গেল বছরের ৬ নভেম্বর ফরিদপুরের পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন সুভাষ চন্দ্র সাহা। ৭ নভেম্বর স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে মতবিনিময় করেন তিনি।

ফরিদপুরের আইন শৃংখলারক্ষাসহ বিভিন্ন কাজে সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করে নবাগত পুলিশ সুপার সুভাষ চন্দ্র সাহা বলেন, তিনটি বিষয়ে আমি কোনো ছাড় দিতে রাজি নই। এ তিনটি বিষয়ে আমার মনোভাব থাকবে একেবারেই ‘জিরো টলারেন্স’। এ তিনটি বিষয় হলো, মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবারের ওপর কোনো অন্যায় সহ্য করা হবে না, দ্বিতীয়ত কোনো নারীর প্রতি অন্যায় অবিচার হলে সে যত বড় শক্তিশালীই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। আর তৃতীয়ত, যারা অসহায় তাদের ওপর কোনো জুলুম-অন্যায় করা হলে জড়িতদের কোন ছাড় দেয়া হবেনা।

পুলিশ সুপার আরো বলেন, ফরিদপুর জেলাকে দেশের অন্য জেলাগুলোর তুলনায় ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই। যাতে করে অন্যজেলার মানুষ ‘ফরিদপুর’কে নিয়ে গর্ব করতে পারে। সুভাষ চন্দ্র সাহা বলেন, সন্ত্রাস, মাদক, ইভটিজিংসহ অপরাধমুলক কর্মকান্ডে যারা জড়িত রয়েছে তাদের কোনো ছাড় নেই। আমার কাছে কোনো তদবির চলবে না।

পুলিশ সুপার বলেন, আমার উপর আপনারা আস্থা রাখতে পারেন। আমি নতুন এসেছি। আমার কাজই বলে দেবে আমি ভাল না, খারাপ। কোথাও কোনো অন্যায়-অবিচার হলে আপনারা আমাকে জানাতে পারবেন। আমি দ্রুত ব্যবস্থা নেবো-এটা আপনাদের প্রতিশ্রুতি দিতে পারি।

সভায় বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ কামরুজ্জামান, ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ইমতিয়াজ হাসান রুবেল, সাংবাদিক প্রফেসর মোঃ শাহজাহান, আবদুল মতিন ফকির, আতম আমীর আলী টুকু, জাহিদ রিপন, পান্না বালা, নাজিম বকাউল, নির্মলেন্দু চক্রবর্তী শংকর, মশিউর রহমান খোকন, সেলিম মোল্লা প্রমুখ।

মতবিনিময় সভায় ফরিদপুরে কর্মরত ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

ফরিদপুরের পুলিশ সুপার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) সুভাষ চন্দ্র সাহা ও তার স্ত্রী রীনা চৌধুরীরর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জন করায় দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক আবদুল ওয়াদুদ বাদি হয়ে মামলা করেন।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে দশটায় বংশাল থানায় তিনি এ মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নম্বর ৩৭।

দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুভাষ চন্দ্র সাহা ও তার স্ত্রী রীনা চৌধুরীর যৌথ নামে ওয়ান ব্যাংক বংশাল শাখার ছয়টি হিসাবে দুই কোটি ৮১ লাখ চৌদ্দ হাজার ৪৬৬ টাকার, এলিফ্যান্ট রোড শাখার একটি এফডিআর-এ ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৪২টাকা এবং ওয়ান ব্যাংকের যশোর শাখায় ১২টি এফডিআর-এর ৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা অবৈধ অর্থ রয়েছে।

দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে এসপি ও তার স্ত্রী এসব অর্থের বৈধ কোনো পন্থা না দেখাতে পারায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে।

দুদকে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) জমা দেয়া আয়কর নথির কোথাও এ বিপুল অংকের টাকার কথা উল্লেখ করেননি তারা।

এর আগে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান করে দুদক।

দুদকের অনুসন্ধানে পুলিশ সুপার সুভাষ চন্দ্র সাহা ও তার স্ত্রী রীনা চৌধুরীর যৌথ নামে ৮ কোটি ৩৬ লাখ ৭০ হাজার ৩৬৭ টাকার এফডিআর পাওয়া যায়।

ওয়ান ব্যাংকের রাজধানীর বংশাল শাখা, এলিফ্যান্ট রোড শাখা এবং যশোরের ওয়ান ব্যাংক শাখাতে গচ্ছিত ছিল এ বিপুল অংকের টাকা।

কিন্তু পুলিশ সুপার ওই অর্থ দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণী কিংবা আয়কর নথিতে উপস্থাপন না করে গোপন রেখেছেন। এমনকি দুদকের অনুসন্ধানেও ওই আয়ের যথাযথ উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তাই অনুসন্ধান কর্মকর্তার সুপারিশ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই-বাছাই শেষে স্ত্রীসহ পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধ মানিলন্ডারিং আইনের ৪(২) ধারায় একটি মামলা দায়ের করার অনুমোদন দেয় কমিশন।

কে এই সুভাষ চন্দ্র সাহা?
মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার রাধানগর গ্রামের মৃত সূর্য কান্ত সাহার সন্তান সুভাষ চন্দ্র সাহা। নিজ গ্রামের স্কুল থেকে মানবিক শাখা হতে ১৯৮৮ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেন। ১৯৯০ সালে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে মানবিক শাখায় এইচএসসি পাশ করেন। এরপর ১৯৯৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্থনীতিতে অনার্স ( সন্মান) এবং ১৯৯৪ সালে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে ৪র্থ স্থান নিয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী সম্পন্ন করেন ।

২১তম বিসিএস এ উত্তির্ণ হয়ে ২০০৩ সালের ১০ মে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে মৌলভীবাজারে যোগদান করেন। এরপর তিনি একই পদে সিলেট সদর, বরগুনা ও পিরোজপুর এর বিভিন্ন সার্কেল এর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে পিরোজপুর, কুষ্টিয়া, যশোর ও সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসাবে পদোন্নতি পান। ২০১৫ সালের ৫ই মে পুলিশ সুপার হিসাবে পদোন্নতি লাভ করেন। একইবছর ১৪ই জুন ঝালকাঠি জেলা পুলিশ এর দায়িত্বভার পান। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ৬ই নভেম্বর ফরিদপুর জেলার পুলিশ সুপার হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ।

এক যুগের বেশি সময় দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন এর কারণে কৃতিত্ব পূর্ণ অবদান এর জন্য চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি তাকে পি পি এম ( সেবা) পদকে নাম ঘোষণা করা হয় ।

উল্লেখ্য, প্রতি বছর বিশেষ অবদানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে পিপিএম ও বিপিএম (বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল) পদক প্রদান করা হয় । সাহসিকতা ও সেবা এ দু’টি ক্যাটাগরিতে এসব পুরস্কার দেয়া হয়। এ বছর ১৩২ জনকে পদক দেওয়া হয়। এর মধ্যে তিনি একজন।

চলতি বছরে গোড়ার দিকে রায়েরবাজার পুলিশ লাইন্সে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট থেকে তিনি পিপিএম পদক গ্রহণ করেন।