ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্সকে ডেকে তোফা-তহুরার মা শাহিদা বললেন, ‘আপা, তহুরার হাতটা একটু বাইন্ধ্যা দেন, সব তো খুইল্যা ফালাইতাছে।’ এ সময় নার্স তহুরার হাতের মুঠি সাদা ব্যান্ডেজে বাঁধতে বাঁধতে বললেন, ‘ওহ, তহুরা তো খুব দুষ্টু হয়ে গেছে।’ তহুরাও হাসিমুখে দা-দা-দা শব্দ করে যাচ্ছে।

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা হওয়ার পর এখন আগের চেয়ে বেশ ভালো আছে শিশু তোফা ও তহুরা। তাদের মা শাহিদার মুখেও ফুটে উঠেছে উজ্জ্বল হাসির ঝিলিক।

তহুরার বিছানার সঙ্গে লাগানো আরেক বিছানায় তোফা বেশ গম্ভীর। সবার কথা শোনে, কিন্তু তহুরার মতো ফিক করে হেসে দেয় না। মুখের ভাবভঙ্গিতে মনে হয় ও কিছু একটা নিয়ে চিন্তা করছে। চিকিৎসক সাহনূর ইসলাম বলেন, ‘ও তো আমাদের বুদ্ধিজীবী।’

আজ শনিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকদের বিশেষ অনুমতিতে হাসপাতালের বিশেষ পরিচর্যা কক্ষে তোফা ও তহুরার কাছে যাওয়ার সুযোগ মেলে। তখনই তোফা ও তহুরার এসব কাণ্ড চোখে পড়ে।

মেয়েরা কী করে জানতে চাইলে মা শাহিদা বলেন, ‘একজন যখন কাঁদে, তখন অন্যজন তাকায় তাকায় দেখে। মেয়েরা হাসে, খায়। ওরা এখন ভালো আছে।’

১ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের ২০ থেকে ২২ জনের একটি দল দীর্ঘ নয় ঘণ্টার অস্ত্রোপচার শেষে জোড়া লাগানো তোফা ও তহুরাকে আলাদা করেন। অস্ত্রোপচারের পর জ্বর, সংক্রমণসহ কিছু জটিলতা দেখা দেয় ওদের। তবে আজ দুজনই ছিল অন্যদিনের তুলনায় অনেক ভালো। পিঠের নিচ থেকে কোমরের নিচ পর্যন্ত পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে জন্মেছিল তোফা-তহুরা। ওদের বয়স এখন ১০ মাস, ওজন প্রায় ১০ কেজি। গাইবান্ধার এই দুই শিশু জন্ম থেকে শুরু করে অস্ত্রোপচারের আগ পর্যন্ত একজন আরেকজনের মুখ দেখতে পায়নি। এখন একজন আরেকজনকে দেখতে পায়।

শাহিদা বলেন, একজন ঘুমালেও তাকে শুইয়ে দেওয়ার কোনো উপায় ছিল না। এখন একজন ঘুমালে শুইয়ে দিয়ে আরেকজনকে কোলে নিতে পারেন। আলাদা আলাদা খাওয়াতে পারেন।

তোফা ও তহুরা যেভাবে জোড়া লাগানো ছিল, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘পাইগোপেগাস’। বাংলাদেশে ‘পাইগোপেগাস’ শিশু আলাদা করার ঘটনা এটি প্রথম। এর আগে অন্যান্য হাসপাতালে অন্য ধরনের জোড়া লাগানো শিশুদের অস্ত্রোপচার করে আলাদা করা হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাহনূর ইসলামের অধীনে তোফা ও তহুরা ভর্তি আছে। দুই শিশুর সার্বিক তত্ত্বাবধান করছেন তিনি। সাহনূর ইসলাম বলেন, আগামীকাল রোববার সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা তোফা ও তহুরার পরবর্তী চিকিৎসা নিয়ে করণীয় ঠিক করতে একসঙ্গে বসবেন। এখন তোফা ও তহুরা ভালো আছে। তবে এই দুই শিশু যখন মায়ের কোলে উঠে বাড়ি যাবে, তখনই বলা যাবে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ বা ঝুঁকিমুক্ত।