আমি খুব সাধারন একটা মেয়ে। আমাদের আত্মীয়-স্বজন সবাই ঢাকাতে থাকে। বাবার চাকুরীর সুবাদে আমরা চট্রগ্রামে থাকতাম।আমার বাবা বদলি হয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে আসেন। চট্টগ্রামে থাকতে আমি আর আমার ছোট বোন দু’জনেই পড়াশুনায় খুব ভাল ছিলাম। অনেকদিন চট্রগ্রামে থাকার কারনে সেখানকার প্রতি একটা মায়া জন্ম নেয় আমার।
বান্ধবিদের ছেড়ে আসায় মন খারাপ থাকলেও ভাবলাম কাজিনরা তো আছে ঢাকায়। আমরা দুই বোন পড়াশুনায় ভালো হওয়ায় আমাদের পরিবারের অন্যান্য কাজিনরা আমাদের দেখে হিংসে করত। আমার চাচা-চাচি এমনকি কাজিনরাও এক রকম সামনা সামনি আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে লাগল ‘এখন তো ঢাকা থাকবে, দেখা যাবে কী করে ভালো রেজাল্ট করে। আমার কাজিনরা আমাদের দুই বোনকে পাত্তা দিত না। আমাদের ঢাকাতেও ভালো রেজাল্ট হল। একদিন আমার ফুপা আমাকে রুমে একা পেয়ে এমন একটা কাজ করল, মনে হলে আমি কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলি।
আমার ফুফা আমাকে পেছন থেকে জড়ায়ে ধরে। আমি অনেক কষ্টে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলাম। আমার বাবা কে কথাটি বলার পর তিনি আমাকে ফুপার থেকে দূরে থাকতে বলে । আমার বাবা-মা সব জেনেও তাদের সঙ্গেই চলতেন, যেন কিছুই হয় নি। এতকিছু আমি আর মেনে নিতে না পেরে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হলাম। শিশুর মতো হয়ে গেলাম, গোসল, খাওয়ানো, টয়লেট সবই মা করাতেন। তখন আমার বয়স ১৬ বছর। আমাকে সাইকলোজিস্ট না দেখিয়ে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো হলো। এরপর অনেকবার স্কুলে ভর্তি হয়েছি কিন্তু রেগুলার হতে পারি নি। অসুখ প্রায়ই বেড়ে যেতো।
ডাক্তারের পরামর্শে মাঝখানে পড়াশোনা বন্ধ হল। এরপর ক্লাস নাইনে ভর্তি হয়ে রেগুলার ছাত্রী হিসেবে এস এস সি পাশ করে এইচ এস সি পাশ করলাম। ভালো ফলাফল করে তারপর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। এরমাঝে একবার ওষুধ খাওয়া বন্ধ করায় হাসপাতালে থাকতে হয়। তারপর আর কোন ভুল করিনি। আজ আমি স্বাভাবিক মানুষের মতই জীবন যাপন করছি। আমার সিজিপিএ ও অনেক ভালো। আমি বিবাহিত এবং আমার পছন্দের মানুষকেই পেয়েছি।
পরামর্শ:
প্রথমে আপনার সাহসের প্রশংসা করি যে, বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও আপনি জীবনের এতো বড় একটা সত্য প্রকাশ করেছেন। আমাদের সমাজে হাজার হাজার ভুক্তভুগি আছে যারা আপনার মত অসহায়ত্তের স্বীকার হয়েছেন। কিন্তু সেটা লজ্জায় বা লোকনিন্দার ভয়ে গোপন করে গেছেন। তারা এটা বোঝেনা যে তাদের একটু সাহস অন্যদের এই রকম ভয়াবহ বিপদের হাত থেকে রক্ষা করবে।
অপরিচিত কেউ করলে লোক লজ্জার ভয়ে সেটা গোপন করা যায়। সেটা যদি নিজের পরিবারের কোন পিশাচ করে তাহলে তো গোপনীয়তা আরো বেড়ে যায়। আপনার মতো যদি সবার সত্য বলার সৎ সাহস থাকতো তাহলে খুব সহজেই সমাজ থেকে এই রকম অমানুষদের তাড়ানো যেতো। আপনি সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, জীবনে কখনো কারও কাছে হার মানতে নেই, এগিয়ে চলার নামই জীবন।





