রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী ও উত্তরা এলাকার বিভিন্ন ক্লাব ও গেস্ট হাউজগুলোর আড়ালে অবাধে চলছে যৌন ব্যবসা। এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে জানা গেছে, এসব গেস্ট হাউজে অন্তত পাঁচশ সুন্দরী নারীর অবাধ যাতায়াত রয়েছে। গেস্ট হাউজগুলো নিরাপদ ভেবে এখানে যাতায়াত করছেন কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ। ভিডিওটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন

প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব অপকর্ম চললেও তারা যেন একপ্রকার নির্বিকার। লোক দেখানো দুই-একটি অভিযান চললেও পরে আবারও একই অবস্থা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দিনের বেলায় যেমন তেমন, রাত নামলেই অভিজাত এলাকার পরিবেশ হয়ে যায় অন্যরকম। এসব এলাকার সড়কগুলোতে দ্রুত বেগের গাড়ির ছুটে চলা দেখে যে কারোই মনে হতে পারে কোনো জরুরি কাজের জন্য ছুটে চলছেন তারা। কিন্তু আদৌ তাই?

সব গাড়ি গিয়ে থামছে কোনো না কোনো ক্লাব বা গেস্ট হাউজে। আর সেখানেই চলছে যত অপকর্ম। ভদ্রতার মুখোশের আড়ালটা কুরুচির বহিঃপ্রকাশ। মদ, জুয়া সেই সঙ্গে উর্বশী নারীদের সঙ্গে বেহায়পনাসহ সবই চলছে এখানে। দেখে মনে হবে প্রশাসনের যেন কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই এখানে। অথচ সম্পূর্ণ অনুমোদনহীনভাবেই এসব এলাকার ক্লাব, রেস্টুরেন্ট এবং গেস্ট হাউজের প্রকাশ্যই সব ধরনের মাদকসেবন প্রকাশ্যই চলছে। এমনকি গত বছরের ১ ডিসেম্বর উচ্চ আদালত এ বিষয়ে নিষোধাজ্ঞা জারি করলেও কে শোনে কার কথা। প্রশাসেনর এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সব হয় এখানে।

গেস্ট হাউজ নয় যেন মিনি পতিতালয়

গুলশানে অন্তত অর্ধশতাধিক গেস্ট হাউজ রয়েছে। এসব গেস্ট হাউজের আড়ালে চলছে নানা ধরনের অপকর্ম। হলিডে ইন, লিভার ডোর, কোয়ালিটি ইন, গার্ডেন ইন, বোনভিটা ইন, ইস্টার্ন রেসিডেন্স, ডি ক্যাসল, স্কাই পার্ক, ম্যারিনো, লোরেল, ফুজি ইন, পিনাকল। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী হচ্ছে। গেস্ট হাউজ ভেবে কেউ যদি সেখানে যান তবে তাকে পড়তে হয় চরম বিড়ম্বনায়। টিএনএজ তরুণী দিয়ে গেস্ট নামের খদ্দেরদের মনোরঞ্জণের জন্য ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। আসলে এখানে গেস্ট হাউজের কোনো বিষয় নয়। এটা যেন মিনি পতিতালয়।

এক একটি গেস্ট হাউজে ৪০/৫০জন তরুণী রয়েছে। স্বল্প সময়ের জন্য আসছেন খদ্দেরও। তাদের মনোরঞ্জন শেষে তারা চলেও যাচ্ছেন। গেস্ট হাউজগুলো যে এই কাজই হয় তা নয়, এখানে মদ বিয়ারসহ রাতের বেলায় আরো জমজমাট আসর জমে। বিশেষ করে পিনাকল রেস্টুরেন্টে প্রকাশ্যই সবকিছু হচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। বেশ কয়েকবার থানায় তারা এ বিষয়ে অভিযোগও দিয়েছেন।

এসব গেস্ট হাউজগুলোতে অন্তত পাঁচ শতাধিক তরুণীর রয়েছে যোগাযোগ। তরুণীরা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে চলে আসেন গেস্ট হাউজে। আর এর কর্তৃপক্ষ তাদের খদ্দেরদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে অসামাজিক কার্যকালাপে লিপ্ত হয়। এই তরুণীদের মধ্যে বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।

এদিকে শুধু গেস্ট হাউজই নয় অনুমোদনহীন বিভিন্ন ক্লাবের আড়ালে চলছে বিদেশি মদ বিক্রি। এক প্রকার মদের বিশাল মজুদ করে তারা বিক্রি করে চলেছেন।

অনুমোদন ছাড়াই প্রকাশ্যেই বারগুলোতে মদ বিক্রি

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকায় আরও যেসব হোটেল-রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ বিদেশি মদ-বিয়ার বিক্রির অভিযোগ করা হয়েছে সেগুলো হলো- গুলশান ২ নম্বর সার্কেলের তিন নম্বর প্লটের স্প্যাঘেটি জাজ, ৫৩ নম্বর রোডের ৮ নম্বর বাড়ির স্টিক হাউজ, ৫৫ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাড়ির খাজানা, ৩৭ নম্বর রোডের অলিভ গার্ডেন, ১০৯ নম্বর রোডের ১০ নম্বর বাড়ির হেরিটেজ রেস্টুরেন্ট, ১১৮ নম্বর রোডের ১৫/বি নম্বর বাড়ির সাকুরা গোল্ডেন রাইস রেস্টুরেন্ট, ৭১ নম্বর রোডের কফি ম্যাঙ্গো, এক্সিট লাউঞ্জ, ৩৫ নম্বর রোডের ২৭ নম্বর বাড়ির সামদাদ লিমিটেড, ৭১ নম্বর রোডের ক্যাফে অ্যারাবিয়ান, ৫০ নম্বর রোডের ৬ নম্বর বাড়ির ফ্লেমবি, ৫০ নম্বর রোডের ডি জ্যাং জিম রেস্টুরেন্ট, দি ক্যাসেল রেস্টুরেন্ট, অফ ট্র্যাক, গুলশান নর্থ এভিনিউর ৮ নম্বর বাড়ির স্প্রিট ফায়ার, ৭১ নম্বর রোডের থাই রেস্তোরাঁ সই-৭১, ৬৮ নম্বর রোডের কফি ওয়েগা, ৭১ নম্বর রোডের ১২ নম্বর বাড়ির ক্যাপিটাল ক্লাব, ৮৩ নম্বর রোডের ইন্টারন্যাশনাল ক্লাব, গুলশানের হোটেল ওয়াশিংটন, হোটেল রোজহুড, জায়িকা রেস্টুরেন্ট, ১৩ গুলশান এভিনিউর ইফিজ, ৩৩ গুলশান এভিনিউর ফুড ভিলেজ, গুলশান ১৩৪-এর তোপ কাফি, গুলশান-১ এর ৬০/বি নম্বরের খুশবু রেস্টুরেন্ট, গুলশান-১ এর ৪৩ নম্বর বাড়ির এক্স লাউঞ্জ, বনানী ২৩ নম্বর রোডের মি লাউঞ্জ, বনানীর ফ্লোর সিক্স, সাংহাই, আলগিরা, হুক্কা লাউঞ্জ, বনানী ১১ নম্বর রোডের মিন্ট রেস্টুরেন্ট, রক রেস্টুরেন্ট, ডু মি ওকে রেস্টুরেন্ট, পেং ইয়াং রেস্টুরেন্ট, গুলশান-২ এর ৪৩ নম্বর রোডের সুরা রেস্টুরেন্ট, ৭১ নম্বর রোডের সুরা অন, নিউ কিংস কিচেন, জাকারিয়া, ডিম্পল, পিম্পল, ও কোরিয়ানা রেস্টুরেন্ট।

সূত্র জানিয়েছে, গত বছর নভেম্বরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তরফ থেকে অবৈধ মদ-বিয়ার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত এসব হোটেল ও রেস্টুরেন্ট মালিককে ডেকে অবিলম্বে মদ-বিয়ার বিক্রি বন্ধ করতে বলা হয়। সেইসঙ্গে রেস্টুরেন্টের প্রকাশ্য স্থানে ‘মদ-বিয়ার বিক্রি করা হয় না’ মর্মে নোটিশ টাঙিয়ে দিতে বলা হয়।

মদ-বিয়ার বিক্রির অভিযোগে বেশ কিছু হোটেল-রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়। কিন্তু তালিকাভুক্ত এসব হোটেল-রেস্তোরাঁ ঘুরে ‘মদ-বিয়ার বিক্রি হয় না মর্মে’ কোথাও কোনো নোটিশ দেখা যায়নি।

গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছেও এ ধরনের অভিযোগ আসছে। আমরা দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবো।

এদিকে গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মোস্তাক আহমেদ বলেন, মাদক প্রতিরোধে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা মাঝে মধ্যেই অভিযান পরিচালনা করি। এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন) খন্দকার তৌফিক আহমেদ বলেন, আমরা নতুন এক তালিকা তৈরি করেছি। এই তালিকা ধরে অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই সেসব বার, ক্লাব, রেস্টুরেন্ট এমনকি গেস্ট হাউসের নামে মদ বিয়ারসহ মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।