নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুনকে ফোন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কুরুচিপুর্ন মন্তব্য করার অভিযোগে শিলা খাতুন (২৪) নামে এক যুবতীকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।

শহরের স্টেশন বাজার এলাকা থেকে গত রোবাবার (১ অক্টোবর) তাকে আটক করা হয়।

আটক শিলা খাতুন নাটোরের সিংড়া উপজেলার কলম পালপাড়া গ্রামের রহিম মিয়ার মেয়ে।

এদিকে ওই যুবতীকে গ্রেফতার করা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন স্থানে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সহ ঘটনাটি টক অব নাটোরে পরিনত হয়েছে।

জেলা প্রশাসক কার্যালয় সুত্রে জানাযায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা ৩৯ মিনিটের সময় ০১৭৮৪৫৬৫৮৮৪ নম্বর থেকে জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুনের সরকারী মোবাইল ফোনে ফোন করে জানতে চায় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিনা। ফোন করে সে প্রদানমন্ত্রীকে গালিগালাজ করে।

প্রথমে বিষয়টি নজরে না আনলেও পরে ওই মেয়েটি আবারো জেলা প্রশাসকের মোবাইল ফোন নম্বরে ফোন করে পুনরায় প্রধানমন্ত্রীকে গালিগালাজ করে।

ফোনে জেলা প্রশাসককে জানায় সে নাটোর শহরের হরিশপুর শিবমন্দির থেকে ফোন করছে। ফোন করে করার পর সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে কুরুচিপুর্ন শব্দ ব্যবহার করে জানতে চায়, প্রধানমন্ত্রী হিন্দুদের জন্য এত কিছু করছেন মুসলমানদের জন্য করছেননা কেন?

এসময় জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তথা সরকার কয়েক লাখ মুসলিম রোহিঙ্গাদের থাকা খাওয়ায় ব্যবস্থা করেছে তা সে জানে কিনা? উত্তরে সে চুপ থাকে কোন কথা বলেনা।

পরে জেলা প্রশাসক বিষয়টি জেলা পুলিশ সুপারকে অবহিত করেন। জেলা পুলিশের নির্দেশে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি পুলিশ) মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্ত করে। তার নাম ঠিকানা সংগ্রহ করে রোববার তাকে শহরের স্টেশন বড়গাছা (স্টেশন বাজার) এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।

নাটোর ডিবি পুলিশের ওসি আব্দুল হাই জানান,মেয়েটির নাম শিলা খাতুন। তিন বোনের মধ্যে সে মেজ। মা গৃহীনি রুবিনা বেগম। বাবা রহিম মিয়া অন্যের জমিতে চাষাবাদ করেন। আটক শিলা তার ছোট বোন রহিমাকে নিয়ে স্টেশন বাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকে। সে দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়েছে। এইচএসসি পাশ করেনি।

সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিকদার মশিউর রহমান জানান, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে একটি মামলা হয়েছে। বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ‘পূজামন্ডপ থেকে নম্বর নিয়ে শিলা খাতুন গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে আমার সরকারি নম্বরে ফোন করেন। এ সময় শিলা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে অকথ্য ভাষা ব্যবহার করে গালিগালাজ করে।

ফোন কেটে দিলে পুনরায় ফোন দিয়ে গালিগালাজ করেন। বিষয়টি পুলিশ সুপার বিপ্লব বিজয় তালুকদারকে জানানোর পর মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং করে তাকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।

সে তাকে ফোন করে বলে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিনা। ফোনে আমার সাথে কথা বলার সময় সে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করে গালি দেয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তার ক্ষোভ দেখে মনে হয়েছে সে রাষ্ট্র বিরোধী কোন কাজের সাথে জড়িত থাকতে পারে। তার বিরুদ্ধে মামলা করে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে ঘটনাটি সামাজিক গণমাধমে প্রচারিত হওয়ায় অনেকের মনকে নাড়া দিয়েছে। তারা ঘটনাটির প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। আবার অনেকেই জেলা প্রশাসনের কাছে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবী জানান।

গ্রেফতারকৃত শিলা সম্পর্কে বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্য মতে জানাযায়, সে একজন যাত্রা শিল্পি। যাত্রা শিল্পের ওপর কড়াকড়ি আরোপের কারনে যাত্রা শিল্পিরা দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে অভাব অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। খেয়ে না খেয়ে জীবন কাটাতে গিয়ে অনেক নারী শিল্পিকে বেছে নিতে হয়েছে দেহ ব্যবসা। বেকার হয়ে পড়া শিল্পিদের একজন শিলা নামের এই মেয়েটি। পেট চালাতে গিয়ে নিজের সম্ভ্রম টুকু বিকি করতে হয়েছে। এখন তাকে সবাই খারাপ মেয়ে হিসেবেই জানে। এজন্য বাবার পৈত্রিক ভিটাতেও জায়গা মিলছেনা। গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে।

যাত্রা শিল্পের ওপর দুর্ভোগ নেমে আসায় জীবন বাঁচাতে দেহ বিক্রি করতে হওয়ায় মেয়েটি হয়ত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। তার ধারনা যাত্রা শিল্পের ওপর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নজর দিলেই হয়ত তাকে এই দেহ ব্যবসায় নামতে হতোনা। এই এমন ভাবনা থেকেই ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ায় হয়ত সে এমনটি করে থাকেত পারে বা কেউ তাকে ইন্ধন যুগিয়েছে। তথ্য অনুযায়ী মেয়েটা হত দরিদ্র। বাবা দিনমজুর কৃষক। অন্যের জমি চাষ করে সংসার চালান। দরিদ্রতার তাড়নায় এমনটি করতে পারে মেয়েটি। আবার কারো চক্রান্তে ও এমনটি করতে পারে।

জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারন সম্পাদক সৈয়দ মোস্তাক আলী মুকুল প্রকৃত সত্য উদঘাটন করার পর মেয়েটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবী করেছেন। ইঞ্জিনিয়র রোকন উদ দৌলা গালাগালি করার জন্য মেয়েটিকে ভৎসনা করলেও দারিদ্রতার কারনে এমনটি হতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

তবে তিনি আবেদন জানান, নিরপরাধ হয়ে যেন সে শাস্তি না পায়। কেউ কেউ কাউসিলিংসহ পুর্নবাসনের দাবী করেছেন। অনেকের মত অপরাধির শাস্তি হোক ,তবে যেন নিরীহ পরিবার নয়।

নাটোর টিভি রিপোটার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা নবীউর রহমান পিপলু ফেসবুকে তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর বিরুদ্ধে যে কোন অশালীন উক্তি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে মেয়েটি মানসিকভাবে সুস্থ কি না তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি। সেই সাথে ঘটনাটির পেছনে কোন অশুভ শক্তির সংযোগ আছে কি না তাও খতিয়ে দেখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনুরোধ করেন তিনি।