গত তিন বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম ধারাবাহিক পারফরমার শাহরিয়ার নাফীস। চারদিনের ম্যাচ কি একদিনের খেলা, সবখানেই দারুণ খেলেছেন। রানের ফুলছড়ি ছুটিয়েছেন। দলের জয়েও সামনে থেকে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের কোন পর্যায়েই বিবেচনায় আসছেন না এ ওপেনার।

আয়ারল্যান্ড ‘এ’ দলের বিপক্ষে সম্প্রতি ঘোষিত বাংলাদেশ ‘এ’ দলেও রাখা হয়নি তাকে। নাকের অস্ত্রোপচারের কারণে চলতি জাতীয় লিগে খেলেননি নাফীস। আর এই খেলার বাইরে থাকাই হলো কাল! এ কারণেই তাকে 'এ' দলে নেওয়া হয়নি বলে সোমবার জানিয়েছেন নির্বাচক ও বাংলাদেশ ‘এ’ দলের ম্যানেজার হাবিবুল বাশার সুমন।

গত বুধবার বাংলাদেশ ‘এ’ দল ঘোষণার পর নাফীসকে না নেওয়ার কারণ হিসেবে ইনজুরির কথা বলেছিলেন হাবিবুল। এই প্রসঙ্গে মুঠোফোনে পরিবর্তন ডট কমকে সোমবার আরেকটু ব্যাখ্যায় গেলেন বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়ক, ‘নাফীস আমাদের বিবেচনায় ছিল। কিন্তু ওর একটা অস্ত্রোপচার হয়েছে নাকে। তাই আমরা ওকে দলে রাখিনি।’ তবে নাকের অস্ত্রোপচারের পর এখন সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন নাফীস। নিয়মিত অনুশীলনও করছেন উত্তরায়। ফিটনেস ধরে রাখার জন্যও জিমেও ঘাম ঝরাচ্ছেন নিয়মিত। এইসব কথার রেশ টেনে আনতেই হাবিবুলের জবাব, ‘আসলে ও এই বছরে কোন ম্যাচ খেলেনি। তাই আমরা জানিনা ওর ফিটনেসের কি অবস্থা।’
আসলে চলতি বছরে এর মধ্যেই দুটি টুর্নামেন্ট খেলেছেন নাফীস। বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ খেলার পর ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন লিগে খেলেছেন। দুটিতেই দারুণ ব্যাট করেছিলেন। রানার্স আপ হওয়া প্রাইম দোলেশ্বরের হয়ে প্রিমিয়ার লিগে ১৬ ম্যাচে করেছেন ৬০০ রান। যা আসরের পঞ্চম সর্বোচ্চ। দলকে চ্যাম্পিয়নশিপ রেসে রাখতে রেখেছেন বড় ভূমিকা। এর আগে বাংলাদেশ লিগেও (ফার্স্ট ক্লাস) ৮ ইনিংসে তৃতীয় সর্বোচ্চ ৪৯১ রান এসেছিল নাফীসের ব্যাট থেকে।
তাই হাবিবুলের কথার পিঠে চলে আসে এইসব পরিসংখ্যান। কিন্তু নির্বাচকদের কতোকিছু খেয়াল রাখতে হয়! পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে হাবিবুল বললেন, ‘ও শেষ কবে ম্যাচ খেলেছে? সেটা জুন মাসে। আর এখন অক্টোবর মাস। চার মাস পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে ওর ফিটনেসের কি অবস্থা তা আমরা জানিনা। তার উপর নাকের অস্ত্রোপচারের কারণে জাতীয় লিগ খেলছে না। তাই ধরেই নেওয়া যায় খেলার মতো ফিটনেস ওর নেই।’ তাহলে কি গত তিন বছরে নাফীসের ভুরি ভুরি রান কোন বিবেচনায় নেই? বাশারের ভাষায়, ‘ও আমাদের বিবেচনায় ভালো মতোই ছিল। কিন্তু ও জাতীয় লিগ খেলেনি তাই আমরা ওর বর্তমান অবস্থা জানিনা।’ সোজা কথা, মাঝের এই কয়েক মাসের বিরতিটাই 'এ' দলে জায়গা পাওয়ার প্রশ্নে নাফীসের বিরুদ্ধে চলে গেলো!
জাতীয় দলে শীর্ষ ব্যাটসম্যানদের টানা ব্যর্থতাও প্রাথমিক দলে সুযোগ করে দিতে পারছে না নাফিসকে! এবার হায়গা হলো না ফেরার সিঁড়ি 'এ' দলেও। রোববার বিকেলে ফিল্ডিং অনুশীলনের সময় আল-আমিন জুনিয়রের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মারাত্মক আহত হন ওপেনার সাইফ হাসান। এক্স-রেতে চিড় ধরা পড়ে। ফলে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ শেষ হয়ে যায় তার। তার পরিবর্তে দলে ডাকা হয় মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান মেহেদী হাসানকে। ওপেনারের পরিবর্তে ওপেনার না নিয়ে মেহেদীর উপর আস্থা রাখছেন নির্বাচকরা। তবুও সুযোগ নেই নাফীসের।
নাফীস কি আশা করেননি তার এই বছরের পারফরম্যান্স অন্তত 'এ' দলে জায়গা করে দেবে? পরিবর্তনকে এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান বললেন, ‘আমি জানিনা এসব ব্যপারে। শুনেছি আমার নাকের ইনজুরির কারণে এ দলে নেওয়া হয়নি।' নিজের রানের হিসেবটা তার কাছে খুব আছে। সেই ধারাবাহিকতার কথাই যেন আক্ষেপের সুরে বেরিয়ে আসে ৩২ বছরের খেলোয়াড়ের কণ্ঠ থেকে, ‘এই বছরে জাতীয় লিগে খেলতে পারিনি কিন্তু আগের তিন বছরে ফার্স্ট ক্লাসে তিন হাজার রান করেছি। তবে এখন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ্য। গত কয়েক দিন থেকেই অনুশীলন করছি। গতকাল একটা প্রস্তুতি ম্যাচও খেলেছি। নিয়মিত জিম করছি। আল্লাহর রহমতে ফিটনেসও ভালো। সুযোগ দিলে খেলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছি।’
সুস্থ থাকলে জাতীয় লিগে খেলছেন না কেন কিংবা সামনে কি খেলবেন? নাফীস জানালেন, ‘আমার নাকের হাড় বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া মাংসও বেড়ে গিয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর ঠিক হতে ৭/৮ দিনতো সময় লেগেছে। তবে এখন ঠিক। আর জাতীয় লিগ তো এখন শেষ। আর এক রাউন্ড বাকি। এবার জাতীয় লিগে খেলা হচ্ছে কই? বৃষ্টি আর বৃষ্টি। তার চেয়ে আমি ঢাকায় নিয়মিত অনুশীলন করছি, খেলায় আছি। এটা কি ভালো না?’
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে গত মৌসুমে ১২ ম্যাচে ৬২.০৫ গড়ে ৩টি শতক ও ৭ অর্ধশতকে ১১১৭ রান করেছেন নাফীস। আগের মৌসুমে ১০ ম্যাচে ৬৪.২৩ গড়ে ২ সেঞ্চুরি ও ৭ ফিফটিতে করেছিলেন ১০৯২ রান। আর জাতীয় দলের হয়ে ২৪ টেস্টে ১২৬৭ রান ও ৭৫ ওয়ানডেতে চারটি সেঞ্চুরিসহ ২২০১ রান করেছেন টাইগার এই ব্যাটসম্যান। কিন্তু এতো এতো রানের পরও বারবার কি অবহেলার শিকার হচ্ছেন না তিনি? এই প্রশ্নটা নাফীস নিজে করলে কি তাকে দোষ দেওয়া চলে?