বয়স একশ ছুঁইছুঁই। নাম বুদরুজ জামান। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে বুচিডংয়ের ইয়ংছং গ্রাম থেকে ১১দিন আগে পাড়ি জমান বাংলাদেশের উদ্দেশে। কিন্তু এতো পথ পাড়ি দেবেন কেমনে। উপায় না পেয়ে বালতিতে করে ছেলে আবুল কাশেমের কাঁধে চড়ে রওনা হন বাংলাদেশের উদ্দেশে।

বয়সের ভারে নূজ্য হয়ে পড়া প্রায় শতবর্ষী এই বৃদ্ধার দেখা মেলে টেকনাফের সাবরাংয়ের হারিয়াখালীর সেনাবাহিনীর ত্রাণকেন্দ্রে। তার সঙ্গে ছেলে আবুল কাশেম ছাড়াও পরিবারের আরও ছয় সদস্য আছেন।

শুধু আবুল কাশেম নন, মিয়ানমার থেকে আরও অনেক রোহিঙ্গা তাদের বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে অনেক কষ্টে বাংলাদেশ আসেন। কখনো পাহাড়ি পথ, কখনো জঙ্গল, নদী আর বিল পার হয়ে আসতে হয়েছে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে। কারো কারো এই পথ পাড়ি দিতে সময় লেগেছে ১২-১৩ দিন। এই দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে শুধু নিজের জীবনই বাঁচাননি। বাঁচিয়েছেন নিজের স্ত্রী-সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মাকে। বৃদ্ধ বাবা-মাকে বোঝা মনে করেননি তারা। তাদের কাঁধে করে বহন করে নিয়ে এসেছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। অনেক ঝক্কি-ঝামেলার পর বাবা-মা তাদের কাছে বোঝা হয়নি।

আবুল কাশেম জানান, মিয়ানমার সীমান্তের নাফ নদীর কিনারায় ১০ দিন ধরে নৌকার অপেক্ষায় ছিলেন তারা। অবশেষে ১১ দিনের মাথায় বুধবার ভোরে দুই লাখ কিয়াতের বিনিময়ে বাংলাদেশে আসতে সক্ষম হয়েছেন।

তিনি জানান, ধংখালী বালুচর এলাকায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসার জন্য অপেক্ষায় আছেন। এপার থেকে নৌকা বা বোট না যাওয়ায় অর্ধাহারে-অনাহারে দিনাতিপাত করছেন তারা। এছাড়া কোনো কোনো পরিবার ২০ দিন, ১৫ দিন, ১০ দিন পর্যন্ত সীমান্তের বালুচরে অপেক্ষায় আছেন। সবাই বুচিডং থানার বিভিন্ন গ্রামের রোহিঙ্গা মুসলিম। খাদ্য ও পানি সংকটে রোহিঙ্গা শিশু ও বৃদ্ধরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

বুচিডং জেইডং গ্রাম থেকে আসা মৃত জিয়াউর রহমানের স্ত্রী লায়লা বেগম এই প্রতিবেদককে জানান, ২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিংসতা শুরুর পরদিন বর্মী সেনাদের গুলিতে তার স্বামী জিয়াউর রহমান মারা যান। এরপর থেকে তিন ছেলে মো. জুনাইদ (১২), যমজ সন্তান মো. জুনাইদ (৭) ও মো. ইয়াছকে (৭) নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। কিন্তু খাবার সংকটের কারণে অর্ধহারে-অনাহারে কয়েকদিন মানবেতর দিন কাটান। পরে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার কথা শুনে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।

এদিকে গতকাল বিভিন্ন ত্রাণকেন্দ্র ঘুরে অনেককে দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ দিতে দেখা গেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনুমতিক্রমে অনেকে খাদ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের সাহায্য করছেন। বিভিন্ন সংস্থা বিস্কুট ও পানি সরবরাহ করছেন। বাংলাদেশে সেনাবাহিনীসহ বেশ কয়েকটি মেডিকেল টিম অসুস্থ রোহিঙ্গাদের সেবা দিচ্ছেন।