ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর প্রতিবেশি দুটি দেশের নেতাদের আটকের মধ্যদিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমেই উত্তাপ ছড়াচ্ছে সৌদি আরব। ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের আগ্রাসনের মুখে মুসলিমদের পবিত্র ভূমিতে পালিয়ে আসা দেশটির প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদির বর্তমানে দিন কাটছে গৃহবন্দী অবস্থায়। তিনি দেশে ফিরতে পারবেন কিনা তা নির্ভর করছে সৌদি কর্তৃপক্ষের উপর।

একই অবস্থা লেবাননেন পদত্যাগ করা প্রধানমন্ত্রী সাদ আল হারিরি’রও। পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর অবস্থা কি, লেবাননের প্রেসিডেন্ট সৌদি আরবের কাছে তা পরিষ্কারভাবে জানতে চাইলেও এখনও উত্তর মেলেনি। গত ৪ নভেম্বর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ থেকে এক টেলিভিশন ঘোষণায় লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগের কথা জানিয়েছিলেন সাদ। এরপর থেকে তার অবস্থান নিয়ে রহস্যের জন্ম দিয়েছে। ইয়েমেনের ভূখণ্ড থেকে রিয়াদ লক্ষ্য করে হুতি বিদ্রোহীদের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইরানের বলে দাবি করে সৌদি আরব। ফলে ইরানের সঙ্গে প্রকাশ্য স্নায়ু সংঘাতে জড়িয়ে পরে দেশটি। আবার সৌদি আরবের মাটিতে বসে সাদ হারিরি অভিযোগ করেন, লেবাননে একচ্ছত্র প্রভাব তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে ইরান ও তাদের সমর্থনপুষ্ট হিজবুল্লাহ বাহিনী। ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ‘অস্থিতিশীলতা’ তৈরি করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

একদিকে ইয়েমেন, অন্যদিকে লেবানন.. দুটি দেশের আগ্রাসনের পেছনে থাকা হুতি বিদ্রোহী এবং হিজবুল্লাহ বাহিনীর পেছনে সৌদি সরকার যে দেশকে সরাসরি দুষছে, সেটি ইরান। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইয়েমেনের মনসুর হাদি এবং লেবাননের সাদ হারিরি দু’জনই সৌদি কর্তৃপক্ষের চাপের মুখে রয়েছেন। তাদের বক্তব্যের পেছনে এই চাপ কাজ করছে কিনা তা গবেষণার বিষয়। অবশ্য ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ বাহিনীকে ইরান সমর্থন দিলেও দু’দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সৌদি আরব বলছে, ইয়েমেনের ক্ষমতাচ্যুত নেতা আলী আব্দুল্লাহ্‌ সালেহ্‌ হুতি বিদ্রোহীদের সমর্থন নিয়ে দেশটির ক্ষমতা দখল করতে চাইছে। আর সেই হুতি বিদ্রোহীদের সমর্থণ দিচ্ছে ইরান। ফলে সৌদি সরকারের মতে, ঘুরিয়ে হলেও ইয়েমেনের উপর প্রভাব বিস্তার করতে চায় ইরান। অন্যদিকে, লেবাননের পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি’র দেশটিতে গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও ইরানের সমর্থনপুষ্ট শিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ্‌র কারণে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সৌদি আরবের অভিযোগ। সাদ হারিরি’ও সৌদি আরবে গিয়ে এমন মতামতই জানিয়েছেন। যদিও ইরান ও লেবাননের শিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ’র দাবি, সৌদি আরব সাদকে ‘জিম্মি’ করে রেখেছে।

এমন দাবির সত্যতাও পাওয়া গেছে! হারিরির কাছের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স রোববার জানিয়েছে হারিরিকে স্বাগত জানানোর সময় কোনও সৌদি প্রিন্স বা মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন না। বরং সৌদি আরবে আসার পরপরই কূটনৈতির শিষ্টাচারের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তার এবং সফর সঙ্গীদের মোবাইল বাজেয়াপ্ত করা হয়। আর পরদিনই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, এক সপ্তাহ আগে সাদের পদত্যাগের ওই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যকে একটি বড় ধাক্কা দিয়েছে। ঠিক যেমনটি দিয়েছিল, সৌদি জোটের কাতারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সময়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্নিদের পক্ষ নেয়া সৌদি সরকার লেবাননের সাদ হারিরি কিংবা ইয়েমেনের মনসুর হাদিকে সহায়তার কথা বললেও বাস্তব পরিস্থিতি অন্য কথা বলছে।

হারিরি পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও লেবাননের প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন তার পদত্যাগ মেনে নেননি। উল্টো প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবে কোথায় এবং কেমন আছেন তার স্পষ্ট জবাব দাবি করেছেন মিশেল। গত বছরের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট আউন সুন্নি নেতা ও ব্যবসায়ী সাদকে লেবাননের সরকার গঠনের জন্য প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করেছিলেন। লেবাননের প্রেসিডেন্ট এই হুঁশিয়ারীও দিয়েছেন, সৌদি সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করলে তা মেনে নেয়া হবে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরব সফরের পর থেকে দেশটি যে অবস্থান নিয়েছে তা রহস্যময়। কাতার, ইয়েমেন ও লেবাননকে ঘিরে সৌদি আরব যে পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে সংকটের মধ্যে ফেলবে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এরই মধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো লড়াই ধ্বংসাত্মক ফলাফল বয়ে আনতে পারে।” এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র শুক্রবার ছায়া যুদ্ধের ক্ষেত্রে হিসেবে লেবাননকে ব্যবহার না করার জন্য অন্যান্য দেশকে সতর্ক করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন জানান, হারিরি যে মুক্ত আছেন এমন নিশ্চয়তা তিনি সৌদি আরবের কাছ থেকে পেয়েছেন। তার দেশ নাকি হারিরিকে লেবাননে ফিরে যেতেও উৎসাহিত করছে।

নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের যে দেশটিতে প্রথম আগ্রাসন চালায় যুক্তরাষ্ট্র, সেটি ইরাক। এরপর জঙ্গিবাদ দমনের নামে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গুটি কয়েক দেশ বাদ দিলে প্রায় সবখানেই ছিল ওয়াশিংটনের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাব। তবে যে দেশটি মার্কিন বলয়কে সব সময় বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে, সেটি ইরান। তাই তেহরানের উপর বরারই নাখোশ যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশ সৌদি আরব। বহু আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত সৌদি আরবকে অবশ্য মধ্যপ্রাচ্য সংকটে প্রত্যক্ষ প্রভাব রাখতে আগে দেখা যায়নি। তবে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী দমনে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে যৌথবাহিনী গঠনের মধ্য দিয়ে সৌদি আরব প্রত্যক্ষভাবে সংঘাতে জড়ায়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, একদিকে ক্ষমতা ধরে রাখতে রাজ পরিবারে শুদ্ধি অভিযান অপরদিকে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে সৌদি আরবের এমন ভূমিকা পরবর্তীতে নিজেদেরকেই না শংকটে ফেলে দেয়। মক্কা এবং মদিনার মতো ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্থান দু’টি যে দেশটিতে রয়েছে, সেই সৌদি আরবের সরকারকে আরও বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়া প্রয়োজন বলেও মত বিশ্লেষকদের।