স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য লন্ডনে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। প্রায় দুই সপ্তাহ হতে চলছে, এখনও চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাননি তিনি! চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে আরো কিছুদিন সময় লাগতে পারে।
এই অবসরে মা-ছেলে একান্তে বসে নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া ‘দূরত্ব’ কমিয়ে আনছেন বলে লন্ডন বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।
মা-ছেলের একান্ত বৈঠকে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, একাদশ নির্বাচন, প্রার্থী মনোনয়ন ও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে ওই সূত্রটি ধারণা করছেন।
খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন পরবর্তী আন্দোলন প্রত্যাহার ও বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন নিয়ে মা-ছেলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। আগামী নির্বাচনের আগে তা মেটাতেই মূলত: লন্ডনে গেছেন খালেদা জিয়া। যে কারণে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে একটু সময় নিচ্ছেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘বিগত দিনে রাজনৈতিক ও আন্দোলন ইস্যুতে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের ঐক্যমত নিয়ে কিছুটা দূরত্ব ছিল। যার ফলে ৫ জানুয়ারি কিছু না বলেই হুট করে আন্দোলন থেকে সরে আসলে কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়া যায়নি। এবার এই ফাঁদে পা দিতে চান না তারা।’
তিনি বলেন, ‘লন্ডনে আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত ছাড়াও সাংগঠনিক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে।’
তাছাড়া ২০ দলীয় জোটের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোকে আগামী নির্বাচনে আগে একটি প্লাটফর্মে কিভাবে নিয়ে আশা যায় সেটা নিয়েও মা-ছেলে একটা সিদ্ধান্তে আসবেন বলে মনে করেন ওই নেতা।
গত বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর জাতীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। কিন্তু দলের স্থায়ী কমিটির তিনটি, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদকের দু’টি এবং ছাত্র বিষয়ক সম্পাদকের একটি পদ শূন্য আছে। শূন্য এসব পদে কাদেরকে বসানো হবে সেই বিষয়ও ফয়সালা হতে পারে লন্ডনে।
এর বাইরে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া ছাত্রদল, শ্রমিক দল, কৃষক দল, তাঁতী দল ও মৎস্যজীবী দলের কমিটিও গঠিত হয়নি। ষষ্ঠ কাউন্সিলে দলীয় গঠনতন্ত্রে ‘এক নেতার এক পদ’-এর বিধান সংযোজিত হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তৃণমূল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শেষ হয়নি।
৭৮টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে অর্ধশতাধিক জেলার কমিটি ঘোষিত হয়েছে। দলটির নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশা, লন্ডনে দলের দুই হাইকমান্ড এই বিষয়গুলোরও আলোচনা করে সমাধান করবেন। না হলে আগামী দিনের রাজপথ আন্দোলন ও নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের উপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনেরও সময় বেশি বাকি নেই। ২০১৮ সালের শেষের দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। এর আগে নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় ও দলীয় প্রার্থী বাছাইসহ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বিএনপির। যে কারণে খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। কারণ বিগতে দিনে আন্দোলন সংগ্রামে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান লন্ডনে বসেই তৃনমূলসহ দলের নেতাকর্মীদের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ১৫ জুলাই লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন খালেদা জিয়া। যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে প্রথমে হিলটন হোটেলে উঠেছিলেন তিনি। সেখানে কয়েক ঘণ্টা অবস্থানের পর লন্ডনের কিংস্টনে ছেলে তারেক রহমানের বাসায় ওঠেন খালেদা জিয়া।
ওই বাসায় তারেকের স্ত্রী জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান ছাড়াও প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি ও তার দুই মেয়ে জাফিয়া রহমান ও জাহিয়া রহমান রয়েছেন।
তারেকের লন্ডনের ওই বাসায় দলের নেতাকর্মীদের অবাধ যাতায়াত নেই। সেখানে এখন ছেলে, পুত্রবধূ, নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন খালেদা জিয়া।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম কয়েছর আহমেদ বুধবার বিকেলে পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘ম্যাডাম লন্ডনে আশার পর থেকেই পরিবারকে সময় দিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত তিনি পরিবারের সদস্য ছাড়া বাইরের কারোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। কোনো নেতাকর্মী দেখা করতে পারেননি। একান্তই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন তিনি।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ডাক্তারের কোনো সিডিউল পাওয়া যায়নি।
২০০৬ সালে ক্ষমতা হারানোর পর লন্ডনে খালেদা জিয়ার এটি তৃতীয় সফর। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে দেশে ফেরার পথে বড় ছেলে তারেক রহমানকে দেখতে যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর ২০১৫ সালে ১৬ সেপ্টেম্বর একবার তিনি লন্ডন যান। সেখানে বড় ছেলে তারেক রহমানের বাসায় ওঠেন তিনি। দুই মাসের বেশি সময় লন্ডনে অবস্থান করে ২১ নভেম্বর দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় (২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা) হুলিয়া নিয়ে প্রায় ১০ বছর ধরে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে লন্ডনে রয়েছেন।





