স্কুলে তখন কন্যাশ্রী দিবসের অনুষ্ঠান চলছে। বিশ্বজয়ের করতালিতে মুখর সভাস্থল। ঠিক সেই সময়েই কাঁদতে কাঁদতে হাজির নবম শ্রেণির এক গরিব ছাত্রী। পরনে মলিন স্কুল পোশাক।

বিবর্ণ মুখ। আতঙ্কের ছাপও স্পষ্ট। পা দু’টো থরথর করে কাঁপছে। কী হয়েছে তোমার? শিক্ষকদের প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে এক নিঃশ্বাসে উত্তর দিল ওই ছাত্রী—‘ আমি এখন বিয়ে করব না স্যার, আমি পড়াশুনা করতে চাই। যেভাবেই হোক বিয়ে আটকান’!

না, কোনও বাংলা সিরিয়ালের গল্প নয়। ভয়কে উপেক্ষা করেই স্কুলের শিক্ষকদের দ্বারস্থ হয়ে এভাবেই নিজের বিয়ে আটকাল নবম শ্রেণির তুহিনা পারভিন। শুক্রবার কন্যাশ্রী দিবস উদ্যাপনের দিনে এমনই অভিনব ঘটনার সাক্ষী থাকল ভারতের দেগঙ্গার হাদিপুর আদর্শ হাইস্কুল।

ছাত্রীর বাবা পুলিশের কাছে ‘মুচলেকা’ও দিয়েছেন, ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত তিনি মেয়ের বিয়ে দেবেন না। গরিব ছাত্রীর মুখে হাসি ফুটেছে। তার মুখে যাতে এই হাসি লেগে থাকে, তার জন্য পড়াশুনায় আর্থিক সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রশাসনও। তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সবাই।

স্কুল ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, তুহিনার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। কোনওরকমে সংসার চলে। তবুও পড়াশুনা বন্ধ করেনি সে। কিন্তু শুক্রবারই তার বাবা তুহিনার বিয়ের পাকা দেখা সেরে ফেলেছিলেন। তিনি মেয়েকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, আর স্কুলে যাওয়ার দরকার নেই। বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।

কীভাবে বিয়ে আটকাবে, ভেবেই পাচ্ছিল না এই কিশোরী। সে ভেবেছিল যেভাবেই হোক, স্কুলে গিয়ে বিষয়টি শিক্ষকদের গোচরে আনতে হবে। শুক্রবারই নিজের হাদিপুর আদর্শ হাইস্কুলে কন্যাশ্রীর অনুষ্ঠান ছিল। বাড়ির লোকজনদের না বলেই সে লুকিয়ে স্কুলে চলে যায়। স্কুলে পৌঁছে চোখের জল সামলাতে পারেনি তুহিনা।

স্কুল পরিচালন সমিতির সভাপতি হুমায়ুন চৌধুরী বলেন, কন্যাশ্রী দিবসের অনুষ্ঠান উপলক্ষে আমি স্কুলে গিয়েছিলাম। তুহিনাকে কাঁদতে দেখে আমি এবং স্কুলের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম জিজ্ঞাসা করি, কী হয়েছে? তখন ও আমাদের জানায়, শুক্রবারই ওর বাড়ির লোকজন বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। কিন্তু সে পড়াশুনা করতে চায়। বিয়ে করবে না এখন।

তিনি বলেন, ওই ছাত্রী আমাদের কাছে লিখিত আবেদনও করে। আমরা ওকে প্রথমে আশ্বস্ত করি। তারপর আমরা স্কুলের পক্ষ থেকে বিষয়টি দেগঙ্গার বিডিও’কে লিখিত আকারে জানাই। তাতেই বিয়ে আটকায়। যেহেতু ওই ছাত্রী খুবই গরিব, তাই ওর পড়াশুনার জন্য আমরা বই, খাতা দিয়ে সাহায্য করব।

দেগঙ্গার বিডিও মনোজ কুমার বলেন, স্কুল আমাকে জানানোর পরই আমি বিষয়টি দেগঙ্গা থানার ওসির নজরে আনি। ওই ছাত্রী কন্যাশ্রী প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। তবে তুহিনা যেহেতু পড়াশুনা চালাতে চায়, তাই আমরা অবশ্যই ওর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখব। যাতে ওর পড়াশুনার কোনও সমস্যা না হয়, সে ব্যাপারে আমরা সবরকম সাহায্য করব।

শুক্রবার রাতেই তুহিনার বাবা পুলিশকে মুচলেকা দিয়েছেন। শনিবার তুহিনাকে দেখা গেল আনন্দের সঙ্গেই কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে আসতে। কান্না নয়, আনন্দে চোখের কোণ চিকচিক করেছিল। চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপও উধাও। পরিবর্তে মুখজুড়ে স্নিগ্ধ সরল হাসি। হবেই নাই বা কেন? এ তো যুদ্ধ জয়েরই সমান!