সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে রাজনীতি, ব্যবসা, শিল্প-সংস্কৃতির জগতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে যৌন অত্যাচারের অনেকগুলো ঘটনা প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন বেশ কয়েকজন নারী এবং পুরুষ।

হলিউডের শীর্ষ একজন প্রযোজক হার্ভি ওয়াইনস্টিনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল নীরবতা ভাঙার পালা।

বিভিন্ন পেশায় যৌন নির্যাতনের বা হয়রানির প্রতিবাদে ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে জনপ্রিয় ক্যাম্পেইন চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বাংলাদেশেও অভিযোগ উঠেছে যে, পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষাক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্র কোনো অঙ্গনেই নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা থেমে নেই। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্র বলছে, ২০১৭ সাল জুড়ে ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা যেমন বেড়েছে, সেই সাথে বেড়েছে যৌন সহিংসতায় নিষ্ঠুরতা ও ভয়াবহতা।

কিন্তু বাংলাদেশে কেন জোরালোভাবে গড়ে ওঠেনি এই ক্যাম্পেইন?
বাংলাদেশে টেলিকম কোম্পানির যেসব বিজ্ঞাপন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে তার একটি ছিল কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস নিয়ে নির্মিত একটি বিজ্ঞাপন, যেখানে অভিনয় করে রীতিমত তারকা হিসেবে দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিলেন মডেল ফারহানা শাহরিন ফারিয়া। সম্প্রতি মিডিয়া জগতের কাজের ক্ষেত্রে নানারকম হয়রানির কথা উঠে এসেছে তার এক সাক্ষাতকারে।

তিনি বলছিলেন মিডিয়া জগতে কাজ করতে হলে তার ভাষায় ‘স্যাক্রিফাইস’ করতে হয়।”আমি ছিলাম লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার ২০০৭ এর সেকেন্ড রানার আপ। মূলত যখন আমি বাংলালিংক কাস্টমার কেয়ারের বিজ্ঞাপন করি তারপর থেকে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে বাজে প্রস্তাব পাই”, বলেন ফাারিয়া।

এর আগেও তিনি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে লাইভ ভিডিও তে তুলে ধরেন নানারকম হয়রানির কথা। কিন্তু এটি নিয়ে আগে মুখ খোলেননি কেন? জানতে চাইলে তিনি জানান, সবসময়ই তিনি এ বিষয়ে প্রতিবাদ করে আসছেন। যার জন্য অনেক বড় বড় কাজ হারাতে হয়েছে তাকে।

“সরাসরি অফার করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আমাদের সাথে ‘পার্সোনাল রিলেশন’ মেইনটেইন করতে হবে। কেন আমি পার্সোনাল রিলেশন রাখবো? আমার কোয়ালিটি, বিউটি দিয়ে আমি কাজ করবো। এই অফারগুলির কারণে আমাকে অনেক কাজ ছেড়ে দিতে হয়েছে। যেখানে আমার মনে হয়েছে আমার কোয়ালিটির চেয়ে ‘স্যাক্রিফাইস’ টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”।

কেন আমাকে কাজের অফার দেয়া হলো তার সাথে এমন শর্ত দেয়া হলো? কিন্তু বাংলাদেশে কাজ দেয়ার নাম করে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তার মত অনেকের কাছ থেকেই সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসে। কিন্তু এগুলোকে কতটা গুরুত্ব দেন ইন্ডাস্ট্রির নেতৃত্ব স্থানীয় পরিচালকরা?

চলচ্চিত্র পরিচালক প্রযোজক সোহানুর রহমান সোহানের কাছে প্রশ্ন রাখা হলে তিনি বলেন, “এখানে ভালো খারাপ অনেক মানুষ আছে। কেউ ফিল্মকে হয়তো খারাপভাবে ব্যবহার করছে। তিনি (ফারিয়া) হয়তো এরকম কারো পাল্লায় পড়েছেন। দীর্ঘ ৪০ বছর কাজ করছি। তবে আমার ক্ষেত্রে এমন কখনো ঘটেনি। আবার অনেকসময় কেউ কেউ আমাদেরও প্রস্তাব দিয়ে সুযোগ নিতে চায়, যেটা কখনো সম্ভব না”।

তবে অভিযোগ থাকলে প্রমাণ নিয়ে প্রযোজক বা পরিচালক সমিতিতে জানালে তারা ব্যবস্থা নেবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। হলিউডের যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর গত অক্টোবর মাসে এক জরিপে উঠে এসেছে, ব্রিটেনে কর্মক্ষেত্রে বা পড়াশুনার জায়গায় অর্ধেক নারীই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, এমনকি এক পঞ্চমাংশ পুরুষও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

যৌন হয়রানির শিকার প্রায় ৬৩ শতাংশ নারী জানান, ঘটনার পর তারা এ বিষয়ে কোনো রিপোর্ট করেননি বা কাউকে জানান নি।
অন্যদিকে যৌন হয়রানির শিকার ৭৯ শতাংশ পুরুষ জানিয়েছেন বিষয়টি তারা নিজেদের মধ্যেই চেপে রেখেছিলেন। এছাড়া, প্রতি সাত জনে অন্তত একজন অযাচিত বা অশ্লীল স্পর্শের শিকার হয়েছেন।এরপর সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘মি টু’ হ্যাশ ট্যাগে অনেক নারী-পুরুষ জানিয়েছেন কীভাবে তারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

শারীরিক নির্যাতনের বা হয়রানির প্রতিবাদে ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে জনপ্রিয় ক্যাম্পেইন শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যৌন হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বেশ বড়সড় মিছিলও হয়েছে হলিউডে। সামাজিক মাধ্যমে হ্যাশ ট্যাগ মি টু – প্রথমে শুরু করেছিলেন সমাজকর্মী টারানা বার্ক এবং পরে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় অভিনেত্রী আলিসা মিলানো, প্রযোজক হার্ভি ওয়েনস্টিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ করার পর।
এরপর বিশ্বজুড়ে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া নারীদের অনেকেই এ প্রচারণায় এগিয়ে আসেন এবং নিজের ওপর ঘটে যাওয়া হয়রানির ঘটনা প্রকাশ্যে আনেন।

কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসব যৌন নির্যাতনের ঘটনার বিষয়ে সরাসরি মুখ খুলতে চান না কেউ। শোবিজ বা কর্পোরেট জগতের নিজেদের সাথে ঘটে যাওয়া এমন সব হয়রানির কথা জানালেও, বেশ কজনই সরাসরি বক্তব্য দিতে রাজি হননি। ঢাকার বনশ্রী এলাকার একজন নারী (ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে এখানে তার নামটি প্রকাশ করা হচ্ছে না।) কাজ করতেন নামকরা একটি প্রতিষ্ঠানে।

কিন্তু কর্মক্ষেত্রে বসের দ্বারা বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে শেষশেষ চাকরি ছেড়ে দিতেই বাধ্য হন। “একদিন গিয়ে ডেস্কে বসেছি। আমার ব্রাঞ্চের একজন বস আমাকে ফোন দিয়ে বলে ‘আজ কি রং এর ব্রা পড়ে এসেছো?’ আমি তো শক্ড হয়ে গেলাম। পড়ে বললাম আপনাকেএকটা থাপ্পড় মারবো। সে বলে মারো, তাও ভালো …আবার একদিন মেসেঞ্জারকে দিয়ে সিনেমার টিকেট কাটিয়ে এনে খবর দিচ্ছে’।