয়েছেন। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী এ তিন মেয়র প্রার্থীই জামানত হারিয়েছেন।
নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেছেন, ‘নির্বাচনকে ঘিরে পুলিশের ব্যাপক ধরপাকড় ও বিএনপি কর্মী দমনে সক্রিয় অবস্থানের কারণে বিএনপির কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। বিজিবি ও র্যাব সদস্যরা মাঠে থাকলেও ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। নির্বাচন কমিশনে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। নির্বাচনের শুরুতেই বিএনপির ঘাঁটি ২২, ২৯, ৩০, ২৪, ২৫, ২৬, ১৯, ১৬, ১৭ নং ওয়ার্ড, খালিশপুরের সব কেন্দ্র ও দৌলতপুরের কিছু কেন্দ্রে বিএনপির কর্মীরা অবস্থান নিতেই পারেনি, যা নৌকার দখলে চলে যায়। এ নির্বাচনে ধানের শীষ যে ভোট পেয়েছে তা ছিল সকাল ১১টার মধ্যের চিত্র। এরপরই চিত্র পাল্টে যায়। বিএনপির ভোট ব্যাংকে নৌকার আঘাত হয়। বিএনপির কর্মীরা সুসংগঠিত ছিল। তাদেরকে কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে।’
মহানগর বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিডিয়া উপ কমিটির সদস্য সচিব এহতেশামুল হক শাওন বলেন, বিএনপির ভোটাররা ভোট দিতে না পারা এবং ভোট কেটে নেওয়ার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বড় দলে বিভেদ মতৈক্য থাকবেই। ক্ষোভ থাকবেই। ব্যক্তির প্রতি ক্ষোভ থাকবেই। তবে, এ নির্বাচনে ব্যক্তি নয়, প্রার্থী ছিল ধানের শীষ। আর তাই দলের কোনও স্তরেই কোনও প্রকার ক্ষোভ কাজ করেনি। সকলেই ধানের শীষের পক্ষে এক ছিলেন।





