মিয়ানমারের একজন মন্ত্রী বলেছেন, যে রোহিঙ্গা মুসলিমরা বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে তাদের সবাইকে ফিরে আসতে দেয়া হবে না।

মিয়ানমারের পুনর্বাসন বিষয়ক মন্ত্রী ইন মিয়াট আয় বলেন, যে রোহিঙ্গারা প্রমাণ করতে পারবে যে তারা মিয়ানমারে বাস করতো এবং মিয়ানমারের নাগরিক – শুধু তারাই ফিরে যেতে পারবে।

বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন, এর ফলে মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারবে এমন রোহিঙ্গার সংখ্যা হবে খুবই সীমিত কারণ বেশিরভাগ রোহিঙ্গাকেই নাগরিকত্ব দেয়া হয়নি।

গত দু সপ্তাহে রাখাইন প্রদেশে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর প্রায় তিন লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলিম সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

অন্যদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টান্যাশনাল বলছে, তাদের কাছে এমন প্রমাণ আছে যে মিয়ানমার – বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর ভূমি-মাইন পেতে রেখেছে।

এর আগে সপ্তাহে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষও এমন দাবি করেছিল। বলা হয়েছিল যে মিয়ানমার থেকে পলায়নরত রোহিঙ্গা মুসলিমরা যাতে আবার সেদেশে ফিরে যেতে না পারে – সে জন্যই সীমান্তে মাইন বসানো হয়েছে।

অ্যামনেস্টি বলছে, তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং তাদের নিজস্ব অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এ দাবি করছে। মাইন বিস্ফোরণে এ পর্যন্ত একজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন, বলছে অ্যামনেস্টি।

রোহিঙ্গাদের দুঃসাহসিক অভিযাত্রা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উগ্র বৌদ্ধদের ভয়াবহ বর্বরতার চিত্র গণমাধ্যমে তুলে ধরছেন। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা, কুপিয়ে হত্যা, নারীদের নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন তারা।

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা মুসলমানরা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের পেলেই নির্মমভাবে হত্যা করছে। খুনের পর গুম করা হচ্ছে লাশ। আবার কখনও সেই লাশ নিয়ে উল্লাস করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা। বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। শিশুদেরও পুড়িয়ে মারছে।

কখনও কখনও মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে শিশুদের। বাবা-মায়ের সামনে ছেলেকে, স্ত্রীর সামনে স্বামীকে, সন্তানের সামনে বাবাকে কখনও গুলি করে, আবার কখনও গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছে। যারা জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চাইছে তাদেরও রেহাই নেই। খুঁজে পেলেই হত্যা করা হচ্ছে। নৌকা দিয়ে পাড়ি দেয়ার সময়ও হত্যা করা হচ্ছে অনেককেই।

প্রাণ বাঁচাতে স্রোতের বেগে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা কয়েকশ’ তরুণ-যুবক-মধ্যবয়সী কাঁধে অথবা পিঠে করে বয়ে নিয়ে এসেছেন অক্ষম বৃদ্ধ বাবা-মাকে। বর্ষার এই প্রতিকূল পরিবেশও তাদের পথে বাধা হতে পারেনি। নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের জীবন বাঁচাতে যেন তারা দুঃসাহসিক অভিযানে নেমেছেন। তাদের সহযাত্রী হয়েছেন নারী ও শিশুরাও। যখন তারা আর এগোতে পারছেন না জিরিয়ে নিচ্ছেন। বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকার পর তাদের ভয় অনেকটাই কমে গেছে। এ কারণে তারা বিশ্রাম নিয়ে আস্তে আস্তে এগোচ্ছেন। অনেকেই আবার কাদার মধ্যেই বিশ্রাম নিয়ে পা বাড়াচ্ছেন।

জাতিসঙ্ঘ শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা শুক্রবার জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় দুই লাখ ৭০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন স্টেট থেকে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন।

নাফ নদীর ওপারে এখনও হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন। তারা যেন বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করতে পারলেই বেঁচে যান। বন, জঙ্গল, পাহাড় আর নদী পেরিয়ে যারা বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন তারা নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন। তাদের গন্তব্য এখন টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প। যদিও সেখানেও নেমে এসেছে মানবিক বিপর্যয়।

গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও পুলিশের হত্যাযজ্ঞের মুখে তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা ইতোমধ্যে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। অব্যাহত রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া। সীমান্তের এপার থেকে প্রতিদিনই রোহিঙ্গাদের ঘববাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। অভিযানে হেলিকপ্টার গানশিপেরও ব্যাপক ব্যবহার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা যাতে ফিরতে না পারে সেজন্য সীমান্তে পুঁতে রাখায় হয়েছে স্থলমাইন। মাইন বিস্ফোরণে ইতোমধ্যে কয়েকজন আহতও হয়েছেন।

এ দফায় রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা তিন লাখ ছাড়াতে পারে বাংলাদেশের ভেতর মিয়ানমার থেকে পালানো রোহিঙ্গাদের ঢল অব্যাহত রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো ধারণা করছে, শরণার্থীর সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এদের আশ্রয় বা খাবার জোগাড়ে প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে।