পদ্মার ভাঙন ও তীব্র স্রোতের মুখে আজ সোমবার ভোরে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ওয়াপদা লঞ্চঘাটে নোঙর করা তিনটি লঞ্চ একসঙ্গে ডুবে গেছে। এ ঘটনায় পাঁচ দিনের নবজাতকসহ তিন যাত্রী এবং তিন লঞ্চের ১২ জন কর্মচারী নিখোঁজ হয়েছে।
লঞ্চ তিনটি উদ্ধারে যৌথভাবে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর দুলারচর এলাকায় এমভি মৌচাক লঞ্চটির সন্ধান পেয়েছে ডুবুরিরা।
নড়িয়া থানা ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ডুবে যাওয়া লঞ্চ তিনটির মধ্যে এমভি মহানগর ও নড়িয়া ২ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে নড়িয়ার ওয়াপদা ঘাটের উদ্দেশে রাতে ছেড়ে আসে। ভোর ৫টায় লঞ্চ দুটি ওয়াপদা ঘাটে নোঙর করলে যাত্রীরা নেমে যায়। অন্ধকার থাকায় নবজাতক শিশু নিয়ে একটি পরিবার নামার অপেক্ষা করতে থাকে। এমভি মৌচাক ২ ওয়াপদা ঘাটে আগে থেকেই বাঁধা ছিল। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে হঠাৎ পদ্মাপাড়ের একটি বিরাট অংশ নদীতে ভেঙে পড়ে এবং পানির তোড়ে দুটি লঞ্চ ঘটনাস্থলেই পানির নিচে তলিয়ে যায়। অপর লঞ্চটি উল্টে গিয়ে পানিতে ভাসতে থাকে।
স্থানীয়রা জানায়, রবিবার রাত ১০টায় ঢাকার সদরঘাট থেকে এমভি নড়িয়া ২ লঞ্চটি ছেড়ে আসে। ওই লঞ্চে নড়িয়া উপজেলার লোনসিং গ্রামের মোহাম্মদ আলী ফকির, তার স্ত্রী পারভীন আক্তার (২৮), তার পাঁচ দিনের শিশু সন্তান এবং তার শাশুড়ি ফকরুন্নেছা যাত্রী হিসেবে ছিলেন। তারা ঘাটে লঞ্চটি নোঙর করা হলেও ভোরে অন্ধকার থাকায় লঞ্চ থেকে নেমে যাওয়ার জন্য দেরি করছিলেন। লঞ্চ থেকে তাদের নামার প্রস্তুতির সময় লঞ্চটি ডুবে যায়। মোহাম্মদ আলী ফকিরকে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও তার পরিবারের বাকি সদস্যরা নিখোঁজ রয়েছে।
নড়িয়া থানা পুলিশ একই পরিবারের তিনজন ও ১২ জন লঞ্চ স্টাফের নিখোঁজের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে। নিখোঁজরা হলেন লঞ্চের যাত্রী নড়িয়া উপজেলার লোনসিং গ্রামের মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী পারভীন বেগম (২৮), পাঁচ দিনের শিশু সন্তান ও তার শাশুড়ি ফখরুন্নেছা বেগম এবং তিন লঞ্চের ১২ জন স্টাফ কর্মচারী। পাঁচ দিন আগে ঢাকার একটি হাসপাতালে সিজারের মাধ্যমে একটি মেয়ে শিশুর জন্ম দেন পারভীন বেগম। নবজাতককে নিয়ে লঞ্চে করে বাড়ি ফিরছিলেন তারা।
নিখোঁজ লঞ্চ কর্মচারীরা হলেন রবীন সিকদার, লিটন শেখ, মানিক সরদার, বশির, রফিক, জাকির, পলাশ, সজল তালুকদার, শাহ আলম ও সালাউদ্দিন। তিন যাত্রী ও ১২ জন লঞ্চ কর্মচারী নিখোঁজ থাকার তালিকা প্রস্তুত করেছে নড়িয়া থানা পুলিশ। এ ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয়রা ট্রলার নিয়ে নদী থেকে ছয়জন লঞ্চ কর্মচারী ও যাত্রী মোহাম্মদ আলী ফকিরকে উদ্ধার করে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেছে। পরে লঞ্চ কর্মচারীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তারা হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন। মোহাম্মদ আলীকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় শরীয়তপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মিজানুর রহমানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে, স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনীর ১১ সদস্যের একটি ডুবুরিদল ও সেনাবাহিনীর কর্মীরা উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছেন। শরীয়তপুর নৌপুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা ডুবে যাওয়া লঞ্চ ও নিখোঁজদের উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রত্যয় নামের বিআইডাব্লিউটিএ'র একটি উদ্ধারকারী জাহাজ, ঢাকা থেকে ফায়ার সার্ভিসের একটি ডুবুরিদল এবং খুলনা থেকে নৌবাহিনীর ১৫ সদস্যের একটি ডুবুরিদল ঘটনাস্থলে পৌঁছে ডুবে যাওয়া লঞ্চ ও নিখোঁজদের উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
উদ্ধারকারী জাহাজ এমভি প্রত্যয় বিকেল ৫টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। ডুবুরিরা ঘটনাস্থল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর দুলারচর এমভি মৌচাক ২ নামের লঞ্চটির সন্ধান পেয়েছে। দুলারচর থেকে এমভি মৌচাক লঞ্চটি উদ্ধারের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রত্যয়। পদ্মাপারের ওয়াপদা ঘাটে নিখোঁজদের স্বজন ও উৎসুক জনতার ভিড় বাড়ছে।
বিআইডাব্লিউটিএ'র পরিচালক কমোডোর মোজাম্মেল হোসেন, চাঁদপুর পোর্টের উপপরিচালক মাহামুদুল হাসানসহ জেলা প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ এহসান শাহ বলেন, "লঞ্চডুবির খবর জানার সাথে সাথে আমরা ঘটনাস্থলে চলে আসি। নৌপুলিশের একটি দল ও ফায়ার সার্ভিস ইতিমধ্যে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছেন। আমরা ১৫ জন নিখোঁজের নাম জানতে পেরেছি। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনা থেকে বিআইডাব্লিউটিএ, ফায়ারসার্ভিস ও নৌবাহিনীর ডুবুরিদল ইতিমধ্যে শরীয়তপুরে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে।
শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) মাহবুবা আক্তার বলেন, "ফায়ার সার্ভিস, নৌপুলিশ, নৌবাহিনী ও বিআইডাব্লিউটিএ'র ডুবুরিদল ডুবে যাওয়া লঞ্চ ও নিখোঁজ থাকা লোকদের উদ্ধার কাজ চালাচ্ছে। একটি লঞ্চের সন্ধান পাওয়া গেছে। লঞ্চটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। ঘটনাস্থলে মেডিক্যাল টিম রয়েছে। এ ঘটনা তদন্তের জন্য পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।





