যতদিন লাগে অপেক্ষা করব, যত টাকা লাগে খরচ করব তবুও বাবার লাশটা ফেরত চাই।’ সৌদি আরবে মৃত এক হাজির লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে ব্যাকুল এক মেয়ের এ আকুতি।
রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা আবুল খায়ের মজুমদার বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পবিত্র হজ পালন শেষে গত ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে ফেরার জন্য জেদ্দা বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের কাজ করছিলেন। হঠাৎ সেখানে হার্ট অ্যাটাক করলে তাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য জেদ্দার কিং আবদুল্লাহ মেডিকেল কমপ্লেক্স অ্যান্ড হসপিটালে নেয়া হয়। পরে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তার মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একমাত্র মেয়ে মৃত বাবার মুখ শেষবারের মতো দেখতে ও লাশটি গ্রামের বাড়িতে দাফনের অভিপ্রায় জানিয়ে জেদ্দার বাংলাদেশ দূতাবাসে এক আবেগঘন চিঠি লিখেন। সেই চিঠিতে যেকোনো মূল্যে বাবার লাশটি দেশে ফিরিয়ে আনার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে।
চলতি বছর সৌদি আরবের জেদ্দাতে মৌসুমী অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে সম্প্রতি দেশে ফিরে আসা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন মঙ্গলবার ধর্ম মন্ত্রণালয়ে নিজ কার্যালয়ে বসে এ প্রতিবেদকের কাছে এবারের হজে ব্যতিক্রমী এ ঘটনার বর্ণনা দেন।
তিনি জানান, গত এক দশক যাবত প্রায় প্রতি বছর হজ নিয়ে সরাসরি কাজ করছেন। সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ পবিত্র হজ পালনকালে কোন হাজির মৃত্যু হলে সচরাচর সেই হাজির লাশ দেশে ফিরিয়ে দেন না। তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাফন দাফনের সুব্যবস্থা করেন। কিন্তু গত এক দশকে হজে মৃত কোন হাজির লাশ ফিরিয়ে আনতে কেউ আবেদন করেছেন এ সম্পর্কে তার জানা নেই। এবারই প্রথমবারের মতো আবুল খায়ের মজুমদারের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে মৃতের মেয়ে ও স্ত্রী আবেদন করেছেন, যা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা।
তিনি জানান, আবুল খায়ের মজুমদারের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রক্রিয়া চলছে। সর্বশেষ আজও (মঙ্গলবার) তিনি সৌদিতে কথা বলে জেনেছেন লাশটি দেশে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে অনুমতি পাওয়া গেছে। মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেইন পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে জানান, আবুল খায়ের মজুমদার টিএন্ডটির বড় কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি গ্রামের বাড়িতে মসজিদ ও কবরস্থান নির্মাণ করেছেন। এখন পর্যন্ত কবরস্থানে কোন লাশ দাফন হয়নি।
মৃত্যুর খবর পাওযার পর শোকে মুহ্যমান একমাত্র মেয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে লেখা চিঠিতে যেকোনো মূল্যে লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে চান বলে আবেদন করেন। প্রচলিত প্রথার বাইরে হলেও মানবিক দিক বিবেচনায় দূতাবাসও মৃতের লাশ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করছেন।
আনোয়ার হোসেইন জানান, আবুল খায়ের মজুমদার মারা যাওয়ার পর তার মূল্যবান মালামাল জেদ্দায় তাদের জিম্মায় রাখা হয়। মৃত মজুমদার একমাত্র মেয়ের জন্য স্বর্ণের নাকফুল, কানের দুল ও লকেটসহ চেইন কিনেছিলেন। তিনি দেশে ফিরে সেগুলো পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেন।
তিনি বলেন, সৌদি আরব থেকে লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা বেশ জটিল প্রক্রিয়া। এ কারণে সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই হজ পালন করতে গেলে লাশ ফিরিয়ে দেয়া হবে না বলে হজ নীতিমালায় উল্লেখ করে দেন। তাছাড়া লাশ উড়োজাহাজে আনতে একসঙ্গে চার সিটের ভাড়া পরিশোধ করতে হয়।
তিনি জানান, চলতি বছর পবিত্র হজ পালনের আগে ও পরে দেড় শতাধিক হাজি ও হজযাত্রীর মৃত্যু হয়। বিগত প্রায় এক দশকের হজের অভিজ্ঞতায় এটি একটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা বলে তিনি উল্লেখ করেন।





