ডিগ্রী পাসের খড়গে বারো শ’ রিক্রুটিং এজেন্সি : তিনশ’ মহিলা এজেন্সি বন্ধের আশঙ্কা সউদী আরবের বৃহৎ শ্রমবাজার নিয়ে অশনি সঙ্কেত দেখা দিয়েছে। বারো শ’ রিক্রুটিং এজেন্সি ডিগ্রী পাসের সার্টিফিকেট জমা দেয়ার খড়গে পড়েছে।

ঢাকাস্থ সউদী দূতাবাস থেকে হঠাৎ এক বিশেষ সার্কুলারে কতিপয় কাগজপত্রের সাথে প্রত্যেক রিক্রুটিং এজেন্সি’র স্বত্বাধিকারীর ডিগ্রী পাসের সার্টিফিকেট জমা দেয়ার আজ বৃহস্পতিবার ডেট-লাইন বেধে দেয়া হয়েছে। এতে বারো শ’ বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি বিপাকে পড়েছে।

সউদী আরবে মহিলা কর্মী প্রেরণকারী প্রায় তিনশ’ রিক্রুটিং এজেন্সিও চরম হতাশায় ভুগছেন। এ ধরনের শর্ত বাস্তবায়ন করা হলে জনশক্তি রফতানিতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। এতে মহিলা রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ভাগ্যেও অনিশ্চয়তা দেখা দিবে। জনশক্তি রফতানিকারকরা এ ধরনের অযৌক্তিক শর্ত অনতিবিলম্বে প্রত্যাহারের জোর দাবী জানিয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত হাতে গোনা কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি ডিগ্রী পাসের সার্টিফিকেট সউদী দূতাবাসে জমা দিতে পেড়েছে।

প্রায় ৯০ শতাংশ রিক্রুটিং এজেন্সি’র স্বত্বাধিকারী’র ডিগ্রী পাসের সার্টিফিকেট নেই।প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি’ও ডিগ্রী পাসের সার্টিফিকেট জমা দেয়ার সার্কুলার জারি হওয়ায় হতবাক হয়েছেন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী গত ৬ নভেম্বর তার দপ্তরে বায়রার নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপকালে সউদী দূতাবাসের ঐ সার্কুলার প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের জাতীয় সংসদ সদস্যগণের মধ্যেও অনেক সদস্যগণের ডিগ্রী পাসের সার্টিফিকেট নেই। আমাদের সম্মানীত সংসদ সদস্যগণ তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে দেশের জনগনের সেবা করে যাচ্ছেন। প্রবাসী মন্ত্রী ডিগ্রী পাসের সার্টিফিকেট দূতাবাসে জমার দিকনিদের্শনায় সৃষ্ট সংকট দ্রæত সমাধানের জন্য সউদী দূতাবাসের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন। এ সময়ে বায়রার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন, বায়রার সভাপতি বেনজীর আহমদ, সহ-সভাপতি-২ কাজী মোহাম্মদ মফিজুর রহমান, সহ-সভাপতি -৩ মোহাম্মদ আব্দুল হাই ও বায়রার কার্যনিবার্হী কমিটি’র সদস্য মোহাম্মদ নূরুল আমিন। ধর্ম মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় ষ্ট্যান্ডিং কমিটি’র সভাপতি ও সউদী-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী গ্রæপের চেয়ারম্যান বিএইচ হারুন এমপি’ও ডিগ্রী পাসের সার্টিফিকেট জমা দেয়া সংক্রান্ত নোটিশ প্রত্যাহারের জন্য সউদী দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতের সাতে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

যুগ যুগ ধরে এসব রিক্রুটিং এজেন্সি স্বত্বাদিকারীরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে সুনামের সাথে সউদী আরবে জনশক্তি রফতানি করে আসছে। সউদী’র শ্রমবাজারকে ধ্বংস করার জন্য এ ধরনের অযৌক্তিক শর্তাবলী জারি করা হয়েছে। ডিগ্রী পাস সার্টিফিকেট জমা দেয়ার সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ কালো আইন বলেও উল্লেখ করেছেন। পৃথিবীর কোনো দেশে জনশক্তি রফতানি করতে কোনো বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে দূতাবাসে ডিগ্রী পাসের সার্টিফিকেট জমা দেয়ার রীতিনীতি নেই। সউদী’র বৃহৎ শ্রমবাজারে কার ইশারায় এসব সার্কুলার জারি করা হচ্ছে তা’ খতিয়ে দেখা উচিৎ। কোনো রিক্রুটিং এজেন্সি’র স্বত্বাধিকারী কি সউদী দূতাবাসে চাকুরি করার জন্য আবেদন করতে যাচ্ছেন যে তাদের কাছে ডিগ্রী পাসের সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে। এধরনের অযৌক্তিক সার্কুলার কোনো দিনই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এতে ভ্রাতৃ-প্রতীম সউদী আরবের সাথে বাংলাদেশের সুসর্ম্পকে বিনষ্ট করার জন্য আশংকা রয়েছে। ডিগ্রী পাসের সার্টিফিকেট দূতাবাসে জমা দেয়ার সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক হিসেবে উল্লেখ করে তা’ অনতিবিলম্বে বাতিলের দাবী জানিয়েছেন একাধিক জনশক্তি রফতানিকারক। গণতান্ত্রিক দেশে সকল সাধারণ নাগরিকের ব্যবসা করার অধীকার রয়েছে। ব্যবসা করতে ডিগ্রী পাসের সার্টিফিকেট থাকতে হবে তা’ কোনো বিধিমালায় এমন দিকনিদের্শনা নেই। সরকার এ ধরনের শর্তের ভিত্তিতে কোনো রিক্রুটিং লাইসেন্স দেয়নি। অভিজ্ঞ মহল এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

দীর্ঘ দিন সউদী আরবে অলিখিতভাবে জনশক্তি রফতানি বন্ধ থাকার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যাপক কূটনৈতিক উদ্যোগের পর ২০১৫ সাল থেকে পুরোপুরি সউদীতে কর্মী প্রেরণ শুরু হয়। ২০১৫ সালে সউদীতে ৫৮ হাজার ২শ’ ৭০ জন কর্মী চাকুরি লাভ করে। ২০১৬ সালে সউদী আরবে মহিলা কর্মীসহ ১ লাখ ৪৩ হাজার ৯শ’ ১৩ জন কর্মী চাকুরি লাভ করে। গত জানুয়ারী থেকে গত ৭ আগষ্ট পর্যন্ত সউদীতে ৩ লাখ ২ হাজার ২শ’ ৭৩ জন কর্মী চাকুরি লাভ করে। এসময়ে ৪৩ হাজার ৭শ’ ৪৪ জন শুধু মহিলা কর্মীই চাকুরি লাভ করেছে।

সনজুরী ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী ও হাবের সাবেক মহাসচিব শেখ আব্দুল্লাহ গতকাল বুধবার ইনকিলাবকে বলেন, জনশক্তি রফতানি কার্যক্রমে ডিগ্রী পাসের সার্টিফিকেট দূতাবাসে জমা দেয়ার নির্দেশনাকে কালো আইন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের দিকনির্দেশনা কোনো মতেই বাস্তবায়ন সম্ভব না। তিনি বলেন, ডিগ্রী পাসের সার্টিফিকেট কোন যুক্তিতে দূতাবাসে জমা দিবো। আমরা কি দূতাবাসে চাকুরির জন্য আবেদন করতে যাচ্ছি ? তিনি বলেন, জনশক্তি রফতানিকারকরা তাদের মেধা ও যোগ্যতার বলে যুগ যুগ ধরে ব্যবসা করে রেমিটেন্স খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। ডিগ্রী পাস বিহীন হাজার হাজার শিল্প-কারখানা, গামের্ন্টস শিল্পের মালিক-পাটনাররা যোগ্যতার বলে জাতীয় অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখছেন। তিনি উল্লেখিত শর্তাবলী অনতিবিলম্বে প্রত্যাহারের জন্য সউদী রাষ্ট্রদূতের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে সউদী দূতাবাসের কাউন্সিলরের সাথে দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকে উল্লেখিত সংকট নিরসনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলেও বায়রা সভাপতি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এছাড়া গত ৭ নভেম্বর বায়রার মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ও ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. নমিতা হালদারের সাথে দেখা করে সউদী দূতাবাসের ডিগ্রী পাসের সাটিফিকেট সর্ম্পকিত বিজ্ঞপ্তি সর্ম্পকে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানান। প্রবাসী সচিব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মহাপরিচালকের সাথে টেলিফোনে বিষয়টি অবহিত করে দ্রæত সমাধানের অনুরোধ জানান।