ভারতের টালিগঞ্জ এলাকার প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো এই মাজারের নাম নাকি দূর-দূরান্ত বিস্বস্ত। মঙ্গলবার দুপুর দুটোয় সপরিবারে হাজির বেহালা, শখের বাজারের রিন্টু সর্দার।
বয়স বাইশ। কয় দিন ধরেই মতিগতি অস্বাভাবিক। রাত হলেই চোখ লাল। কথা অসংলগ্ন। খালি বলে, ওই আমায় ডাকছে…ডাকছে। আমি চলে যাব। ভূতে ধরেছে নাকি তাকে। তাই নিয়ে আসা হয়েছে বাবার কাছে। বাবা ইশা আলি শাহর পর, আজ প্রায় সাতাশ বছর ধরে মাজার দেখভাল করছেন ইশার ছেলে, হালিম আলি। ছাড়িয়েছেন অসংখ্য ভূত। কত…৭০-৮০ হবে? না-না, তারও অনেক বেশি। একশোরও বেশি। ওরা কি ভূত…মানে হিন্দু ভূত? না-না, হিন্দু-মুসলিম-খ্রিশ্চান-ডোম-চামার…কে নেই। আজকাল তো সুইসাইড, ট্রেনে কাটা…অনেক কিছুই হচ্ছে। আচ্ছা, এই ভূত ছাড়াতে গিয়ে, ভূতেদের সঙ্গে যে কথা বলেন, ওদের দেখতে পান? ভূত দেখা যায় নাকি! তবে কথা বলে। না হলে জানব কী করে!
এই যে রিন্টুর ভূতটাকে চেপে ধরা হল, তাই জানতে পারলাম। কী জানলেন? ভূতটা কী বলল? ছেলেটা দুদিন আগে, রাতে কলাগাছের নীচে দাঁড়িয়ে হিসি করেছিল। ওই গাছেই ছিল ভূত…খপ করে ধরল। তাড়িয়ে দিলেন? এটা কোনও ব্যাপার! কত ছ্যাঁচড়া ভূত তাড়িয়ে ছাড়লাম। ছ্যাঁচড়া ভূত? সে এক ছিল, শেখ সাহেব। ইউ পি-র। ব্যাটার ২১ জনের টিম ছিল। ভূতের টিম? উফ…ব-হু-ত জ্বালিয়েছে। তারপর? ওটাকে ইউ পি-র আকবর স্টেশনের কাছাওছা শরিফে পাঠিয়ে শান্তি দিয়েছি। আচ্ছা, ভূত একটু নিরীহ, ভালো মানুষ দেখলে বেশি ধরে, তাই না? রাশি বোঝেন, রাশি? যাঁদের হাল্কা রাশি, যাঁরা ভীতু, তাঁদেরই ভূত বেশি ধরে। মরেছে, তা হলে উপায়? চিন্তা নেই। তাবিজ আছে। ছোটদের থেকে বড়দের দাম বেশি। ওটা পরে থাকলে, ভূতের বাপের সাধ্যি নেই ধরবে।
২। রেওয়া দাস। (বয়স ৯০) দাবি, ছেলে-মেয়ে-বিবাহিত-অবিবাহিত-আইবুড়ো সব ধরনের ভূত হয়
প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড। নবীনা সিনেমা থেকে, হাত কয়েকের দূরত্ব। বাঁ-হাতি গাছতলার নীচে বাবার ছাউনি। আস্তানা। সকাল সাড়ে ১১-টাতে হাজির, রামনারায়ণ ভট্টাচার্য। যাদবপুরের বাসিন্দা। সরকারি কর্মচারি। সমস্যা, সারা শরীরে ব্যথা। সমাধান, বাবা-র ঝাড়-ফুঁকেতেই নাকি ব্যথা…যাবে যথা-তথা। হাজির টালিগঞ্জের পূজা শর্মা। পরিবারের লোক নাকি পিছনে লেগেছে তার, প্রোমোটারের কাছে বাড়ি বেচে দেওয়ার জন্য। শুনে বাবা কুল। সকলের শরীরে হাত বুলিয়ে, কানে মন্ত্র বলে, বাতলে দিচ্ছেন সমাধান।
আপনি কি শুধু ঝাড়-ফুঁকই করেন…? ধুস, এই সব তো মামুলি। আট বছর বয়স থেকে থেকেছি কামাক্ষ্যায়। তারপর গিরিডি হয়ে, কলকাতা। ৫০-৬০ বছর হয়ে গেল। কত ভূত-জিনকে ঘাড় ধরে তাড়ালাম। এখান থেকে? এখানে… আশপাশে, দমদম-কাশিপুর-ডায়মন্ড হারবার-মল্লিকপুর…কোথায় না? কত ভূত পালালো। কত? সে মনে আছে নাকি? ৪০-৫০? তারও অনেক বেশি। বুঝতে পারতেন, তারা ছেলে না মেয়ে ভূত? মানে! তাদের সঙ্গে কথা বলতাম, বুঝতে পারতাম না! ছেলে-মেয়ে-বিবাহিত-অবিবাহিত- আইবুড়ো…সব, সব। ওই ভূতগুলো খামোকা অন্যকে ধরে কেন? সে ভূতেরা জানে, আমার কী দরকার? আমি ওদের হটিয়ে দিই। কী করে? মারেগা ধারা ভাগেগা ভূত, ইয়ে হাত সিদ্ধিকা পুত… মন্ত্র বলে, ঘাড় ধরে ওদের চুলের মুঠি ধরলেই, ব্যাটারা পালায়। কেন? আপনি বুঝবেন না। ভূতেরা বোঝে? ভূতের মন্ত্র ভূতেরাই বোঝে। আপনি আসুন তো।
৩। বাসুদেও দাস। (বয়স ৬২) দাবি, ভূত পুকুরে স্নানও করে
হাজরা মোড় এলাকার এক পোড়ো বাড়ি। ঘরে ঘরে জনা-কয়েক বাসিন্দা। সামনের মস্ত উঠোনে ঝকঝকে শিব মন্দির। সেখানে থাকেন বাসুদেও দাস। আশপাশের মানুষ জানে ভূতে ধরলে, সেই ভূত ছাড়ায় বাসুদেও। এই তো সামনের চায়ের দোকানের মহিলাই একবার এসেছিল। ওর এক আত্মীয়কে ভূত ধরেছিল। গেলাম, তাড়িয়ে এলাম। কে ধরেছিল? ওর পরিবারেরই লোক। জানতে পেরেছেন ভূতটা কে? হ্যাঁ, না হলে তাড়ালাম কী করে! কী করে? মন্ত্র বলে! সেই মন্ত্রই তো আমার জানা। কত ভূত তাড়িয়েছেন অ্যাদ্দিনে? মনে আছে নাকি! অ-নে-ক। ওরা যে যায়, কিছু চায়? কেউ কেউ পুজো, পিণ্ডি চায়। কেউ আবার পাঁঠা-মুরগি বলি…ঠিক নেই। আচ্ছা, এমন ভূত পেয়েছেন, যে মহা ঝামেলাবাজ? সেটা তো এই বাড়িতেই হয়েছিল। কী রকম? দেশ থেকে একটা মেয়ে এসেছিল। আইবুড়ো। ওকে ধরেছিল, দেশেরই এক রাজপুত ছেলে। রাজপুত? তাই তো বলল। কে? ভূতটা। যখন বললাম, বল তুই কে? তখন বলল। ও মেয়েটাকে কেন ধরেছিল? বলল, পুকুরে ও যখন স্নান করছিল, তখন মেয়েটা ওকে দেখেছে। তাই রেগে ভর করেছে। সে কী! সাঙ্ঘাতিক। গ্যাং নিয়ে এসেছিল। ভূতের গ্যাং? হ্যাঁ, চারজনের টিম। সব কটাকে তাড়িয়েছি। বলেন কী? ওই জন্যই তো কেসটা মনে আছে।
৪। বসিরুদ্দিন ওয়ারসি (বয়স ৬৫) কানে তেল ঢেলে প্রশ্ন, কে তুই
একদিনের জন্য কটক গিয়েছিল রবি। গড়িয়ার আদর্শনগরের রবি শেট্টি। বোনের সাধ উপলক্ষে। পরদিন কলকাতা ফিরেই চেনা রবির অচেনা রূপ! আপাত শান্ত রবি কাজ করে রাসবিহারী মোড়ের গেস্ট হাউসে। স্ত্রী, পুত্র নিয়ে সুখের সংসার। কিন্ত্ত…কটক থেকে ফিরতেই কেলেঙ্কারি! রুদ্রংদেহি মেজাজে আয়না-টিভি ভেঙ্গে, নিজের পাঁচ বছরের ছেলেকেও আছড়ে মারতে চায় সে! তার ভয়ঙ্কর রূপ দেখে, স্ত্রী ঝর্ণা থামাতে গেলে, রবির মুখ থেকে নাকি হিসহিসিয়ে বের হয় একটাই কথা, তোর রবিকে আমি মেরেই ছাড়ব। তুই ওকে বাঁচাতে পারবি না।
স্বামীকে বাঁচাতে ঝর্ণা তাই সপরিবারে মঙ্গলবার দুপুরে এসেছেন বাবার কাছে। রবির ভূত ছাড়াতে। বাবা অবিচল। জানেন করণীয়। তাই পীর বাবার জল তার গায়ে ছিটিয়ে, খাওয়ালেন কিছুটা। তারপর মন্ত্রপুত তেল কানে ঢেলে, আঙ্গুল দিয়ে চেপে, রবির চুলের মুঠি ধরে তাঁর প্রশ্ন, বল তুই কে? যে রবি এতক্ষণ চুপ, এবার তার মুখে কথা, আমি ফকুয়া। ওকে ছেড়ে যাবি? যাব। যা, পালা। বলতেই পালালো ভূত। রবি শান্ত। স্ত্রী সুখী।
কতদিন তাড়াচ্ছেন ভূত? দশ বছর। সব রকমের? হ্যাঁ-হ্যাঁ, কত রকমের ভূত আসে। ভূতের ঠিক থাকে? তবু… ভালো-খারাপ ভূতও তো থাকে? সে ছিল এক… বেহালার বকুলতলার। শালা খুব শয়তান। স্কুলের একটা বাচ্চা মেয়েকে ধরেছিল। ওকে ছাড়াতে সাতদিন লেগেছিল। ছেড়ে যেতে নাকি ভূত বায়না করে? বায়না! কীসের বায়না? উপস্থিত একজন বললেন, ভূত পাঁঠা-মুরগি বলি চায়। ওই সব আমার থেকে চাইবে? দেব ব্যাটাকে। কাকে? ভূতকে, আবার কাকে! বাপরে! আসি? আসুন।





