বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ বিরোধী কার্যক্রমের প্রশংসা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা বলেছেন, এফবিআই থেকেও ভালো কাজ করছে বাংলাদেশ।
সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ সুবীর ভৌমিক স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাউন্টার টেররিজম কর্মকর্তা মাইকেল ডাফির বরাতে শুক্রবার একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাতকারে এ কথা বলেছেন।
ডাফি কলকাতায় এক সাক্ষাতে সুবীর ভৌমিককে জানান, ‘দে আর ডুইং অ্যা বেটার জব দেন এফবিআই।’ এই সাক্ষাৎকারে ডাফি তার বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে সুবীর ভোমিককে এ কথা বলেন।
সুবীর ভৌমিক বলেন, জঙ্গিবাদ এককভাবে বাংলাদেশের সমস্যা নয়। বরং এটি বাঙ্গালির সমস্যা, সামষ্টিকভাবে দেখলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার সমস্যা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মনির ভাই (কাউন্টার টেররিজম বিভাগের প্রধান মনিরুল ইসলাম) এবং তার দল যেভাবে জঙ্গিদের টপ গান ম্যানদের নিউট্রলাইজ করছে, তা নিশ্চিতভাবে প্রশংসার যোগ্য। আমরা তো বাংলাদেশের বন্ধু, প্রশংসা করবই। কিন্তু সাহেবরাও (যুক্তরাষ্ট্রর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা) বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের প্রশংসা করছে।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে মনির ভাইরা (সন্ত্রাসী কার্যক্রমের) মাজা ভেঙ্গে দিচ্ছে। বাংলাদেশের অনেক সমস্যা আছে, ট্র্যাকিং ডিভাইস, টেকনোলজি। অনেক কিছু না থাকার পরেও রুটিন পুলিশিং করে যে একটা লিড পাচ্ছে তা ধরে খুব তৎপরতারে সঙ্গে চেইজ করছে (জঙ্গিদের) এবং চেইজ করার পরে একটার পর একটা টপ গানদের যেভাবে নিউট্রালাইজ করতে পেরেছে মনির ভাইরা, সানোয়ার ভাইরা, এটার প্রশংসা শুধু আমরা নয়, সাহেবরাও আজ বলছে দেয়ার ডুইং এ বেটার জব দেন এফবিআই। এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।
এরপর কণ্ঠে খানিকটা ক্ষোভ নিয়েই তিনি বলেন, কিন্তু এখানে মনির ভাইরা যতই সক্রিয়ভাবে কাজ করুক, যদি পার্শ্ববর্তী দেশে এবং বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের কাছে এরা (সন্ত্রাসীরা) আশ্রয় পেয়ে যায়, মুসা-টুসার মত লোকজন তারা পশ্চিমবঙ্গে ধরা পড়েছে। আরো এরকম দু-চারজন এখানে ঘোরাফেরা করছে। তাহলে একটা চিন্তার ব্যাপার আছে।
এ সময় তিনি আরো বলেন, যেই বাঙ্গালি ভাষা এবং সংস্কৃতির ভিত্তিতে দেশ স্বাধীন করেছিল, সেই বাঙ্গালির ঘরের ছেলে হঠাৎ করে জেহাদ করার জন্য এতটাই উৎসাহী হয়ে যাচ্ছে, ৪০ বছর দেশ স্বাধীনতার মধ্যে! জিহাদের জন্য সে এইভাবে হত্যা করছে, এইভাবে আক্রমণ হানছে! এটা একটা চিন্তার ব্যাপার। এই ব্যাপারটা কেবল বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কারণ বাঙ্গালি বাংলাদেশে যেমন থাকে তেমনি তার পার্শ্ববর্তী পশ্চিম বঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা এ সব অঞ্চলেও প্রচুর বাঙ্গালি আছে। বাঙ্গালি বংশোদ্ভূতও লোকজনও আছে। অনেক সময় আপনি আসামে গিয়ে দেখবেন নিজেকে অসমই বলে পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু আসলে তারা বাড়ি ময়মনসিংহে। তাদের কথা শুনলেই আমি বুঝতে পারি তারা কোন অঞ্চলের লোক। এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যেও এ ধরণের ব্যাপার এ ধরণের চিন্তাধারা ছড়িয়েছে যে, বাংলাদেশ থেকে লোকজন আসছে, এ পাড়ে আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু এই জঙ্গিরা বর্তমানে আসাম বা ত্রিপুরায় আশ্রয় না পেলেও যে কারণেই হউক পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় পেয়েছে। যেটা আমি বলতাম এবং সে কারণে তৃণমূলের কংগ্রেসের লোকজন আমাকে আক্রমণ করত। কিন্তু খাগড়াগড়ে যখন আকস্মিকভাবে বোমাগুলো ফাটল। তার নিচের তলায় তৃণমূলের অফিস, ওপর তলায় জেএমবি, বোম বানাতে গিয়ে বোম ফেটে গেছে। তারপর থেকে কিন্তু আমার সামনে তৃণমূলের লোকজন বেশি কথা বলে না।
তিনি বলেন, এখানে যারা এই মৌলবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, যাদের সিভিতে আমরা দেখেছি স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অব ইন্ডিয়া তারা আজ তৃণমূলের সাংসদ। এখানকার যিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তাদের একটু ভালো করে দেখাশুনা করে। সুবীর ভারতে বাংলাদেশি জঙ্গিদের আশ্রয় নেয়া প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশ এটার বিরুদ্ধে যেভাবে লড়েছে, বিশেষ করে হোলি আর্টিজানের পরে, সেই ধরণের আর্জেন্সি ভারত সরকার দেখিয়েছে, ত্রপুরা ও আসামের মত বেশ কিছু রাজ্য সরকারও দেখিয়েছে। আসামে প্রচুর গ্রেফতার হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সেটা যে কোন কারণেই হউক, আমরা দেখতে পাইনি। সেই রাজনীতিতে আমি যাচ্ছি না। কিন্তু এই কারণেই এটা বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়। এটা বাঙ্গালির সমস্যা এবং সার্বিকভাবে এটা দক্ষিণ এশিয়ার সমস্যা। খানিকটা এর প্রভাব গিয়ে বার্মাতেও পড়বে।
এ সময় রোহিঙ্গাদের ওপর এর প্রভাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বরেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে সবাইতো আর জেহাদি নয়। কিন্তু তাদের মধ্যে যারা জাতি সত্ত্বার আন্দোলন করে, তারা আজ সাইড লাইনে চলে গিয়ে সেখানে যেই জেহাদি গোষ্ঠীগুলো নতুন করে আবির্ভূত হচ্ছে, তারা বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তে সক্রিয়। এটা যেমন বার্মার মাথা ব্যথা, তেমনি বাংলাদেশেরও মাথা ব্যথা। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে।
এ সময় হলি আর্টিজান হামলার পেছনে জেহাদি মতাদর্শের বাইরেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে বলে মত দেন তিনি। এই সন্ত্রাস বিশেষজ্ঞ বলেন, আমি বলব, এখানে কিন্তু একটা পলিটিকাল প্লানিংয়ের গন্ধ পাই। হোলি আর্টিজানে হামলা করলে, সারা বিশ্বে একটা হইচই হবে, বড়বড় জেহাদি যারা মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যদেশে বসে আছে, সেখান থেকে টাকা পয়সা আসবে। সেটা ঠিক। আবার জাপানিদের আক্রমণ করলে মেট্রোরেলের মত বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ভেস্তে যাবে, ইতালিয়ান বা গার্মেন্টেসের জন্য যারা এসেছে তাদের হত্যা করলে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি লাটে উঠবে, এমন পরিকল্পনাও থাকতে পারে। এখানে কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্যারালাইজ করার একটা গন্ধ আমি স্পষ্ট পাই। যারা প্রান্তিক সৈনিক (জেহাদি) তারা হয়ত এটা চিন্তা করেনি, মনির ভাই যেটা বলেছেন। কিন্তু যাদের হাতে পাওয়ার বা রিমোট, তাদের পেছনেও রিমোট বা পাওয়ারফুল লোকজন আছে। তাদের অবজেকটিভটা পলিটিক্যাল। পলিটিক্যালি মোটিভেটেড হয়েই এই হামলা।





