গ্রিসে একটি স্ট্রবেরি ক্ষেতে শ্রমিকরা বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে খামার মালিক ও সুপারভাইজার তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে ৩০ শ্রমিক আহত হন। যার মধ্যে ২০ জন বাংলাদেশি শ্রমিকও রয়েছেন।
আহতদের বেশির ভাগ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন এবং বাকিরা আশঙ্কামুক্ত বলে সেখানকার স্থানীয় পত্রিকাগুলোয় খবর বেরিয়েছে। খবরে আরো প্রকাশ, গত ১৭ এপ্রিল পশ্চিম গ্রিসের এথেন্স থেকে প্রায় ২৬০ কিলোমিটার দূরে মানোলাদা এলাকায় পেলোপন্নেসিয়ান গ্রামের একটি স্ট্রবেরি খামারে এ ঘটনা ঘটে।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় খামার মালিক ও সুপারভাইজারকে কর্তৃপক্ষ আটক করে। পরে আরো ৩ জনকে আটক করা হয়। ঘটনার পরপরই গ্রিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান এবং আহতদের খোঁজ-খবর নেন। আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে বলা হয়েছে গ্রিসে সাম্প্রতিককালে শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীবন-জীবিকার জন্য মানুষ বিদেশ-বিভূঁইয়ে পাড়ি দেয়। কাজ করে, আয়- রোজগার হয়, তার একটি অংশ নিজেরা খরচ করে বাকিটা পরিবার-পরিজনের জন্য দেশে পাঠায়। কিন্তু বিদেশে গিয়েও যদি শ্রমের ন্যায্য মজুরি না জোটে তবে তার চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী ঘটতে পারে? এমন ঘটনা কারো কাছেই প্রত্যাশিত নয়।
গ্রিসের যে এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে সেখানে হাজার হাজার অভিবাসী কর্মী কাজ করেন। সেখানে অভিবাসী শ্রমিকের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনাও নতুন কোনো বিষয় নয়। আগেও এরকম নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। সেখানকার খামারে অমানবিক কাজের প্রতিবাদে ২০০৮ সালে শ্রমিকরা হরতাল করে বলে প্রচার মাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। মানোলাদা এলাকার স্ট্রবেরি বর্জনের জন্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয় জোর প্রচারাভিযান শুরু হয়েছে।
ওইসব খামারের স্ট্রবেরিকে ‘রক্তাক্ত স্ট্রবেরি’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় একটি মানবাধিকার সংস্থার এক প্রতিবেদনে গ্রিসে বিশেষ করে নব্যনাৎসী গোল্ডেন ডন পার্টির হাতে অভিবাসীদের হয়রানি ও নির্যাতনের কথা উঠেছে। গ্রিসে শ্রমিক নির্যাতনের মাত্রা বাড়ছে বিশেষ করে দেশটিতে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেওয়ার পর থেকে। শুধু গ্রিস নয় গোটা ইউরোপ জুড়ে চলমান আর্থিক সংকট কত ভয়াবহ আর সেখানে অবস্থানরত প্রবাসী শ্রমিকের অবস্থা কত মারাত্মক আকার ধারণ করেছে তা সহজেই অনুমান করা যায় এ ঘটনা থেকে। সারা গ্রিসজুড়ে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য অভিবাসীতো রয়েছেই। শ্রমিকদের ওপর গুলি বর্ষণের ঘটনার পর সবাই এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তারা।
জনসংখ্যার আধিক্যের আমাদের এই দেশের বড় সম্পদ জনশক্তি। জনশক্তিকে দক্ষ ও যোগ্য করে কাজে লাগানো গেলে জাতীয় উন্নয়নে তার অবদান হবে বিশাল। যে কারণে বিদেশে জনশক্তি রফতানিকে নানাভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বর্তমান সরকারের জিটুজি পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানির উদ্যোগটিও প্রশংসিত। বেসরকারি উদ্যোগে বিদেশ গিয়ে নানাভাবে প্রতারিত হতে হয় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী জনশক্তিকে। বেতন-ভাতা নিয়ে প্রবঞ্চনা, চাকরির নিশ্চয়তা না থাকা, অবৈধ হিসেবে পরিগণিত হয়ে দুর্বিষহ জীবন-যাপনে বাধ্য হতে হয় তাদের। জাতীয় সংসদে দেওয়া মন্ত্রীর তথ্য মতে, বর্তমানে বিশ্বের ১৫৭টি দেশে বাংলাদেশের প্রায় ৮৫ লাখ কর্মী রয়েছেন। সরকারের আয়ের খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত। তুলনামূলকভাবে এ খাতের আয় বৈদেশিক সাহায্যের সাত গুণেরও বেশি।
জিডিপিতে এর অবদান হচ্ছে ১১ দশমিক ১ শতাংশ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের ১১ গুণ। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিলের সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ ৪৭১ কোটি ২০ লাখ ২ হাজার ৮১১ টাকা। অন্যদিকে, গত এক বছরে চাকরি হারিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে ৩৯ হাজার ৪০১ জন কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন। একই সময়ে বিদেশে নানা কারণে মৃত্যুবরণ করা ২ হাজার ৬১৮ জন বাংলাদেশি কর্মীর মৃতদেহ দেশে এসেছে বলেও তিনি জানান।
বিদেশে আমাদের দূতাবাসগুলোয় কর্মরতদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সুবিধা-অসুবিধা দেখভাল করা, তাদের খোঁজ-খবর রাখা, নিরাপত্তা দেওয়া, ন্যায্য মজুরি পাওয়া প্রভৃতি বিষয়ে তাদের এক ধরণের গাফিলতি থাকে। যার ফলে প্রবাসীরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবৈধ ঘোষিত হয়ে অনেক বাংলাদেশি কারাবরণ করছেন। গ্রিসের ঘটনার পর সেখানকার দূতাবাসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল গেছেন-এজন্য তাদের সাধুবাদ। কিন্তু সেখানে যে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি শ্রমিকরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন সে খোঁজ কি তারা আগে পাননি? বিদেশে আমাদের মিশনের কর্মকর্তারা যদি আগে থেকে খবর পেয়ে থাকেন তবে তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি কেন? নাকি তারা জানতেনই না। এসব বিষয়ে জোরালো তদন্ত হওয়া দরকার। সরকারকে উদ্যোগ নিয়ে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোকে সক্রিয় করে তুলতে হবে।
বিশেষ করে প্রবাসীদের নিরাপত্তার স্বার্থে। বিদেশে আমাদের যেসব শ্রমিকের বৈধতা থাকে না তাদের বৈধ করতে সহায়তা প্রদান, কাজের ন্যায্য মজুরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা, সর্বোপরি তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়ে যথেষ্ট সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। গ্রিসের ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সুস্থ করে তুলতে, তাদের বেতন-ভাতা আদায়ে সহায়তা প্রদান ও গুলির ঘটনায় আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়ে তৎপর হতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা নেওয়া জরুরি বলে আমরা মনে করি। তাহলেই শুধু গ্রিস নয় বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মনেও আস্থা ফিরে আসবে।





