কিশোরগঞ্জের ভৈরবে কোরবানির পশুর চাহিদা মেটাতে ১০ হাজারেরও বেশি খামারের খামারিরা প্রস্তুতি নিয়েছেন এবার। তাঁদের ওই সব খামারে দেশীয় খাবার খাইয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে তাঁরা মোটা-তাজা করেছেন গরু-ছাগল ও মহিষগুলোকে।

গড়ে ওঠা এসব খামারে ক্ষতিকারক স্টেরয়েড জাতীয় মেডিসিন ব্যবহার হচ্ছে না বলে দাবি খামারিসহ স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের।

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চোরাই পথে অবাধে ভারত ও মিয়ানমারের পশু দেশে প্রবেশ করছে-এমন গুজবে শঙ্কিত এখানকার খামারিরা। তাঁদের অভিযোগ, বিদেশি পশু প্রবেশ করলে লোকসান গুনতে হবে তাঁদের। তাই সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দাবি করেছেন খামারিরা। একই অভিমত স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরেরও।

ভৈরবে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এবারও গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার মৌসুমি পশুর খামার। স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, এই খামারের সংখ্যা ১০ হাজারের কিছু বেশি হলেও, খামারিদের হিসাবে ১৫ হাজারের কম নয়। ওই সব খামারে দেশি, নেপালি, সিন্ধি, সংকর জাতীয় গরু, মহিষ ও ছাগল পালন করা হচ্ছে। আর ওই সব খামারের পশুকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে দেশীয় খাবার খড়, খৈল, ভুষি, গুড়ের চিটা, লবণ, চাল-ডালের ছোলা-গুড়াসহ চাষ করা লিপিয়ার ঘাস খাওয়ানো হচ্ছে। ব্যবহার হচ্ছে না মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর স্টেরয়েড জাতীয় কোনো মেডিসিন। ফলে উৎপাদিত হচ্ছে সম্পূর্ণ নিরাপদ মাংস-দাবি খামারিদের।

তবে বিদেশি পশুর প্রবেশের সংবাদে লোকসানের শঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এখানকার খামারিরা। তাঁদের অভিযোগ, এই মুহূর্তে বিদেশি পশু দেশে ঢুকলে তারা লোকসানের মুখে পুঁজি হারিয়ে দেউলিয়া হয়ে পড়বেন। তাই তাঁরা এ বিষয়ে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করেছেন।

ভৈরব শহরের ভৈরবপুর গাছতলাঘাট এলাকার খামারি মো. আলকাছ মিয়া জানান, প্রায় ৫০ লাখ টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করে ২০টি গরুর খামার গড়েছেন। ছয় মাস ধরে খামারের পশুগুলোকে লালন করছেন। যদি এখন তিনি কাঙ্ক্ষিত মুনাফায় বিক্রি না করতে পারেন, তবে তাঁকে পথে বসতে হবে।

১৯টি গরু নিয়ে চণ্ডিবের এলাকার মাহবুবুর রহমানের খামার। ভোক্তাদের হালাল ও ভেজালমুক্ত মাংস দিতে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাই দেশীয় খাবার দিয়ে, সযতনে দেশীয় পদ্ধতিতে লালন পালন করেছেন পশুগুলো। খাদ্য খরচ ও কর্মীদের বেতন মিলিয়ে গরুপ্রতি দুই লাখ টাকার ওপরে তাঁর খরচ পড়েছে। তাই দুই লাখের নিচে বিক্রি করলে তাকে পুঁজি হারাতে হবে।

পশুখাদ্যের প্রতিটি উপকরণের মূল্য এবার বেড়েছে। বেড়েছে শ্রমিকের বেতন। তারপরও ২৫টি গরু নিয়ে ওমর আলী মোল্লা সাজিয়েছিলেন তাঁর খামার। ধারণা ছিল, সারা বছরের মতো ঈদেও পশু প্রবেশ বন্ধ থাকবে সীমান্ত দিয়ে। আর এমনটি হলে তিনিও হবেন লাভবান। কিন্তু ঈদকে সামনে রেখে প্রতিবেশী দুটি দেশ থেকে চোরাই পথে পশুর অবাধ প্রবেশের খবরে তিনি হতাশ। মুনাফার চেয়ে মোটা অঙ্কের লোকসানের আশঙ্কায় পাগলপ্রায়।

ভৈরবের গ্রামীণ অর্থনীতি প্রাণিসম্পদনির্ভর। প্রাণিসম্পদকে এই অঞ্চলের জন্য লিভিংব্যাংক উল্লেখ করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভৈরব উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ কামরুল ইসলাম জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও ভৈরবে প্রাকৃতিক উপায়ে কোরবানির পশু মোটা-তাজাকরণ খামার গড়ে উঠেছে। ১০ হাজারেরও বেশি ওই সব খামারে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে পশু মোটা-তাজাকরণ করা হয়েছে। নিরাপদ ও বিষমুক্ত মাংস নিশ্চিত করতে এখানকার প্রতিটি ওষুধের দোকানে চিঠি দেওয়া এবং খামারিদের সচেতন করাসহ একজন ভেটেরিনারি সার্জনের নেতৃত্বে মনিটরিং কমিটি গঠন করে তদারকি করা হয়েছে।

কামরুল ইসলাম খামারিদের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে জানান, ভারতীয় পশু প্রবেশ ঠেকাতে সরকার পদক্ষেপ না নিলে খামারিরা লোকসানের মুখে পড়বেন।