মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আপনি সেদিন ব্রাসেলসে। ৩২ নম্বরের বাড়িতে সে রাতে ঘটে গেলো এক মহাপ্রলয়। গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে বেডরুম, ভাসলো রক্তস্রোতে!
সিঁড়িতে পড়ে রইলো পিতার রক্তাক্ত নিথর দেহখানি। সাদা পাঞ্জাবী, লুঙ্গি, কালো ফ্রেমের সেই চশমা, তামাকের পাইপ আর বঙ্গবন্ধু! প্রাণহীন পড়ে রইলো ৩২ নম্বর বাড়ীর সিঁড়িতে। শিশু রাসেল?
তার জন্যেও কি নরঘাতকদের হৃদয়ে এতটুকু সহানুভূতি জন্মেছিলো?। পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞে ৩২ নম্বর বাড়িটি হয়ে উঠেছিল যেন এক মৃত্যুপুরী! খুনিদের কথা নাহয় বাদ দিলাম। ওরা পিশাচ। ওরা বর্বর। ওরা ঘৃণ্য নপুংসক।
কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আশির্বাদপুষ্ট বাঘা বাঘা আওয়ামীলীগ নেতাদের হৃদয়েও তো সেদিন কোন সহানুভূতি দেখিনি! বঙ্গবন্ধু যাদেরকে মন্ত্রী করেছিলেন, রাষ্ট্রদূত বানিয়েছিলেন, যাদেরকে ভালোবেসে ছিলেন সেইসব বাঘা আওয়ামীলীগ নেতারা তো সেদিন টুঁশব্দটিও করেননি! বরং তাদের কেউ কেউ খুনীদের সাথে আপোষ করে ক্ষমতার ভাগ নিয়েছিলেন। বাকীরা খুঁজে নিয়েছিলেন ইঁদুরের গর্ত।
বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে সেদিন দেশের রাজপথে একটা ট্যাংকও নামেনি। একটা গুলিও ফোটেনি কোথাও। একটাও মিছিল নামেনি রাজপথে, স্লোগান ওঠেনি। স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি নৃশংসভাবে নিহত হওয়ার প্রতিবাদে সেদিন একজন মানুষও বুক চিতিয়ে খুনিদের বুলেটের মুখোমুখি হয়নি।
একজন নেতাও সেদিন মুজিবের মত গলা উঁচিয়ে বলেনি, চলো প্রতিবাদ করি। এতটাই মৃত্যুভয় তাদের। শেখ মুজিবুর রহমান যাদেরকে শত্রুর মোকাবেলা করতে শিখিয়েছিলেন তাদের একজনকেও কি সেই দুঃসময়ে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো? এসব কথা আপনার থেকে আর কেইবা ভালো জানে!
যখন আওয়ামী লীগের সকল সুবিধাভোগীরা ইঁদুরের গর্তে লুকিয়ে ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ যপতে মশগুল ছিলেন, ঠিক সেই দুঃসময়ে টাঙ্গাইলের এক তরুণ ‘পাগল’ প্রতিরোধের ডাক দিলেন । হ্যাঁ পাগলই তো! মুজিবের প্রেমে পাগল। নেতার প্রেমে পাগলই যদি না হতেন, তবে কি নেতার এক কথায় একলক্ষ চার হাজার অস্ত্র তাঁর পায়ের কাছে বিছিয়ে দিতেন!
১৬ বছর নির্বাসনের দুঃসহ জীবনকে বরণ করে নিতেন! দিনের পর দিন, রাতের পর রাত নেতার কবরের পাশে শুয়ে থেকে অশ্রু ঝরাতেন! হ্যাঁ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি মুজিব পাগল সেই বজ্র’র কথাই বলছি।
যার নির্বাসিত জীবনে আপনি তাকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘কাদের সিদ্দিকী শুধু একটি নামই নয়, কাদের সিদ্দিকী একটি জ্বলন্ত প্রতিবাদ’। পঁচাত্তরের সেই ঘোর অমানিশায় জাঁদরেল নেতাদের মতো গর্তে না লুকিয়ে ত্রিশ বছরের তরুণ কাদের সিদ্দিকী বুক চিতিয়ে সেদিন প্রতিবাদ করেছিলেন। ডাক দিয়েছিলেন প্রতিরোধ যুদ্ধের। মৃত্যুর ভয়কে পাগল যুবকটি পরোয়া করেননি। বরং শেখ কামাল, শেখ জামালদের শূণ্যস্থানে বঙ্গবন্ধুর আরেকটি সন্তান হিসেবেই তিনি তার দায়িত্ব পালন করেছেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে একমাত্র বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমই সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। তার নেতৃত্বে সেই প্রতিরোধযুদ্ধে অস্ত্রহাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ১৭ হাজার মুজিবভক্ত।
মহাদেও থেকে রংপুরের চিলমারী পর্যন্ত সাতটি ফ্রন্টে বিভক্ত হয়ে চলে ভয়াবহ প্রতিরোধযুদ্ধ। এতে অংশ নেওয়া অন্তত ১০৪ জন মুজিবপ্রেমী নিজেদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে শহীদ হন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন পাঁচ শতাধিক প্রতিরোধযোদ্ধা। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর হাতে আটক অবস্থায় সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতন ও জেল-জুলুমের শিকার হন আরও তিন শতাধিক প্রতিবাদী।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত জুড়ে ২২ মাস ধরে চলে এ প্রতিরোধযুদ্ধ। সারা দেশে কারফিউ, সেনা তৎপরতার মুখে যখন টুঁ শব্দটি করার উপায় ছিল না, তখন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর আহ্বানে একদল দামাল যোদ্ধা অস্ত্রহাতে গর্জে ওঠেন। যোদ্ধারা অস্ত্রহাতে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে কাঁপিয়ে তোলেন সীমান্তবর্তী জনপদ। জাতির পিতাকে হারানোর শোকে মুহ্যমান একেকজন বীরযোদ্ধা জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন গেরিলাযুদ্ধে।
গারো পাহাড়ঘেঁষা ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা জেলা ও সুনামগঞ্জের হাওর-বেষ্টিত সীমান্তের বিরাট এলাকা জুড়ে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হন তারা। সশস্ত্র আক্রমণের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী পাঁচটি বিডিআর ক্যাম্প ও দুটি থানা দখল করে প্রায় ৩০০ বর্গমাইল এলাকা নিজেদের কবজায় নেন প্রতিরোধযোদ্ধারা। আজ অনেকেই অশ্রু, কান্না, শোকে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করলেও পঁচাত্তরে বাঘা সিদ্দিকীর মতো আর কেউ গর্জে ওঠেননি, অস্ত্রহাতে নেতৃত্ব দিয়ে কেউ নামেননি প্রতিরোধে। ওই সময় সেনা-বিডিআর-পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধের বিবরণ বেশ কয়েকবার আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ও গুরুত্ব পায়।
১৯৭৬ সালের ২০ জানুয়ারি কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার হেডিং ছিল— ‘কংশ নদের উত্তরাংশের ৩০০ বর্গমাইল এলাকা বাঘা বাহিনীর দখলে, শেখ মুজিব হত্যার প্রতিরোধ চলছে’।
সেই বাঘা বাহিনীর ‘বাঘা’ আজ কোথায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? আপনি কি আজকাল সময় পান সেই ‘বাঘা’ কেমন আছে খোঁজ নেবার? আপনার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্য যে মানুষগুলো সংগ্রাম করেছিলো, তাদের খোঁজও কি কেউ রাখে এখন?
আজো প্রতিটা ১৫ আগস্টে তিনি জায়নামাজে পড়ে থাকেন। আজকাল টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে গিয়ে অনেক মন্ত্রীগণও ফটোসেশন সর্বস্ব শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। কিন্তু এই বৃদ্ধ বয়সেও ‘বজ্র’ পিতার সমাধির পাশে বসে অঝোরে কাঁদেন। ঠিক যেন পিতা হারা শিশুর মতো! পিতার কবরে ‘বজ্র’র চোখের জলেই হয়তো সকলের অলক্ষ্যে ঝরে পড়ে চাপা অভিমান, বুক ভরা কষ্ট!
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ‘৭৫ এর ১৫ আগস্টে হাতে স্টেনগান নিয়ে ট্যাংকের উপর নেচে উল্লাস করা ইনু সাহেবরা আপনার সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী হন। শেখ কামালকে ‘ব্যাংক ডাকাত’ অপবাদ দেওয়া জাসদের নেতারা আজ আপনার সরকারের মন্ত্রী হন।
বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজাতে চাওয়া মতিয়া চৌধুরীরা আজ আওয়ামীলীগার হন। কিন্তু ইতিহাস জন্ম দেয়া ‘বজ্র’রা নিরবে নিভৃতে চাপা অভিমান বুকে নিয়ে ক্ষয়ে যেতে থাকেন ধীরে ধীরে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাঝে মাঝে এই অবচেতন মন বড্ড সন্দিহান হয়, জানতে ইচ্ছে করে ‘বজ্র’কে আদৌ মনে আছে তো আপনার?





