‘বাড়ি ওয়ালা কয় মাস থাকি কোনও বিল (বেতন) দেয়না, শুক্রবার বেতন নিয়া বাড়ি আসপ্যার চাইছিল। এবার বাড়ি আসি হামার সাথে কুরবানি ঈদ করবার চাইছিল।’
মেয়ের মৃত্যুর খবরে এভাবেই বিলাপ করে কাঁদছেন তার মা। শুক্রবার (৪ আগস্ট) ঢাকার বনশ্রী জি ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় গৃহকর্মী লাইলী (২৬) লাশ।
নিহত গৃহকর্মীর লাইলীর গ্রামের বাড়ী কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার কালিরহাট বাজার সংলগ্ন সমন্বয় পাড়ায়। মেয়ের মৃত্যু খবর টেলিভিশনের মাধ্যমে জানতে পারে শুক্রবার বিকেলে। এরপর ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় গৃহকর্মী লাইলীর বাবা নজরুল ইসলাম। মেয়ের মৃত্যু খবরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা আলেয়া বেগমসহ প্রতিবেশীরাও।
কান্না জড়িত কন্ঠে আলেয়া বেগম জানান, মনে ডাকছে ওই বাড়ি ওয়ালা আমার মেয়েকে মারছে। এখন ওর দুই অবুঝ শিশুর ভাগ্যে কি হইবে আল্লাহ ছাড়া কেউয় জানে না।
আলেয়া বেগম আরও জানান, বৃহস্পতিবার রাতে লাইলী তার বড় বোন লাভলী বেগমকে ফোনে বলছে যে, সে (লাইলী) কয়েক মাসের বকেয়া বেতন নিয়ে বাড়ি ফিরে আসবে। গত কয়েক মাস থেকে বাড়ি ওয়ালা তাকে বেতন-ভাতা দিচ্ছে না। এ জন্য তার নিজের বাসা ভাড়া বাকি পড়ে গেছে। অনেক কষ্টে ঢাকা শহরে ধার-দেনা করে তাকে চলতে হচ্ছিল। শুক্রবার সে (লাইলী) বকেয়া বেতন নেওয়ার জন্য ওই বাড়িতে গিয়েছিল বলে দাবি করেন লাইলীর মা আলেয়া বেগম।
পারিবারিক সুত্রে জানা গেছে, দশ বছর আগে উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের মধ্যকাশিপুর গ্রামে নজরুল হকের সাথে বিয়ে হয় লাইলীর। তাদের এক মেয়ে মরিয়ম (৫) ও এক ছেলে আতিকুর রহমান (৩) রয়েছেন। দেড় বছর আগে লাইলীর স্বামী নজরুর হক কাজের সন্ধানে ভারতে চলে যায়। যাওয়ার সময় সে ভারতীয় বিএসএফের কাছে সীমান্তে ধরা পড়েন। বর্তমানে সে দেড় বছর ধরে ভারতের কোবিহার জেলার কারাগারে বন্দি রয়েছে গৃহকর্মী লাইলীর স্বামী নজরুল হক।
এদিকে অভাবের তাড়নায় গত বছর তার ননদ জাহানারার মাধ্যমে দুই সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় কাজ করতে যান লাইলী। সর্বশেষ গত সাত মাস আগে বাড়িতে ফিরেছিল সে। এবার কোরবানি ঈদ পরিবারের সাথে করার কথা থাকলেও তা আর ভাগ্যে জুটলো না এই দরিদ্র গৃহকর্মী লাইলীর। তার অকাল মৃত্যুতে তার অবুঝ সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে আশঙ্কায় পড়েছে পরিবার।
শুক্রবার (৪ আগস্ট) ঢাকার বনশ্রী জি ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাড়ি থেকে লাইলী (২৬) নামের এক গৃহকর্মীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ ব্যাপারে গৃহকর্তা মঈনুদ্দিন জানান, লাইলী তার বাসায় প্রতিদিন সকালে কাজ করতে আসেন। শুক্রবার সকালে বাসায় কাজ করতে এসেই একটি কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন লাইলী। ডাকাডাকির পর দরজা না খোলায় দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় লাইলীকে। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠালে সেখানকার চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।





