আগামী ২৬শে ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে। এই নির্বাচনকে ঘিরে চলছে টান টান উত্তেজনা। এরইমধ্যে মেয়র পদে উপনির্বাচনের তফসিল মঙ্গলবার (৯ জানুয়ারি) আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পূর্বেই মেয়র প্রার্থী ঘোষণা নিয়েই আলোচনা চলছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য যে কয়জনের নাম আসছে তাদের মধ্যে সেলিম উদ্দিন, তাবিথ আওয়াল এবং আতিকুল ইসলাম অন্যতম।
তাহলে কে হবেন উত্তর সিটির নগর পিতা?
জামায়াতের প্রার্থী সেলিম উদ্দিনকে ইতিমধ্যে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াত। জোটের সাথে কোন রকম আলোচনা না করেই একক সিন্ধান্ত নেয় জামায়াত। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন না থাকায় অবশ্য দলটির সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে জামায়াত প্রার্থী স্বতন্ত্র ব্যানারেই লড়তে চেয়েছিল।
কে এই সেলিম উদ্দিন: মো. সেলিম উদ্দিন ঢাকা মহানগর উত্তরে জামায়াতের আমির। এছাড়া তিনি ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি ছিলেন। ২০১৭ সালের শুরুতে জামায়াতের মহানগর শাখা দুই ভাগ হওয়ার পর তিনি উত্তরের আমির মনোনীত হন।
সেলিম উদ্দিন ইতিমধ্যে নগরীর কাফরুল, বনানী, আদাবর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় সাধারণ মানুষের সাথে মতবিনিময় করেছেন। মতবিনিময়কালে তিনি বক্তব্য তুলে ধরেন। তাতে তিনি বলেন, ‘ডিএনসিসিতে বর্ষা মওসুমে জলাবদ্ধতা সমস্যাগুলোর অন্যতম। মাঝারী মানের বৃষ্টিপাতেই ডিএনসিসির বিভন্ন এলকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। বিশেষ করে মিরপুর অঞ্চলের জলাবদ্ধতা বিষয়টি খুবই প্রকট। নাগরিক পরিসেবার আওতায় বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন, টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন সেক্টর বেশ সমস্যাগ্রস্ত। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে এসব নাগরিক পরিসেবার মান ক্রমান্বয়ে নিম্নমুখী। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও রাজউকের নকশা বহির্ভূত ইমারত নির্মাণ ও অপ্রতুল ডেনেজ ব্যবস্থাপনার কারণেই নগরীর জলাবদ্ধতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অপরিকল্পিত ও নকশা বহির্ভূত ইমারত নির্মাণ বন্ধ, নগরায়ণে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নগরবাসী জামায়াতের পক্ষে রায় দিলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।’
এদিকে ঢাকা উত্তর সিটির উপনির্বাচনে ব্যবসায়ী নেতা আতিকুল ইসলাম আতিককে নিয়েই মাঠে নামছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচন নিয়ে আলোচনার শুরুর পর থেকেই তিনি মাঠে রয়েছেন। ইতিমধ্যে তিনি নাকি দলীয় হাইকমান্ডের সবুজ সংকেতও পেয়েছেন।
সিটি এলাকার দলীয় নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময় করছেন।আতিকুল ইসলাম প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় জনসংযোগ করছেন। মতবিনিময় করছেন বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে।
২৩ নম্বর ওয়ার্ডেও গণসংযোগ করেছেন তিনি। সেখানে শ্রমিক লীগ ঢাকা উত্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। এছাড়া ময়নারটেকে স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও আলেম-ওলামাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন আতিকুল।
তিনি তার প্রচারণায় বলেন, ‘প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক ঢাকা উত্তর সিটিকে বদলে দেয়ার কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। তার কাজকে এগিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতিতে আমি নির্বাচন করবো। আনিসুল হক কাজ যে জায়গায় রেখে গেছেন আমি সেখান থেকে শুরু করতে চাই।’
কে এই আতিকুল: ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে সবার প্রিয়মুখ আতিকুল ইসলাম। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে একনিষ্ঠভাবে লেগে থাকা একজন সফল ব্যবসায়ী। এছাড়া তিনি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ছিলেন।
জামায়াত এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণার পরপরই তৎপরতা দেখা গেছে বিএনপিতেও। তবে বিএনপি নির্বাচন নিয়ে নানামুখী সংশয়ের মধ্যেও ভোটযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিগত নির্বাচনে দল মনোনীত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল এবারও মেয়র পদে মনোনয়নের প্রথম দাবিদার। দলীয় অবস্থান থেকেও প্রার্থী হিসেবে তার নাম রয়েছে সবার উপরে। তবে বিএনপি বিকল্প প্রার্থী রাখার কথাও ভাবছে।
দলের হাইকমান্ডের তরফে সবুজ সংকেত পাওয়ার পর দেশে ফিরেছেন তাবিথ আউয়াল। দলীয় নেতাকর্মীরা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। তার ব্যবসায়িক কার্যালয়েও জমে উঠছে নেতাকর্মীদের ভিড়।
তাবিথ আউয়াল এর আগে নির্বাচনি ইশতেহারে বলেছিলেন, ‘ঢাকা উত্তরের নাগরিক সমাজকে বিচ্ছিন্ন নয় বরং উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত এবং অতি দরিদ্ররাও যাতে বসবাসের সমান সুযোগ-সুবিধা পান সে ব্যবস্থা তিনি করবেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন একটি স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক এবং সকল প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন নগরীর।’
কে এই তাবিথ আউয়াল: তাবিথের বয়স ৩৬ বছর। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে (বিবিএ) স্নাতক এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানে স্নাতোকত্তর (এমএসসি) ডিগ্রী অর্জন করেন।ঢাকার গুলশানে বেড়ে ওঠা তাবিথ স্থানীয় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে ‘ও’ লেভেল (অর্ডিনারি লেভেল) ও ‘এ’ লেভেল (অ্যাডভান্স লেভেল) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হন।
পড়াশোনা শেষে গত তিন বছর ধরে বাবার মালিকানাধীন মাল্টিমোড গ্রুপেই কর্মরত আছেন তাবিথ। তিনি গ্রুপটির উপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ডিসিইউ)। মাল্টিমোড গ্রুপ বাবার প্রতিষ্ঠি হলেও এর ১৭টি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার পরিচালনা হয় তাবিথের হাতেই গত তিন বছরে তার নেতৃত্বে সবগুলো প্রতিষ্ঠান শতভাগ লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সহসভাপতির দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ব্যবসায়ের বাইরে তাবিথের সামাজিক জীবনের কথা জানা যায়। ২০০১ সালে তাবিথের বয়স যখন ২২ বছর তখন তার বাবা আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন।
জামায়াতের প্রার্থী নিয়ে সর্বশেষ অবস্থা: ঢাকা উত্তর সিটিতে (ডিএনসিসি) উপ-নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক দল জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেবে।
সোমবার (৮ জানয়ারি) রাতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে জোট নেতাদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। গত ৩ জানুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটিতে আমির ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াত।
বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া বলেন, সোমবার রাতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘শিডিউল প্রকাশের আগে অনেকেই মনোনয়নপ্রত্যাশী হতে পারেন। তবে খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তিনি যে প্রার্থী মনোনয়ন দেবেন, তাঁর পক্ষেই জোটের শরিক হিসেবে জামায়াতে ইসলামী থাকবে।’





