ঋতু পরিক্রমায় বর্ষার আগমনকে কেন্দ্র করে খাল-বিল আর ডোবা-নালায় থৈ থৈ করছে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি। টুইটুম্বর পানিতে বেড়ে গেছে চিংড়ি, বাইলা, টাকি ও তেতোপুঁটিসহ দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের আনাগোনা।
চলতি বর্ষায় খাল বিল আর জমিতে আসা পানিতে ছোটাছুটি করা মাছ ধরাকে উপলক্ষ করে দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকা পিরোজপুরের বিভিন্ন হাটবাজারে পুরোদমে জমে উঠেছে চাঁইয়ের হাট।
বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই বাড়ি বাড়ি থেকে কাচা বাঁশ সংগ্রহ করে থাকেন কারিগররা। পরে এ বাঁশ বিভিন্ন সাইজে ভাগ করার পর চেরাই করেই চাঁই নির্মিত হয়। মৌসুম ভিত্তিক এ পেশার সাথে জড়িত সবাই গৃহস্থলীর অন্যান্য কাজের ফাঁকে এ কাজ করে থাকেন। মূলত হিন্দু পরিবারের লোকজন এ পেশার সাথে বেশি সম্পৃক্ত। চাঁইয়ে বেশির ভাগ চিংড়ি মাছ আহরিত হয়। আর এ জন্য গ্রামের বিভিন্ন হাটবাজরে বসে চিংড়ি মাছের ডিপো। মৎস্য আহরণকারীরা মাছ ধরে এনে প্রতিদিন ডিপো গুলোতে বিক্রি করে থাকেন। ডিপো থেকে আবার প্রতিদিন এ মাছ রাজধানী ঢাকাসহ চলে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে।
আর এই পেশাকে ঘিরে প্রতি বছর বাংলা মাসের জৈষ্ঠ্যর মাঝামাঝি থেকে ভাদ্রর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় বসে এই চাঁইয়ের হাট। লতা, ময়ূরপঙ্খি, গোল ও চাপা চাঁইসহ বাহারি নামে বিভিন্ন দামে হাটে চাঁই নিয়ে আসা ক্রেতা, বিক্রেতা ও প্রকৃতিপ্রেমী উৎসুখ মানুষের সমাগমে সৃষ্টি হয় অপূর্ব মিলনমেলা।
এ জেলার ইন্দুরকানী উপজেলায় চাঁইয়ের সবচেয়ে বড় হাট বসে ঘোষেরহাটে। এছাড়া পত্তাশী ও পাড়েরহাটেও সপ্তাহে দুদিন বসে চাঁইয়ের হাট। বিভিন্ন প্রকারভেদে প্রতি কুড়ি চাঁই (২০টি) ১৪’শ থেকে শুরু করে ২৫’শ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। এ উপজেলায় চাঁই বুনন ও মৎস্য আহরণের সাথে জড়িত প্রায় এক হাজারের বেশি পরিবার।
একই ভাবে এ জেলার মঠবাড়িয়া, ভান্ডারিয়া ও কাউখালী উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজারেও বসে চাঁইয়ের হাট।
এছাড়া নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানার মানপাশা বাজারে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে ঐতিহ্যবাহী এই চাঁয়ের হাট। এটি এ অঞ্চলের বর্ষা মৌসুমে চাঁইয়ের হাটের জন্য বিখ্যাত। এ উপজেলার আটঘরে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই চাঁই ব্যবসাকে ঘিরে এসময়ে ঘটে নানান মানুষের কর্মসংস্থান।
স্থানীয় তথ্যমতে, এই চাঁই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এ উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী নাজিরপুরের ২০-২৫টি গ্রামের প্রায় আড়াই সহস্রাধিক পরিবারের মৌসুম ভিত্তিক কর্মসংস্থান ঘটে।
নাজিরপুরের কলারদোয়ানিয়া এলাকার চাই ব্যবসায়ী মোঃ জহিরুল মিয়া বলেন, গত দু‘তিন বছরের তুলনায় এবছর হাটে বেচাবিক্রি খুবই ভাল। তিনি এক কুড়ি গোল চাঁই বিক্রি করছেন ২ হাজার টাকায়। এক কুড়ি ময়ূরপঙ্খি চাঁইয়ের দাম ২ হাজার পাঁচশত টাকা।
চাঁই ব্যাবসায়ী ও কারিগন মোঃ কবির মিয়া বলেন, তিনি প্রতি হাটে এক হাজার থেকে দেড় হাজার চাঁই আনেন। বেচা বিক্রি মোটামুটি ভাল থাকায় খাজনা ও সাথে থাকা শ্রমিকদের মজুরী মিটিয়ে কিছুটা লাভবান হচ্ছেন।
হাটে আসা নাজিরপুরের চাঁই কারিগর পরিমল, অরুন মিস্ত্রি ও সরোয়ার বলেন, একটি চারশ টাকার বড় সাইজের বাঁশ দিয়ে ১৩-১৫টি চাঁই হয়। ১০টি চাঁই তৈরীতে তিনজনের সময় লাগে একদিন। গড় চাঁই মজুরীসহ সব মিলিয়ে তার খরচ পড়ে ৫০-৬০টাকা। হাটে প্রতিটি চাঁই বিক্রি হয় ৯০-১০০ টাকায়। ব্যাবসায় প্রায় দ্বিগুন লাভে বাড়ীর মহিলারাসহ কোন কোন শিক্ষিত বেকার ছেলেরাও জড়িয়ে পড়ছে চাঁই বুনন কাজে। একই কথা জানিয়ে কাটাপিটানিয়া গ্রামের চাঁই ব্যাবসায়ী স্বপন কুমার বলেন, তাদের গ্রামে প্রায় ৫০-৬০টি পরিবার চাঁই বুনন কাজে জীবিকা নির্বাহ করে। তিনি ৩৫ বছর ধরে এ পেশায় নিয়োজিত।
চাঁই কারিগর কবির মিয়া বলেন, একসময় সে নেছারাবাদ, কাউখালি ও নাজিরপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বাঁশ কিনে নিজে চাঁই বুনত। অন্যদেরকেও এ পেশায় উৎসাহ দিতো। বর্তমানে নির্বিঘ্নে বাঁশঝাড় উজাড় করে বসতি স্থাপনসহ নানা স্থাপনা গড়ে তোলায় ক্রমেই বাঁশঝাড় বিলুপ্তির পথে। যে কারণে বাশেঁর একটু দামও বেশি। তাই তিনি এসব চাঁই তৈরীতে যশোর, নড়াইল থেকে বাঁশ সংগ্রহ করছেন। সেই বাঁশ দিয়েই চাঁই বুনছেন এবং অন্যদের কাছেও চাই বুননে বাঁশ বিক্রি করছেন।
ইন্দুরকানীর ঘোষেরহাটে আসা একাধিক ব্যবসায়ী ও চাঁই দিয়ে মৎস্য আহরনকারী চরবলেশ্বর গ্রামের লিটন জানান, এখন আর তেমন খাল-বিল নেই। প্রভাবশালীরা বেশির ভাগ খালের পাড়, গ্রামের ভিতরে সরকারি খাল ভরাট করে পরিধি বৃদ্ধি করছেন বাসাবাড়ী ও দোকানপাটের। উপজেলার বেশিরভাগ খালই হারিয়ে ফেলছে সে সময়কার জোয়ার ভাটার যৌবন। সে জন্য মাছের সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। এছাড়াও নদীর পাড়ে অসাধুরা বাঁধজাল, চরগড়া দিয়ে নির্বিচারে মাছ নিধনে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছের সংখ্যা।





