সাবেক বিডিআর প্রধান (বর্তমান বিজিবি) মেজর জেনারেল (অব:) আ ল ম ফজলুর রহমান। সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম ফেসবুকে খুবই সক্রিয় তিনি। সমসাময়িক সব বিষয় তিনি শেয়ার করেন জনপ্রিয় এই মাধ্যমটিতে। রোববার রাতে তিনি তার ফেসবুক আইডিতে ”ফিরে দেখা ৭৫ এর সেনা অভ্যুত্থান” শিরোনামে একটি লেখা শেয়ার করেছেন।

এখানে তিনি ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা, ১৩ জন খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে ফাঁসিতে ঝোলানো, ১০০ জনের মতো মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে চাকুরীচ্যুতসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছেন। নিচে তার লেখাটুকু হুবহু তুলে ধরা হলো-

ফিরে দেখা ৭৫ এর সেনা অভ্যুত্থান কেন দেখতে চাই তার কারণ আছে। বলবো আমার মতো করে। যে ভাবে আমি একজন ক্যাপ্টেন হিসাবে দেখেছি সেই সময়ের সেনা অভ্যুত্থানকে। চাকরিতে জুনিয়র অফিসার ছিলাম ঠিকই তবে আমরাই যেমন স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে যুদ্ধ দেখেছি, যুদ্ধ করেছি। তেমনি জুনিয়র হয়েও সব কাজ আনজাম দিয়েছি সদ্য স্বাধীন দেশের দেশ ও সেনাবাহিনী পুনর্গঠনে । তাই বর্তমানের একজন ক্যাপ্টেন এবং আমাদের মাঝে তফাৎ ছিল এবং আছে। কারণ আমরা প্রথমে যুদ্ধ করেছি তার পরে সেনাবাহিনীর অফিসার হয়েছি যা সামরিক ইতিহাসের বিরল ঘটনার মধ্যে একটি।

প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কারণ আলোচনায় অনেক স্পর্শকাতর বিষয় আসবে যা নিয়ে আলোচনা করতেই হবে। আলোচনার সময় আমি বস্তুনিষ্ঠ থেকে নির্মোহ দৃষ্টাকোনে সব বিষয় তুলে আনার চেষ্টা করবো। এতে যার যে স্হান আমি তাঁকে তাই দেবো। অতিরঞ্জনে যাবোনা বা পক্ষপাতিত্ব করে নিজের বা সতীর্থের ঢোল বাজাবোনা । যা আমি নিজে দেখেছি বুঝেছি সত্য বলে জেনেছি তাই বলবো। অতএব আমার আলোচনা কারো মনোক্ষুন্যের কারণ হলে নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন। এই ভেবে ভূল ভ্রান্তি লোভ লালসায় পড়ে যে যা করেছে তার জন্য আমরা কেউ দায়ী নই । যে আদা খেয়েছে সে ঝাল বুঝবে। আমারা ক্ষমা করলে বা না করলে ইতিহাস বসে থাকবেনা। যার যা পাওনা জীবিত কিংবা মৃত ইতিহাস তাঁকে তাই দেবে আমি চাই বা না চাই পছন্দ করি না করি।

একটা কথা আমি অকপটে স্বীকার করি আমার দেখা অন্যের দেখার মতো নাও হতে পারে। আমি এও মনেকরি আমার ইউনিটে যা যা ঘটেছিল ৭৫ এ সেনা বিদ্রোহ ও জাসদ নিয়ন্ত্রিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার দ্বারা তা অন্য সব ইউনিটে একই ভাবে ঘটে থাকবে এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য। কারণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সবটাই তখন কম বেশি একই ফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। কাজেই কেউ যদি ৭৫ সালের অনেক পরে নিজে বই লিখে নিজের এবং সতীর্থের ঢোল বাজান বা একটি গোষ্ঠীর উপরে সব দোষ চাপিয়ে তাদের হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা করেন তাহলে সে বিষয়ের নিরসন কল্পে সত্য ইতিহাস তুলে ধরা সবার দায়িত্বের মতো আমারও দায়িত্ব বলে মনেকরি। এই তাড়না থেকেই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। যদিও আমার কাছে এবিষয়ে আমার সামরিক চাকরির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও ধারনা ছাড়া অন্য কোনও দালিলিক প্রমান নাই।

৭৫ এর সেনা বিদ্রোহ যখন সংঘটিত হয় তখন আমি পাবনার পাকশিস্হ রুপপুর ডাকবাংলোতে অবস্থান করে উওর বঙ্গের দুর্ভিক্ষাবস্তার অবসান কল্পে ফুড মুভমেন্টের কাজে নিয়োজিত ছিলাম। সকালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সিপাহী জহির তার রেডিও নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আমার কাছে এসে ঢাকায় সেনা বিদ্রোহে বংগবন্ধুর স্বপরিবারে নিহত হওয়ার খবর দেয়। রেডিওতে মেজর ডালিমের স্বকন্ঠে ঘোষনা শুনে নাশ্চিত হই। পরে যা ঘটেছিল তার উপরে আমার একটি লেখা ইতিমধ্যে ফেসবুকে লিখেছি আপনাদের অনেকে তা পড়ে থাকবেন । তার পরে আমি দীর্ঘ সময় সেনাবাহিনীতে চাকুরীর সুবাদে ৭৫ এর সেনা অভ্যুত্থানের বিষয়ে যা দেখেছি শুনেছি তার হিসাব মেলাবার চেষ্টা করেছি। কতক মিলেছে কতক মিলেনি। তারই মাঝে সেনাবাহিনীতে অবলোকন করেছি মৌলিক দুটি পরিবর্তনঃ

১। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের শাসন ভার ছিল বংগবন্ধুর উপরে এবং সেনাবাহিনীর কমান্ড ছিল মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হাতে।

২। প্রথমে বংগবন্ধু সেনা বিদ্রোহে নিহত হলেন। জেনারেল জিয়া উর রহমান সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব নিলেন । জেনারেল জিয়া সেনাবাহিনী প্রধান হলে রিপেটরিয়েট অফিসার কর্ণেল এরশাদ দিল্লিতে তার এনডিসি কোর্স অসমাপ্ত রেখে জেনারেল জিয়ার ডাকে দেশে ফিরে একই বছরে দুটি প্রোমোশন পেয়ে সেনাবাহিনী প্রধান হলেন। আমারা শুনে আসছি এবং এখনও শুনি জেনারেল শওকত ও জেনারেল মঞ্জুরের মধ্যে রেশারেশির কারণে জেনারেল জিয়া জেনারেল এরশাদের মতো একজন বশংবদকে বাধ্য হয়ে সেনাবাহিনী প্রধান করেন।

কিন্তু এটা ভুললেতো চলবেনা জেনারেল এরশাদের জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলায় যেখানে এখনো তাঁর জ্ঞ্যাতিগোষ্ঠি এবং আত্মীয় স্বজন আছেন। বংগবন্ধু সেনা বিদ্রোহে নিহত হবার পরে জেনারেল এরশাদ তড়িঘড়ি করে ভারতের দিল্লিতে তাঁর এনডিসি কোর্স অসমাপ্ত রেখে দেশে ফিরে ডাবল প্রোমোশন পেয়ে সেনাবাহিনী প্রধান হলেন এটা কি শুধু শওকত ও মঞ্জুরের রেশারেশির কারণে! এতো সরলিকরন বোধকরি ঠিক নয়।

এর পরে চট্টগ্রামে সেনা অফিসার বিদ্রোহে নিহত হলেন প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়া উর রহমান। নিহত হলেন জেনারেল মঞ্জুর। ১৩ জন খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে ফাঁসিতে ঝোলানো হলো। ১০০ জনের মতো মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে চাকুরীচ্যুত করা হলো। মজার বিষয় হলো জেনারেল মঞ্জুরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্টাফ অফিসার ছিলেন অনেক রিপেটরিয়েট অফিসার তাদের প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যার সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হবার পরেও এদের কাউকে কোনো প্রকার শাস্তি দেওয়া হয়নাই। এতে সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয় পাকিস্তান ফেরৎ কিছু সিনিয়র সামরিক অফিসার বংগবন্ধু এবং মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের উৎখাত ও নির্মল করে দেশের শাসন ভার এবং সামরিক বাহিনীর কমান্ড ছলে বলে কৌশলে করায়ত্ব করার মিশন নিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।

বংগবন্ধু এবং জেনারেল জিয়া হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শাসন ভার এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ড রিপেটরিয়েট অফিসারদের হাতে চলে যায়। যার মাধ্যমে এই অসম্ভব সম্ভব হলো তিনি হলেন ভারতে জন্ম গ্রহনকারী এবং দিল্লিতে এনডিসি কোর্স অসমাপ্ত রেখে দেশে ফেরা ১ বছরে জেনারেল জিয়া কতৃক ডাবল পদোন্নতি পাওয়া রিপেটরিয়েট অফিসার সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ।

দেশ স্বাধীনের ৫ বছরের মধ্যে ভোজবাজির মতো সব উলটপালট হয়ে গেলো। এখন কেউ যদি বলেন ঘটনা পরম্পরায় এসব সংঘটিত হয়েছিলো । এখানে কোনো ষঢ়যন্ত্র ছিলো না। তাহলে ঘটনার পৃষ্ঠে যে কথাগুলো ভেষে ওঠে তাহলোঃ

১। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির চার পাশে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের সমাবেশ ঘটার কথা ছিলো। কিন্তু আমরা দেখলাম বংগবন্ধুর সামরিক সচিব এবং এডিসি সবাই রিপেটরিয়েট অফিসার। কেন? কার পরামর্শে এই সব রিপেটরিয়েট পাকিস্তান ফেরৎ অফিসারদের বংগবন্ধুর চারপাশে নিয়োজিত করা হয়েছিল?

এটা কি বংগবন্ধুকে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে তাঁর কান ভারি করে ক্ষেপিয়ে তোলার ষঢ়যন্ত্রের অংশ হিসেবে পরিকল্পিত ভাবে করা হয়েছিল? এর প্রমাণ আমরা পাই যখন মেজর শরিফুল হক ডালিম এবং তাঁর স্ত্রী নিম্মি গাজি গোলাম মোস্তফার দ্বারা অপহৃত হয়ে ৩২ নম্বরে বংগবন্ধুর সামনে নীত হলে মেজর ডালিম নিজে এবং তাঁর স্ত্রীর নিগৃহিত হবার ঘটনা বংগবন্ধুর সকাশে ব্যাক্ত করেন। বংগবন্ধু যথাবিহিত বিচারের আশ্বাস দেন। কিন্তু ফলাফল দাঁড়ালো বংগবন্ধু বিচারের পরিবর্তে মেজর ডালিমকে চাকরিচ্যুত করলেন। এতে কি প্রমাণিত হয়না কে বা কারা আড়ালে থেকে দেশী বিদেশী একটি সুগভীর ষঢ়যন্ত্রের অংশ হিসেবে একদিকে বংগবন্ধুকে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের রিরুদ্ধে যেমন ক্ষেপিয়ে তোলা হচ্ছিল অন্যদিকে তেমনি মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদেরকেও বংগবন্ধুর বিরুদ্ধে বিতশ্রদ্ধ করে তোলার কাজ খুব সন্তপর্ণে এগিয়ে চলছিল।

২। কেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স ডিজিএফআই প্রধান ছিলেন ব্রিগেডিয়ার রউফ একজন রিপেটরিয়েট অফিসার ? দেশের গোয়েন্দা তথ্য ভান্ডার কেন রিপেটরিয়েট অফিসারদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল? কার পরামর্শে এটা সম্ভব হয়েছিল? সম্ভবতঃ ডিজিএফআই প্রধান ব্রিগেডিয়ার রউফ ৩২ নম্বরে বংগবন্ধুর বাড়িতে সেনা হামলার খবর ১৫ আগষ্ট তারিখে রাত ২টা হতে ২.৩০ মিনিটের দিকে জানতে পারেন। যতদুর জানা যায় ব্রিগেডিয়ার রউফ এই মহা রাষ্ট্রীয় দুর্যোগের খবর কাউকে না জানিয়ে চেপে যান। যদি তিনি এই সংবাদ সেনাবাহিনী প্রধানকে তৎখনাত অবহিত করতেন তাহলে বংগবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের জীবন রক্ষা করা যেতো। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল শফিউল্যাহ বংগবন্ধু আক্রান্ত হয়েছেন এই সংবাদ পেলেন ভার ৪.৩০ মিনিট হতে ৫.৩০ মিনিটের দিকে যখন তার করার তেমন কিছুই ছিলনা। অর্থাৎ সেনাবাহিনী প্রধানকে বিতর্কিত করা হলো একটা সুন্দর পুর্ব পরিকল্পিত ষঢ়যন্ত্রের মাধ্যমে। ব্যর্থতার সব দোষ মাথায় নিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান বিতর্কিত হলেন আর পিছনের ষঢ়যন্ত্রের মুল কুশীলবরা আড়ালেই থেকে গেলেন।

২। সামরিক গোয়েন্দা প্রধানের ভারও ছিল সম্ভবতঃ একজন রিপেটরিয়েট অফিসার কর্ণেল সালাহ উদ্দীনের হাতে। সেনানিবাস থেকে ট্যাংক বহর গভীর রাতে শহরের দিকে যাচ্ছে এই সংবাদ ডিরেক্টর মিলিটারী ইন্টেলিজেন্স ( ডিএমআই ), ডিজিএফআই, ডাইরেক্টর মিলিটারী অপারেশন্স ( ডিএমও ), ডাইরেক্টর মিলিটারী ট্রেইনিং ( ডিএমটি ) জানবেননা এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? ঐসময় ট্যাংক মুভমেন্টের বিষয়টি অতীব স্পর্শকাতর হিসাবে বিবেচিত হতো। কোথাও ট্যাংক মুভ করাতে হলে উপরে বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ সব অফিসারদের তা অবহিত করার এবং সম্ভবতঃ ক্ষেত্র বিশেষে লিখিত আদেশ নেওয়ার নিয়ম ছিল এমন ধারনা আমি পোষন করি। কিন্তু কেউ কিছু জানলেননা ঢাকা সেনানিবাস থেকে ট্যাংক বহর কিভাবে ঢাকা শহরে গেলো? এটা বিশ্বাস করা যায়না। বিশ্বাস যোগ্য নয়।

৭৫ সালে সম্ভবতঃ বংগবন্ধুর নির্দেশ ছিল ঢাকা থেকে ট্যাংক গুলোকে ইউনিটসহ বগুড়া সেনানিবাসে স্হানান্তরিত করার। কিন্তু তা করা হয় নাই। কেন ট্যাংকগুলোকে বগুড়ায় স্হানান্তরিত করা হয়নাই এই প্রশ্ন আমরা ৭৫ সালে লেঃ কর্ণেল মোমেন কে করেছিলাম যশোর সেনানীবাসে অবস্থিত কম্বাইন্ড আর্মি স্কুলে ( COMBAS ) যখন তিনি সেখানে আসেন অতিথি বক্তা হিসাবে আমাদের অফিসার্স ওয়েপন কোর্সকে ( OW ) এ্যাডরেস করার জন্য।

কর্ণেল মোমেন বংগবন্ধু যখন নিহত হন তখন ঢাকা সেনানিবাসস্হ ফার্স্ট ল্যান্সার ব্যটালিয়নের ( ট্যাংক রেজিমেন্টের ) কমান্ডিং অফিসার ছিলেন। এই ফার্স্ট ল্যান্সার ব্যটালিয়নের সবাই ট্যাংকসহ ৩২ নম্বরে আক্রমন চালায় মেজর ফারুকের নেতৃত্বে। ঐসময় কর্ণেল মোমেন ছুটিতে ছিলেন। প্রশ্ন নিশ্চয়ই হয় যখন বংগবন্ধু নিহত হলেন তখন কর্ণেল মোমেন ছুটিতে কেন ? যেমন জেনারেল জিয়ার সাথে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এরশাদের চট্টগ্রামে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু কোনো এক অব্যক্ত কারণে জেনারেল এরশাদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে চট্টগ্রামে গেলেননা। ঠিক ঐসময়ে চট্টগ্রামে জেনারেল জিয়া নিহত হলেন। এটা কি কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে? তার পরের ঘটনাতো তা বলেনা । যাইহোক কম্বাসে আমাদের প্রশ্নের উওর দিতে ব্যার্থ হয়ে কর্ণেল মোমেন তিক্তবিরক্ত হয়ে কেন ট্যাংকগুলোকে বগুড়াতে নেওয়া হয়নাই এর উওরে ইংরেজিতে যা বলেছিলেন ” If aunte had balls” । তাঁর এই উওর আমার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মনে থাকবে।

 

৩। ১৫ আগষ্টে বিডিআর প্রধান ছিলেন জেনারেল খলিল যিনি নিজে একজন রিপেটরিয়েট অফিসার ছিলেন। তিনি পিলখানার সব দরজা বন্ধ করে বসেছিলেন। বংগবন্ধুকে রক্ষা করতে স্বসৈন্যে এগিয়ে আসেননি। এদিকে রক্ষীবাহিনীর প্রধান এ এন এম নূরুজ্জামানকেও আমরা দেখি বংগবন্ধুর নিহত হবার সময় তিনি বিদেশে সরকারী কাজে অবস্হান করছেন। জেনারেল মঈনুল হোসেন চৌধুরী তাঁর লেখা এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য বইএ উদ্ধৃত করেছেন তিনি যখন থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূতের দিয়ীত্ব পালন করছিলেন তখন একটি প্রতিবেশী দেশের কুটনীতিকরা এ এন এম নূরুজ্জামানের খোঁজখবর জানতে চেয়ে তাঁকে প্রায়শ বিব্রত করতেন। এইসব কেন’র উওর খুঁজলে যা প্রতিভাত হয় তাহলো একটা দেশী বিদেশী ষঢ়যন্ত্র সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে রিপেটরিয়েশনের শুরু থেকে জট পাকাতে থাকে যার শেষ, পরিনতির বলি হন বংগবন্ধু নিজে, জেনারেল জিয়া, জেনারেল মঞ্জুর, ১৩ জন খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অফিসার। চাকুরীচ্যুত করা হয় শত শত মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে । অবশেষে দেশের শাসন ভার ও সেনাবাহিনীর কমান্ড করায়ত্ব করেন অমুক্তিযোদ্ধা ভারতে জন্ম গ্রহনকারী পাকিস্তান ফেরৎ জেনারেল এরশাদ।

জেনারেল শওকত ও জেনারেল মঞ্জুরের মধ্যেকার রেশারেশী সৃষ্টির পিছনেও সম্ভবতঃ ষঢ়যন্ত্র ছিলো । উদ্দেশ্য জেনারেল জিয়াকে দুর্বল করে তাঁর হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। যেমন বংগবন্ধুর ক্ষেত্রেও হয়েছিল। প্রথমে তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। একই সঙ্গে বংগবন্ধুর বিরুদ্ধে অতিব নিষ্ঠুর ভাবে চালানো হয় অপপ্রচার। ধীরে ধীরে বংগবন্ধুকে হত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

এই অতীব চাতুর্যপূর্ণ ষঢ়যন্ত্রের শিকারের পরিনত হয়ে একদল মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের আমরা বংগবন্ধু এবং জেনারেল জিয়াকে হত্যা করতে দেখি। এর মানে এই নয় যে আমি খুনি মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের পক্ষে সহানুভূতি প্রকাশ করছি। তারা দেশ ও জাতির কলঙ্ক। চরম শাস্তিই তাদের প্রাপ্য।

এটা ঠিক হাতির দাঁতের মতো। হাতির মুখের সামনে বেরিয়ে থাকা যে দাঁত দুটা কে আমরা দেখি তাদিয়ে হাতি ভারি বস্তু উৎখাত ও অপসারণের জন্য ব্যাবহার করে। ষঢ়যন্ত্রকারীরা মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হাতির বেরিয়ে থাকা দাঁতের মতো বংগবন্ধু ও জেনারেল জিয়াকে উৎখাতের কাজে ব্যবহার করে নিজেরা হাতির চোয়ালের দাঁতের মতো আড়ালে থেকে গেছে।

এবারে দেখতে চেষ্টা করবো বংগবন্ধু এবং জেনারেল জিয়াকে কি ষঢ়যন্ত্রের দ্বারা প্রভাবিত করা সম্ভব ছিল?

১। বংগবন্ধু বাংলাদেশের স্হাপিত অবিসংবাদিত নেতা। হিমালয় সামান তাঁর ব্যক্তিত্ব। একই সাথে তিনি ছিলেন জনদরদী এবং কোমল হৃদয়ের মানুষ। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন বিশ্বাস করতেন মনের কথা খুলে বলতেন আপন মনে করে । শত্রু মিত্র নির্বিশেষে তিনি সবাইকে আপন করে বুকে জড়িয়ে ধরতেন । তাঁর এই সরলতার পুর্ণ সুযোগ দেশী বিদেশী স্বার্থান্বেষী মহল অশুভ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে কার্পণ্য করেনাই। আমি বলবো তিনি সরল বিশ্বাস আর মানুষকে ভালোবাসার বলি হয়েছেন। আমি এখনও মনেকরি তিনি যদি বংগভবনে থাকতেন তাহলে হয়তো এতো সহজে তাঁকে পরিবারসহ নিহত করা সম্ভব ছিল না।

২। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের একজন চৌকষ অফিসার ছিলেন জেনারেল জিয়া। চলনে বলনে বংগবন্ধুর সম্পুর্ণ উল্টা। তাঁকে কেন ষঢ়যন্ত্রের কাছে বলি হতে হলো? তিনিতো ষঢ়যন্ত্র উৎখাতের কাজই করতেন সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার হিসেবে।

আমার মনে হয় তিনি সেনা বিদ্রোহ দমনে এবং কর্ণেল তাহের গংদের ষঢ়যন্ত্রের চাপে তদুপরি জেনারেল শওকত এবং জেনারেল মঞ্জুর তাঁর প্রতি বৈরী থাকার ফলে ক্ষমতা সংহত করতে তিনি জেনারেল এরশাদের উপরে নির্ভরশীল হয়ে তাঁকে সেনাবাহিনী প্রধান করে দেশের মধ্যে পাকিস্তান প্রত্যাগত সামরিক অফিসার ও সৈনিকদের আস্থা আর্জনের চেষ্টা করেন।

এই জন্যই ব্রিগেডিয়ার ফিরোজ সালাহ উদ্দীন এর মতো মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশে অবস্হান করে পাকিস্তান আর্মির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিবহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়া ও পাকিস্তান বাহিনীর সাথে আত্মসমর্পণকারীকে জেনারেল জিয়া সামরিক সচিব করেন। পরে রিপেটরিয়েট অফিসার জেনারেল সাদেকুর রহমান চৌধুরী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সামরিক সচিব হন।

প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়া অনেক অমুক্তিযোদ্ধা সামরিক বাহিনীর অফিসার যাদের অনেকে পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধকরে পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে ঢাকাতে আত্মসমর্পণ করেন তাদের প্রায় সবাইকে পুলিশে চাকরি দেন। তিনি তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য এটা করেছিলেন আমার ধারনা। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। অবশেষে চট্টগ্রামে প্রেসিডেন্ট জিয়ার উর রহমান সেনা অফিসার বিদ্রোহে নিহত হন।

একটি মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন বংগবন্ধু এবং প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়া উর রহমানের ষঢ়যন্ত্রের শিকারে পরিনত হয়ে এমন করুণ মৃত্যু কি অবধারিত ছিল? হয়তো ছিল হয়তো ছিল না। আমর পক্ষে এটা বলা সম্ভব নয়। তবে ষঢ়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্যই যখন হয় ছলে বলে কৌশলে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা, সেনাবাহিনীর কমান্ড করায়ত্ব করা এবং তাতে যখন দেশী বিদেশী স্বার্থান্বেষী মহল যোগ দেয় তখন কে কত উদার মানবিক এবং অবিসংবাদিত নেতা সেটা মুখ্য বিষয় আর থাকেনা। আমরা বংগবন্ধুকে ভালোবাসি শ্রদ্ধা করি আমরা জেনারেল জিয়াকে পছন্দ করি কিন্তু শেষ রক্ষাতো করতে পারিনি। এই দায় আমাদের সবাইকে সমভাবে বহন করতে হবে।

পরিশেষে আমার অনুরোধ সবার প্রতি আমার এই লেখাকে স্হূল গোষ্ঠী স্বার্থের উপরে উঠে মূল্যায়ন করার জন্য। সবার নিজস্ব মতামত আছে থাকবে। এই লেখাতে আমার দেয় মতামত সবার পছন্দ হবে তাও না। আমি আমার মতো করে ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছি ভুল হলে খামতি আমার। তবে এই বর্ণনায় আমার বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা এবং আন্তরিকতার যে কোনও অভাব নাই তা নিশ্চিত করে বলতে পারি।