নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পেঁয়াজের দামের ঝাঁজে বাজার অস্থির। ইতিমধ্যে এই পেঁয়াজের তীব্র ঝাঁজে ক্রেতা সাধারণের চোখে জল পড়তে শুরু করেছে।
এবার সেই পেঁয়াজের সেঞ্চুরিতে রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ! কথাটি শুনে অবাক হলেও সত্যি। দেশের বাজারে এই প্রথম ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ। রাজধানীর কয়েকটি এলাকার মুদি দোকান ও বাজার ঘুরে দেখা গেছে এমন দৃশ্য।
ঘাটতি না থাকলেও দেশের বাজারে গত কয়েকদিনের ব্যবধানে হু হু করে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়েছে নিম্নআয়ের লোকেরা।
কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ গতকাল ৮৫-৮৮ টাকা কেজি বিক্রি করতে দেখা গেছে, যা দিন দুয়েক আগেও ছিল ৭৬-৭৮ টাকা। আর আমদানি করা পেঁয়াজ পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৭৬-৭৮ টাকা।
কারওয়ান বাজার আড়তে গতকাল প্রতি এক পাল্লা (৫ কেজি) দেশি পেঁয়াজ ৪২০ টাকা বিক্রি হয়েছে। এতে কেজিপ্রতি দর দাঁড়ায় ৮৪ টাকা। খুচরা বিক্রেতারা এ পেঁয়াজ কিনে বাছাই করে বড়টা ১০০ টাকা ও ছোটটা ৯০ টাকা দরে বিক্রি করেন। আড়তে ভারতীয় দুই রকমের পেঁয়াজ প্রতি ৫ কেজি ৩৭০-৩৮০ টাকা দর ছিল।
রাজধানীর অন্যান্য বাজারে এখন বড় দেশি পেঁয়াজ ১০০ টাকা ও ছোট দেশি পেঁয়াজ ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ভারতীয় মাঝারি লাল পেঁয়াজ কেজিতে ৮০-৮৫ টাকা, বড় আকারের পেঁয়াজ ৭৫-৮০ টাকা। অবশ্য আগে কিনে রাখা পেঁয়াজ কোনো কোনো বিক্রেতা কিছুটা কম দামে বিক্রি করতে পারছেন।
কারওয়ান বাজারের একজন পাইকারি বিক্রেতা জানান, ‘ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। তাই আমাদেরও বাড়ছে। কারণ আমাদের ঘাটতি থাকায় এ মুহূর্তে ভারতের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।’
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলছে, গত বছর এই সময়ে বাজারে পেঁয়াজের দর কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ৪০ টাকা ছিল।
দেশে কয়েক মাস ধরেই পেঁয়াজের দাম চড়া। আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে ভারত। জানা গেছে, ভারতে পেঁয়াজের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় সেখানেও দাম বেড়ে গেছে। পেঁয়াজের ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য প্রতি মেট্রিক টন ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করেছে ভারত। এতে কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন রপ্তানিমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬৯ টাকা। ভারতের এ সিদ্ধান্ত পাইকারি বাজারে ছড়িয়ে পড়ার পর এক দিনেই আমদানি করা পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ১০-১৫ টাকা বেড়ে যায়। এর সঙ্গে লাফ দেয় দেশি পেঁয়াজের দামও, বেড়ে যায় কেজিতে ১০ টাকা।
গত বৃহস্পতিবার থেকে নতুন দর কার্যকর করা হয়েছে। তবে ওই দরে পেঁয়াজ বাংলাদেশে আসার আগেই দেশের ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে দাম বাড়িয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত শুক্রবার সকালে মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেট কাঁচা বাজারে পেঁয়াজ কিনতে যান সবুজ রহমান নামের এক ব্যক্তি। একজন দোকানদার দেশি পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকা চান। শুনে চমকে ওঠেন তাজমহল রোডের বাসিন্দা সবুজ। কারণ একই দোকান থেকে গতকাল পেঁয়াজ কিনেছিলেন ৮০ টাকায়।
এ ব্যাপারে তিনি জানান, দোকানি কেজিতে ২০ টাকা বেশি চান। এক দিনে কিভাবে ২০ টাকা দাম বেড়ে যেতে পারে, সেটা তাঁর হিসাবে কিছুতেই আসে না। আর এত দামও তো কখনো দেখিনি। দোকানিও তাঁকে দাম বৃদ্ধির সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেন না।
এ ব্যাপারে ঐ মুদি দোকানি বলেন, বেশি দামে আমাদেরই কিনতে হচ্ছে। তাই বিক্রিও করছি বেশি দামে।
এক সপ্তাহ আগেও চট্টগ্রামের সবকটি বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেয়াজ বিক্রয় হয়েছিল ৬০ টাকায়। আমদানি করা ভারতীয় পেয়াজ বিক্রয় হয়েছিল ৫০-৫৫ টাকায়। এখন সেই দেশি পেয়াজ বিক্রয় হচ্ছে ৯৫-৯৮ টাকায়। ভারতীয় পেয়াজ বিক্রয় হচ্ছে ৭৫-৭৮ টাকায়। এ নিয়ে অনুযোগ বা আপত্তিজনক কোনো কথা বললেই পেয়াজের দাম আরো বাড়বে বলে জানিয়ে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ৪-৫ দিন পর দেশি পেয়াজ বিক্রয় হবে ১০০ টাকার উপরে।
আমদানি করা ভারতীয় পেয়াজ বিক্রয় হবে ১০০ টাকা দরে। আর ব্যবসায়ীদের এই কথায় রীতিমতো হতাশ ক্রেতারা। পেয়াজের দামে এত ঝাঁজের কারণও খুঁজে পাচ্ছেন না ক্রেতাদের অনেকে। তবে বিক্রেতারা বলছেন, ভারত আমদানি করা পেয়াজের দাম বাড়িয়ে দেয়ায় পেয়াজের ঝাঁজ এত বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেপ্টেম্বর মাসের দিকেও বাজারে আমদানি করা প্রতি কেজি ভারতীয় পেয়াজ বিক্রয় হয়েছিল ১৬-১৭ টাকায়। ওই মাসের শেষের দিকে এসে তা এক লাফে বেড়ে যায় ৪০ টাকায়। পরে ৬০-৬৫ টাকায় উঠে। নভেম্বর মাসের শুরুর দিকে কেজি প্রতি ১০ টাকা কমে ৫০-৫৫ টাকায় বিক্রয় হয়েছিল। কিন্তু শেষের দিকে এসে আবার একলাফে ৭০-৭৫ টাকায় উঠে যায়। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পেয়াজের এই মূল্য ১০০ টাকায় উঠবে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের আড়তগুলোতে এখন সকাল-বিকেল পেঁয়াজের দাম পরিবর্তন করা হচ্ছে। খাতুনগঞ্জ কাঁচা পণ্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, ভারতে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির খবর পাওয়ার পর থেকেই এখানে পেঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করেছে। সকালের দাম বিকেলে বদলে যাচ্ছে। নতুন আমদানিমূল্যের পেঁয়াজ দেশে এলে দাম আরো বাড়বে বলে জানান তিনি।
ঐ বাজারের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের পেয়াজ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান রাহে ভাণ্ডার ট্রেডার্সের মালিক সুফি আহমদ উল্লাহ বলেন, নিত্যপণ্যের নানা পণ্যের পাশাপাশি পেয়াজের চাহিদা পূরণেও ভারতীয় পেয়াজ আমদানির ওপর সিংহভাগ নির্ভরশীল বাংলাদেশের বাজার। তাই ভারতের বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ও কমানোর ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের পণ্যমূল্য বাড়ানো-কমানো। তিনি বলেন, ভারতের অভ্যন্তর বাজারে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল থাকলেও রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রায় দাম বাড়িয়ে থাকে দেশটি। এতে আমদানি খরচ বেড়ে পণ্যমূল্যও বৃদ্ধি পায়। এটাই স্বাভাবিক। পেয়াজের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই চলছে। ভারতের বাজারে বাংলাদেশি মুদ্রায় এখনো পেয়াজের মূল্য ২২-২৩ টাকা। কিন্তু আমদানির ওপর শুল্ক বাড়িয়ে দেয়ায় পেয়াজের মূল্য বাড়ছে। চলতি মৌসুমে বাজারে নতুন পেয়াজ না আসা পর্যন্ত পেয়াজের মূল্য আরও বাড়বে। হয়তো আরও এক মাস পেয়াজের মূল্য বাড়তির দিকে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, পাইকারি হিসেবে ৬০-৬৫ টাকায় পেয়াজ বিক্রয় করা হচ্ছে। তবে তা খুচরা বাজারে ৬৫-৭০ টাকার মধ্যে বিক্রয় করা সম্ভব। খুচরা ব্যবসায়ীরাও বেশি মুনাফার জন্য ৭৫-৭৮ টাকায় পেয়াজ বিক্রয় করছেন। এ নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
আজ শনিবার সকালে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় খুচরা বাজার কাজীর দেউড়ি, বহদ্দারহাট, চকবাজার, ফিরিঙি বাজার, ঝাউতলা বাজার, পাহাড়তলী বাজারসহ কয়েকটি বাজারে ঘুরে দেখা যায়, দেশি পিয়াজ প্রতি কেজি ৯৫-৯৮ টাকায় বিক্রয় হচ্ছে। আমদানি করা ভারতীয় পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭৫-৭৮ টাকায়; যা কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা।
এদিকে হিলি স্থলবন্দর কাঁচামাল আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন উর রশিদ হারুন বলেন, ‘আমরা ভারতের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তারা যেখানে ৮৫০ ডলার রপ্তানিমূল্য নির্ধারণ করেছে, সেখানে আমাদের কিছুই করার নেই। দাম বাড়বে এটাই স্বাভাবিক।’
অপরদিকে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ টন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। গত এপ্রিল ও আগস্ট মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের কার্যপত্রে পেঁয়াজের চাহিদা কত, তা উল্লেখ করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৩ থেকে ২৪ লাখ টন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে ১৮ লাখ ৬৬ হাজার টন, যা আগের বছরের চেয়ে ১ লাখ ৩১ হাজার টন বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, আলোচ্য সময়ে দেশে ১০ লাখ ৪১ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৩ লাখ ৪০ হাজার টন বেশি। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে পেঁয়াজের জোগান এসেছে ২৯ লাখ টন।
বিবিএসের ২০১৪ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, এক কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে গড়ে ১১ টাকা ৪৪ পয়সা খরচ হয়। দেশের অনেক চাষি ঘরের মাচায় পেঁয়াজ রেখে দেন, যা মৌসুম শেষে বিক্রি করেন। অনেক ফড়িয়া ব্যবসায়ীও পেঁয়াজ কিনে রাখেন লাভের আশায়।
দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ টন বলে ধরে নেওয়া হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, গত বছর দেশে পেঁয়াজ উত্পাদিত হয়েছে ১৮ লাখ টন। বাকি চার লাখ টনের বেশি ঘাটতি মেটানো হয় আমদানি করে। এই ঘাটতির প্রায় পুরোটাই ভারত থেকে আমদানি করে মেটানো হয়। আর এই চার লাখ টনের কথা বলে মাঝেমধ্যে পুরো বাজার অস্থিতিশীল করে তোলে অসাধু ব্যবসায়ীরা।





