আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিপদ-আপদের শঙ্কা রয়েছে বিএনপিতে। দলটির শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, নির্বাচনে পরাজয় নিশ্চিত করাতে, দল এবং জোটে ভাঙন ধরাতে কাজ করছে একটি বড় শক্তি।
এতে সরকারের মদদ রয়েছে বলে তারা অভিযোগ করে আসছেন। এটাকে তারা বড় বিপদ হিসেবে দেখছেন। এছাড়া দলের কিছুসংখ্যক নেতাকে অন্য দলে ভেড়ানো এবং দলের বিরোধ-কোন্দলকে তারা দেখছেন আপদ হিসেবে।
এ অবস্থায় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে দলে যে কোনো মূল্যে ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন শীর্ষ নেতারা। এ লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় নেতারা তৃণমূল সফর করতে শুরু করেছেন। এতে তারা ফল পাবেন বলে আশা করছেন। বলছেন, অনেকবার চেষ্টা করেও বিএনপি ভাঙার ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে না। মিলেমিশে ঐক্যবদ্ধভাবে তারা যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম হবেন।
জানা গেছে, নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটে ভাঙনের ‘ষড়যন্ত্র’ হওয়ার ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরেই শঙ্কা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মাঝে। খালেদা জিয়ার মামলার রায় ও তার কারাবন্দি হওয়ার আগে ও পরে এ শঙ্কা আরও বেড়ে যায়। বিএনপির শীর্ষ অনেক নেতা জাতীয় পার্টিতে যোগ দেবেন বলে সম্প্রতি দলটির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের দেওয়া বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। অবশ্য এ ধরনের উদ্ভূত যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগে থেকেই সতর্ক অবস্থান নেয় বিএনপি।
কারারুদ্ধ হওয়ার আগে খোদ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও দলের বেঈমানদের ব্যাপারে সতর্ক করে বিপদের দিনে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করার আহ্বান জানান। একই ধরনের নির্দেশনা দেন দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা তারেক রহমানও। তাদের নির্দেশনার আলোকেই বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বিএনপি। দলে ভাঙনের কোনো আশঙ্কা নেই এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি হলে সব ‘গুজব’ কেটে যাবে বলেও সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
বিএনপিতে ভাঙনের আশঙ্কার বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে শুক্রবার দলের এক অনুষ্ঠানে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিয়ে বিএনপিকে ভাঙার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, তাদের (সরকারের) আশা ছিল খালেদাকে গ্রেপ্তার করলেই বিএনপি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের সে আশায় গুড়ে বালি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন আরও ঐক্যবদ্ধ বলেও উল্লেখ করেন ফখরুল।
একই প্রসঙ্গে শুক্রবার অপর এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ভাঙাভাঙির কথা বলে লাভ নেই। বিএনপিকে ১০ বছরে কেউ ভাঙতে পারেনি, এখনও পারবে নাকি? এখন তো যুদ্ধের সময়। বিপদের সময় আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্বে বিএনপি আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার জেলে থাকার বিষয়টি বিএনপির জন্য প্লাস পয়েন্ট, আর আওয়ামী লীগের জন্য মাইনাস পয়েন্ট। খালেদা জিয়া একদিন জেলে থাকলে বিএনপির ১০ লাখ করে ভোট বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দলীয় সূত্র মতে, ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি হন। ওইদিনই দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দায়িত্ব পেয়েই তিনি দলের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তারই নির্দেশনা অনুযায়ী উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কর্মসূচি ঘোষণা ও অন্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দলের স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি ২০ দলীয় জোট, পেশাজীবী নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গেও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বৈঠক হয়।
বৈঠকে মোবাইলে তারেক রহমানও বক্তব্য দেন। এসব বৈঠকের মূল বার্তা ছিল, খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকা ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের ঐক্য ধরে রাখার সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিএনপি, ২০ দলীয় জোট ও পেশাজীবী নেতাদের সফরের ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সূত্র মতে, মামলার রায়ের আগে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ধারাবাহিক বৈঠকের অংশ হিসেবে ৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভা। এতে তিনি কারারুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন ওই দিন বলেন, যারা সব আন্দোলন-সংগ্রামে ছিল, যারা কাজ করেছে, যারা দলের সঙ্গে বেঈমানি করেনি, দলে তাদের ভালো ভালো জায়গায় অবস্থান দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়, তাহলে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে অবশ্যই তারা মূল্যায়ন পাবে। তিনি বলেন, কিন্তু যারা বেঈমানি করবে, এক পা এদিকে, আরেক পা ওদিকে রাখবে, তাদের কোনো মূল্যায়নের জায়গা নেই।
আগে ক্ষমা করার উদাহরণ টেনে খালেদা জিয়া বলেন, তারপরও আমরা কিন্তু ক্ষমা করেছি। ক্ষমা একবার হয়, বারবার হয় না। তাই আমি বলতে চাই, বিপদ এলে আসুন সবাই একসঙ্গে বিপদ মোকাবিলা করব। আর সুদিন এলে একসঙ্গে সুন্দর করে দেশ গড়ব। তিনি বলেন, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। দলের কেউ হটকারিতা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা গেছে, কারাবন্দি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ চলমান আন্দোলন জোরদার এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে উদ্ভূত যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। এলাকাভিত্তিক সফরের জন্য দলের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট নেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে জেলায় জেলায় সফর শুরু করেছেন কেন্দ্র্রীয় নেতারা। খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে মঙ্গলবার সারা দেশে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতেও শীর্ষ অনেক নেতা যোগ দেন। বাকিরা সুবিধামতো সময়ে নিজ নিজ এলাকায় যাবেন। এসব সফরের মাধ্যমে স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরোধ ও বিশৃঙ্খলা থাকলে তা মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ করা হবে। এছাড়া গ্রেফতার হওয়া নেতাকর্মীদের মুক্তির উদ্যোগ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, তৃণমূল নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য জেলায় জেলায় কাজ হচ্ছে। দলের নির্দেশনা অনুযায়ী নেতারা সেখানে সফরে যাচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেরাও দায়িত্বানুভূতি থেকে কাজ করছেন সবাই। ভেদাভেদ ভুলে সবাই এখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সূত্র মতে, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দ্রুত জামিনে মুক্ত হবেন বলে আশা নেতাদের। তবে কোনো কারণে তার মুক্তি দীর্ঘায়িত হলে চলমান শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে প্রয়োজনে আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। পাশাপাশি আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিয়ে রাখতে চায় দলটি। এরই অংশ হিসেবে তৃণমূল নেতাকর্মীদের আরও ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দলের ৭৮টি সাংগঠনিক জেলায় সফরের জন্য শীর্ষ নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলায় জেলায় সফর শুরু করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীসহ দপ্তরের দায়িত্বে নেতারা এসব সফরের বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন এবং সমন্বয় করছেন বলে জানা গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির পাশাপাশি সমমনা বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন এবং ২০ দলীয় জোটকেও মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ও পরে অনেক নেতাকর্মীকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের খোঁজখবর নেওয়ার জন্যই কেন্দ্রীয় নেতারা তৃণমূলে যাচ্ছেন।





