‘চোখের সামনোত সউগ ভাসি গেইল বা। কোনো রকমে জীবনটা নিয়া বাঁধত আসি। ছোট ছাওয়াটা কোটে গেইছে খুঁজি পাবার নাগছি না।’
এ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পরেন বৃদ্ধ কাচুয়া মামুদ (৬১)। তাঁর বাড়ি ছিল কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের জগমোহনের চরে। এখন ভোগডাঙ্গা পাটেশ্বরী বাজারের পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তীর রক্ষা বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন।
কাচুয়া মামুদ বলছিলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। হাত-পাও ছাড়া কিছু নাই। দুইটা ঘর আছিল। গত রোববার ধরলা নদীর পানি হু হু করি আসি চোখের নিমেষে সউগ ভাসে নিয়া যায়।’
আজ মঙ্গলবার সকালে ধরলা সেতুর পাশ থেকে নৌকায় উঠি। এটা নৌকাঘাট নয়। গত রোববার কুড়িগ্রাম ভূরুঙ্গামারী মহাসড়কের তিন জায়গা ভেঙে যায়। এতে উপজেলাগুলোর সঙ্গে জেলা শহরের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে উপজেলা থেকে নৌকা এখানে এসে লোকজনকে ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে যাচ্ছে।
নৌকায় এলাকায় যেতে যেতে চোখে পরে সব বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে আছে। শুধু চালের মাথা টুকু ভেসে আছে। অনেক ঘরবাড়ি গাছপালা হেলে পড়েছে। চারদিকে পানি আর পানি। শোঁ শোঁ শব্দে ঘোলা পানির প্রবল স্রোতে উত্তর থেকে দক্ষিণে নেমে আসছে। বাড়িগুলোতে একটা লোক নেই। হাঁস-মুরগি পোকামাকড় ঘরের চাল ও পোয়ালের গাদায় আশ্রয় নিয়েছে। কলা ও সবজিগুলো পানিতে থেকে হলুদ রং ধারণ করেছে। কিছু দূর এগিয়ে চোখে পড়ে ইউক্যালিপটাস গাছের সারি। ২০ ফিট পানিতে ডোবা। সেখানে অসংখ্য ঘরের চাল আটকে আছে। চারজন লোক চালের ওপর ও ভেতর থেকে হাঁস-মুরগি ধরছে। কুমড়া-চাউল বের করছে। পানি তীব্র বেগে এদিক দিয়ে পাক খেয়ে যাচ্ছে। অনেক কষ্টে মাঝি লোকগুলোর কাছে গিয়ে গাছের সঙ্গে নৌকা বাঁধে। তাঁদের কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে জানাতে চাই কী করছেন। এ সময় আক্কাস আলী (৩৪) কান্নায় ভেঙে পড়েন। কিছুক্ষণ পর চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘কিছু নাই ভাই, সব শ্যাষ। এই দেখেন ঘর ভাসি আসি গাছের সঙ্গে আটকি আছে। টিন গুইলা কেমন করি খুলমো চিন্তা করবার নাগছি।’
পাশেই চালের নিচ থেকে কুমড়া, মুরগি, চাল ও বাস বের করছিলেন গাজী আবদুস ছামাদ। তিনি বললেন, ‘স্রোতে পাক খায়া ঘর গুইলা টোপলা হয়া গাছের সঙ্গে আটকি আছে। ভেতরে এগলা আছিল। তাকে বাহির করবার নাগছি। ট্যাকাপয়সা, বিছনাপাতি কিছুই বের করবার পারি নাই। পরিবার নিয়ে সড়কোত পরি আছি।’
এখান থেকে পশ্চিম পাশে ধরলা নদীর পাশে জগমোহনের চর। এই চরে প্রায় ৫০টি পরিবারের ঘর ভেসে গেছে। এখন যে বাড়িঘর পানিতে আছে স্রোতের মধ্যে পরে বিধ্বস্ত অবস্থা। অনেকগুলো হেলে পড়েছে। কোনো ঘরে মানুষ নেই। মনে হয় মৃত্যুপুরী।





