মিয়ানমারে ২৪ আগস্টের সেনা অভিযানের পর থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসেছে। গত বছরের অক্টোবরের পর বাংলাদেশে আসে ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। এবার সংখ্যাটি আগেরবারের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
জাতিসংঘের স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংবাদটি প্রকাশ করে সংস্থাটি।গতকাল স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত চার দিনে টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ৩৩টির বেশি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছে। এর আগের আট দিনে এসেছে আরও ৬০ হাজার। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেছেন, ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা ঢুকেছে বলে তিনি জেনেছেন।
এদিকে হুড়োহুড়ি করে নাফ নদী পারাপার করতে গিয়ে গত চার দিনে রোহিঙ্গাবোঝাই ছয়টি নৌকা ডুবে গেছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত ৫৭ রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, রোহিঙ্গাদের আসা অব্যাহত থাকায় সরকার ‘কিছুটা চিন্তিত ও ক্ষুব্ধ’। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করতে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ, মানবিক সহায়তার অবস্থা এবং মিয়ানমারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে দেশটির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া। মালদ্বীপ বলছে, তারা মিয়ানমারের সঙ্গে সব রকম অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে যাচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজ মঙ্গলবার মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশে আসছেন। আজ বিকেল চারটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী এবং সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর দেখা করার কথা রয়েছে। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে মারসুদি বাংলাদেশ সফর করেন।
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছে, রক্ত আর পোড়ানোর নেশায় মরিয়া মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একদল উন্মত্ত তরুণ। তারা সেনা-পুলিশের উপস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের খুন করছে।
মংগদুর তুলাতলি এলাকার ২৮ বছরের তরুণ ফরিদুল্লাহ ৩০ আগস্ট হারান মা, স্ত্রীসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যকে। মিয়ানমারের সেনারা ওই দিন তাঁর মা আছিয়া বেগম, স্ত্রী আরখাতু বেগম ও তিন মেয়ে কিসমত, আসমত ও শামীমাকে কুপিয়ে হত্যা করে। ফরিদুল্লাহ জানালেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের এলাকায় পুরুষদের গুলি করে আর নারী ও শিশুদের কুপিয়ে খুন করছে।
পুটিবুনিয়ায় দেখা হওয়া হুমায়রা আর আরিফুল্লাহরা স্বজন হারালেও অস্থায়ী বসতিতে আশ্রয় নেওয়া বেশির ভাগ রোহিঙ্গাই জানাল, তারা বাংলাদেশে এসেছে তিন দিন আগে। নিজেদের স্বজনদের হারানোর ভয়ে আগুনের লেলিহান শিখায় উন্মত্ত মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে তারা বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়েছে। এখন আপনজন নিয়ে যেখানেই পারছে, সেখানেই ঠাঁই খুঁজছে। যদিও পুটিবুনিয়ার টিলা আর আবাদি জমির মাঝখানে খাবার, পানীয়সহ মানবিক প্রয়োজনের অনেক কিছুই এখন নেই।





