হজের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ভুক্তভোগী হজযাত্রীদের আহাজারি আর কান্না তত ভারি হচ্ছে। প্রতিদিনই অসংখ্য লিখিত অভিযোগ জমা হচ্ছে হজ অফিসে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অভিযোগের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। গত ৭ দিন আগে যারা আহাজারি করছিলেন আজও তারা একই ভাবে আহাজারি করছেন।

গত কয়েকদিনে ধরে রাজধানীর আশকোনার হজ ক্যাম্পে সরেজমিনে ঘুরে ভোগান্তির শিকার হজযাত্রীদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আল-সাফা এজেন্সির ৬০ জন, নিবিড় হজ এজেন্সির ৪২ জন, আল-বালাদ অভারসিজ হজ এজেন্সির ২৪ জন, মদিনা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল হজ এজেন্সির ৯৩ জন, সাইদ এয়ার ইন্টারন্যাশনাল হজ এজেন্সির ২৩ জন, গোল্ডেন এয়ার ইন্টারন্যাশনাল হজ এজেন্সির ২৫ জন, ইকো এভিয়েশন এন্ড টুরিজম হজ এজেন্সির প্রায় ১৯৩ জনসহ আরো কিছু এজেন্সি ক্যাম্পে হজযাত্রী রেখে অফিসে তালা দিয়ে পালিয়েছে। আবার এদের মধ্যে কেউ কেউ ভুক্তভোগীদের কাছে অতিরিক্ত টাকাও দাবি করেছে।

এদিকে, প্রতারণার অভিযোগে এদের মধ্যে মাত্র ৬ হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।
মুন্সিগঞ্জের লোহগঞ্জ থেকে হজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ৫ দিন আগে হজ ক্যাম্পে এসেছেন মো. মুনছুর আলী সোহেলসহ আরো ১৯ জন। সবাই টাকা জমা দিয়েছেন সাইদ এয়ার ইন্টারন্যাশনাল হজ এজেন্সিতে। তাদের ভিসাও হয়েছে। কিন্তু কারো বিমানের টিকেট হয়নি। ভিসা আর পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিয়ে পালিয়েছেন এজেন্সির মালিক আবু সাইদ। তারা গতকাল হজ অফিসে লিখিত অভিযোগও জমা দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি হজ কর্তৃপক্ষ।
মুনছুর আলী সোহেল পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, আমি সবার কাছে থেকে টাকা নিয়ে এই এজেন্সিতে টাকা জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ সময়ে এসে সবাই পালিয়েছে। এখন আমরা কি করবো। আমরা তো আর এলাকায় মুখ দেখাতে পারবো না। আমরা যদি হজে যেতে না পারি তাহলে মরা উপায় থাকবে না। আমাদের জন্যে কিছু একটা করেন।

রাজশাহী থেকে গত তিনদিন আগে ১৯৭ জন হজযাত্রী একসাথে হজ ক্যাম্পে এসেছেন। এদের সবারই ভিসা হয়েছে। কয়েকজন চলে গেছেন। এখনও ১৯৩ জনের টিকিট হয়নি। গত তিন চার দিন ধরে হজ ক্যাম্পের নিচ তলার মেঝেতে নিদারুণ কষ্টে দিন কাটছে তাদের।
এদের একজন নজরুল ইসলাম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, গত তিন দিন ধরে এখানে বসে আছি। খাওয়া ও ঘুমের কষ্ট। এখন এজেন্সির মালিক আমাদের সাথে যোগাযোগ করছে না। আমরা এখন আল্লাহর উপর ভরসা করে বসে আছি। তিনি হয়তো আমাদের একটা ব্যবস্থা করবেন।
এদিকে শনিবার দুপুরে রাজধানীর আশকোনার হজ ক্যাম্পে প্রতারক হজ এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে প্রতারণার শিকার হজযত্রীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। এ সময় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন প্রতারিত হজযাত্রীরা।

এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ধর্ম মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বজলুল হক হারুন। তিনি বলেন, অনেক এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আমরা ইতিমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিয়েছি। তারা যদি দুই দিনের মধ্যে হজযাত্রী পাঠানোর ব্যবস্থা না করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, আমরা আশা করছি যাদের ভিসা হয়েছে তারা সবাই হজে যেতে পারবেন। এজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নির্ধারিত হজ ফ্লাইট শেষ হচ্ছে আজ শনিবার। বিমান বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগামী দুই দিন ফ্লাইট পরিচালনা করতে আরো ৭ টি নতুন স্লটের আবেদন করা হয়েছে। আজ রাতে হয়তো সেই আবেদনের বিষয়ে জানা যাবে। যদি নতুন স্লটের আবেদন না পাওয়া যায় তাহলে প্রায় ১ হাজার যাত্রী পরিবহন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ পরিবর্তন ডটকমেকে বলেন, আজ রাত আটটা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তারপর আমরা জানতে পারবো আমরা স্লটের বরাদ্দ পাচ্ছি কি না। যদি না পাওয়া যায় তাহলে প্রায় ১ হাজার যাত্রী নিয়ে আমাদের সমস্যা দেখা দেবে।
তিনি আরো বলেন, আমরা এরই মধ্যে সৌদি এয়ারলাইন্সের সাথে কথা বলেছি। যদি আমরা স্লটের বরাদ্দ না পায় তাহলে অতিরিক্ত যাত্রী তাদেরকে দিয়ে দেব। সৌদি এয়ারলাইন্স ইতিমধ্যে ৭ টি নতুন স্লটের বরাদ্দ পেয়েছে। আমরাও যদি বরাদ্দ পায় তাহলে আমরাও তাদের যাত্রী বহন করতে পারবো।
প্রসঙ্গত, চলতি বছর পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ১৬ হাজার ৩৮৬ জন হজযাত্রী সৌদি আরবে পৌঁছেছেন। এখনও সৌদি যেতে বাকি রয়েছে ৯ হাজার ৮৬১ জন। হাতে সময় আছে মাত্র ২ দিন।

ভিসা জটিলতায় যাত্রী সংকটে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সৌদি এয়ারলাইন্স মোট ২৮ টি হজ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ টি বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আর বাকি ৪ টি সৌদি এয়ারলাইন্সের।
এ বছর সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় মোট হজযাত্রীর সংখ্যা ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন। হজযাত্রীদের সৌদি আরবে যাত্রার প্রথম ফ্লাইট পৌঁছে ২৪ জুলাই। শেষ ফ্লাইট ২৮ আগস্ট। ফিরতি ফ্লাইট শুরু হবে ৬ সেপ্টেম্বর ও শেষ ফিরতি ফ্লাইট ৫ অক্টোবর।