মিরসরাইয়ে গহীন পাহাড়ে সন্ধান পাওয়া রহস্যজনক সুড়ঙ্গটির মুখ মাটি দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। বুধবার (২৭ সেপ্টম্বর) দুপুরে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ ও হিঙ্গুলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে সুড়ঙ্গটির মুখ ভরাট করা হয়। ঢুল্লাছরি এলাকার গহীণ পাহাড়ে প্রায় ৪০ ফুট দৈর্ঘ্য সুড়ঙ্গের খবরে গত মঙ্গলবার সারাদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয়দের আলোচনায় ছিলো বিষয়টি।

জোরারগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ জাহিদুল কবির জানান, বুধবার দুপুরে স্থানীয় হিঙ্গুলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যান নাসির উদ্দিন হারুনের উপস্থিতিতে সুড়ঙ্গের মুখ মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়া হয়েছে। সুড়ঙ্গের ভেতরে তল্লাশি করে কিছু পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে কোনো বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে এটি ব্যবহার হতো। স্থানীয় উৎসুক জনতা সুড়ঙ্গের ভেতর প্রবেশ করার জন্য মাটি কেটে এটির মুখ বড় করে ফেলে। সুড়ঙ্গের ভেতরের অংশ অনেকটা সুরু। সুড়ঙ্গে ঢোকা ও বের হওয়ার রাস্তা একটিই। বের হওয়ার জন্য বিকল্প কোনো মুখ নেই। পাহাড়ে সুড়ঙ্গের খবরে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু নেই বলে জানান তিনি।

হিঙ্গুলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন হারুন বলেন, বুধবার দুপুরে ঢুল্লাছরি পাহাড়ের সুড়ঙ্গটির মুখ মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়া হয়েছে। এসময় জোরারগঞ্জ থানার এসআই এমরান ও সাইফুল উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি আরো বলেন, সুড়ঙ্গের মুখ বন্ধ করার আগে এটির ভেতর কিছু আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হয়। এসময় ভেতরে কিছু পাওয়া যায়নি। সুড়ঙ্গের খবরে এলাকায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে বলে এটির মুখ মাটি দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে ওখানে কলা গাছের চারা রোপণ করা হয়।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, সুড়ঙ্গটি দেখে মনে হয়নি এটি কোনো বন্যপ্রাণী করতে পারে। সুড়ঙ্গের গভীরতা, দৈর্ঘ্য এবং মাটি কাটার দৃশ্য দেখে ধারণা করা হচ্ছে এটি মানুষের তৈরী। জনবিচ্ছিন্ন পাহাড়ে এত বড় সুড়ঙ্গের বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কদিন আগেও অলিনগর বনবিটের আওতায় থাকা ঢুল্লাছরির পাহাড়গুলো জঙ্গলে আবৃত ছিল। সম্প্রতি সরকারের বনবিভাগ নতুন বনায়নের জন্যে পরিস্কারের কাজ শুরু করলে এখানকার পাহাড়গুলো ন্যাড়া হয়ে পড়ে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর জঙ্গল পরিস্কারের কাজ করতে গিয়ে বিশেষ কায়দায় খোঁড়া সুড়ঙ্গটি (স্থানীয় ভাষায় বাংকার) দেখতে পান স্থানীয় দক্ষিণ অলিনগর গ্রামের বাসিন্দা মঞ্জুর আলম।

সুড়ঙ্গের ভেতরে ঘুরে আসা দক্ষিণ অলিনগর গ্রামের বাসিন্দা নুরুল হুদা বলেন, আমরা পাহাড়ে ছোট বেলা থেকে গাছের বাগান পরিচর্যা, সবজি চাষ, ধান চাষ করলেও আগ কখনো এমন সুড়ঙ্গ দেখিনি। পাহাড়ে সুড়ঙ্গের সন্ধান পাওয়ার খবর শুনে মঙ্গলবার দুপুরে সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করি। আধা ঘন্টা গিয়েও সুড়ঙ্গের শেষ পর্যন্ত যেতে পারিনি। প্রায় ৩৫ ফুট যাওয়ার পর আর ভেতরে যাওয়া যাচ্ছে না। সুড়ঙ্গের মুখ দিয়ে ১০-১৫ হাত ভেতরে যাওয়ার পর দু’পাশে আরো দুইটি সুড়ঙ্গ দেখা গেছে।

সুড়ঙ্গের ভেতর ১০-১২ হাত পরপর ৪-৫ জন বসে কথা বলার মতো প্রশস্ত জায়গা আছে। সুড়ঙ্গের ভেতরে দু’পাশে এমনভাবে মাটি কাটা হয়েছে মনে হয় ধারালো খন্তা (মাটির কাটার যন্ত্র) ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া মাটিতে বালি ও কয়লা দেখা গেছে। ৩৫ ফুট যাওয়ার পরে আমি আর ভেতরে ঢুকতে পারিনি। সার্জ লাইটের আলোতে মনে হয়েছে আরো ১০-১৫ ফুট ভেতর পর্যন্ত সুড়ঙ্গ রয়েছে।

সুড়ঙ্গের ভেতর ঘুরে আসা নেছার আহমদ বলেন, সুড়ঙ্গের ভেতর আরো দু’টি সুড়ঙ্গ দেখা গেছে। আমি সুড়ঙ্গে প্রবেশের সময় প্রায় ৮০ হাতের একটি পাহাড়ি লতা নিয়ে যায়। ৭০ হাত পর্যন্ত যাওয়ার পর আর ভেতরে যেতে পারিনি। ওখানে সুড়ঙ্গের মুখে মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয়েছে। মাটিগুলো সরানো গেলে আরো ভেতরে যাওয়া সম্ভব হবে। সুড়ঙ্গের ভেতর অনায়াসে দু’জন হামাগুড়ি দিয়ে যেতে পারবে।

স্থানীয় দক্ষিণ অলিনগর এলাকার বাসিন্দা নিজাম উদ্দিন বলেন, ঢুল্লাছরি এলাকার পাহাড়গুলো অনেকটা গহীন জঙ্গলে ডাকা থাকে। ওখানে স্থানীয়দের আনোগোনা তেমন একটা থাকে না বলে তিনি জানান।-নয়াদিগন্ত।

গত মঙ্গলবার উপজেলার হিঙ্গুলী ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের ঢুল্লাছরি এলাকার গহীণ পাহাড়ে প্রায় ৪০ ফুট দৈর্ঘ্য সুড়ঙ্গটির সন্ধান পাওয়া যায়। জনবিচ্ছিন্ন এলাকায় এত বড় সুড়ঙ্গের খবরে আতঙ্ক দেখা দেয় স্থানীয়দের মাঝে। এর আগে ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে উপজেলার মিরসরাই সদর ইউনিয়নে তালবাড়ীয়া গ্রামের মন্দিরা টিলায় প্রায় একই দৈর্ঘ্যরে একটি সুঁড়ঙ্গের সন্ধান মেলে। এরপর ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে উপজেলার একই ইউনিয়নের মহামায়া লেক এলাকায় আরো একটি সুঁড়ঙ্গের সন্ধান পায় স্থানীয়রা। মিরসরাইয়ের বিভিন্ন পাহাড়ে একেরপর এক সুড়ঙ্গ পাওয়ার খবরে এলাকাবাসীর ধারণা কোনো উগ্রবাদী সংগঠন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য পাহাড় কেটে সুড়ঙ্গ করে তা ব্যবহার করতো। একেরপর এক সুড়ঙ্গের সন্ধান পাওয়া গেলেও প্রশাসন বরাবরের মতো নীরব। আগেরগুলোর মতো ঢুল্লাছরি পাহাড়ের সুড়ঙ্গটির মুখও মাটি দিয়ে বন্ধ করে দেয় প্রশাসন।