ফিটনেসবিহীন লঞ্চ দিয়েই চলছে যাত্রী পরিবহণের কাজ বছর বছর ধরে দিব্বি চালিয়ে যাচ্ছে লঞ্চ মালিকরা। জীবন রক্ষার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ছাড়াই চলাচল করছে এসব লঞ্চ।

এর সাথে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়ার প্রতিযোগিতা। দুর্ঘটনার আশঙ্কা জেনেও অনেকটা বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব নৌযানে যাতায়াত করতে হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের।

নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যথাযথ তদারকির অভাব ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা। বর্তমানে দেশে ৫৮০টি লঞ্চ চলাচল করছে। উৎসবের ছুটি ছাড়া এসব লঞ্চে গড়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লাখ যাত্রী চলাচল করে থাকেন। যা ঈদের সময় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ গুণ। ঠিক এই সময়ে মোনাফা লোভী লঞ্চ ব্যবসায়ীরা কোনো নিয়মের তোয়াকা না করে পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন লঞ্চ নৌ রুটে নামিয়ে দিচ্ছে। যার ফলে প্রায় ঘটছে নৌরুটে দুর্ঘটনা। এতে মানুষের মৃত্যুর মিছিল যেন বেড়েই চলেছে আর লাশের সন্ধানে নতুন করে লাশ হচ্ছে পরিবারের জীবিত সদস্যটিও।

এসব লঞ্চে বাধ্যতামূলক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, লাইফ জ্যাকেট, লাইফ বয়াসহ জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা বিরল। শুয়ারিঘাট ও সদরঘাটে লঞ্চগুলোতে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায় প্রায় সবগুলো লঞ্চে মানা হচ্ছে না লঞ্চ সেবা এই আইন।

এমভি পারাবাত-১১ লঞ্চের যাত্রী ধারণের ক্ষমতা ১ হাজার ১২ জন। ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী লঞ্চটিতে ২৫৩টি লাইফ বয়া থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ১১৬টি। ২২টি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মধ্যে মাত্র ১২টি থাকলেও তার মধ্যে তিনটি বিকল। এমভি সুরভী-৭ লঞ্চের যাত্রী ধারণের ক্ষমতা ৮৯০ জন। লাইফ বয়া ২’শ টির পরিবর্তে আছে ১০৫টি। ফায়ার বাকেট ১৮টির মধ্যে তিনটি বিকল। এ লঞ্চের কোথাও বালুভর্তি বাক্সের দেখা মেলেনি। মনিংসান-৬ লঞ্চে যাত্রী ধারণের ক্ষমতা ৬৬১ জন। লঞ্চটিতে ৭০টি লাইফ বয়া থাকলেও পাওয়া যায় মাত্র ২৯টি লাইফ বয়া, ১৪টি ফায়ারবাকেট থাকার কথা থাকলেও একটিও ফায়ারবাকেটের সন্ধান পাওয়া যায়নি। প্রতি যাত্রীর জন্য একটি করে লাইফ জ্যাকেট থাকার বিধান থাকলেও দুই একটি লঞ্চ ব্যতিত অন্যসব লঞ্চে একটি লাইফ জ্যাকেটেরও খোঁজ মেলেনি।

এছাড়া দক্ষ মাষ্টার ও সুকানীর পরিবর্তে লস্কর দিয়ে মাঝে মধ্যে লঞ্চ চালানো হচ্ছে। ফলে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় অসংখ্য নৌ-দুর্ঘটনা। আর ঈদের সময় মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে এভাবেই লঞ্চগুলো যাত্রী পরিবহন করলেও বিষয়টি যেন দেখার কেউ নেই।

অনুসন্ধানে থেকে জানায়, বাধ্যতামূলকভাবে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর এ নৌযানগুলোতে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম রাখার নির্দেশ দিলেও তা মানছেন না লঞ্চ মালিকরা। অভিযোগ রয়েছে, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের সার্ভে বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তাকে মোটা অংকের টাকা উৎকোচ দিয়ে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম না থাকা সত্বেও এসব নৌযান বীরপর্দে যাত্রী পরিবহন করছে। জানায় উৎকাচ দিলেই সার্ভে না করেই ফিটনেস সনদ পাওয়া যায় এসব কর্মকর্তার হাত ধরে।

দেশে প্রতিবছরই ঈদের সময় ছোট বড় লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ২৬ বছরে দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে ৬৬০টি লঞ্চ। মারা গেছেন প্রায় সাড়ে ছয় হাজার লোক। আর দুর্ঘটনার পর নিখোঁজ আছেন আরও প্রায় ১ হাজার ৬শ’ জন। এসব লঞ্চ দুর্ঘটনার কারণে নিশ্চিহ্ন হয়েছে চার শতাধিক পরিবার। আর একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছে আরও কয়েক শ’ পরিবার।

বর্তমানে সদরঘাটে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ৪৫টি নৌ-রুট রয়েছে। যার বেশি ভাগ রুটে চলাচল করা লঞ্চগুলো অরক্ষিত। অরক্ষিত নৌ-রুট, মেয়াদহীন ও ফিটনেসবিহী্ন লঞ্চ চলাচল এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহনের এই বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমডোর এম মোজাম্মেল হকের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের মাত্র ৫শ’ নৌ-পুলিশ রয়েছে। এর সংখ্যা হওয়া ২০ হাজার উচিত। এই পুলিশের কিছু সার্ভে জাহাজ ও স্পিডবোট দেয়া হয়েছে। যা দিয়ে নৌযানে শৃঙ্খলা রক্ষা সম্ভব নয়।

লঞ্চ মালিক সমিতির সিনিয়ার ভাইস চেয়ারম্যানে বদিউজ্জামান বাদলের সাথে এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে তিনি লঞ্চ চালানোর অনুমতি দেওয়া কাগজ দেখিয়ে বলেন, আমাদের অনুমতি আছে বলেই আমরা লঞ্চ চালাছি। অনুমতি নৌমন্ত্রণালয় থেকে দিয়েছে। কোনো প্রশ্ন থাকলে সেখানে গিয়ে খবর নেন।

স্বাধীনতার পর থেকেই লঞ্চ দুর্ঘটনা এই একই চিত্রের পুরনাবৃত্তি ঘটছে। যখন বড় কোনো দুর্ঘটনা হয়, তখন সরকারের মধ্যে নড়াচড়া শুরু হলেও তা এক সময় থেমে যায়। কেউই শাস্তি পায় না। কিন্তু এই সমস্যা সমাধানের জন্য নৌ মন্ত্রণালয় থেকে নৌ আদালত ঘটন করে দেওয়া হলেও এর কোনো কার্যকারী প্রভাব দেখা যাচ্ছে না লঞ্চ ঘাটগুলোতে।

নৌ আদালতের প্রসিকিউটিং কর্মকর্তা, ডিজি শিপিং পারভিন সুলতানার কাছে নৌ মন্ত্রণালয় থেকে বেঁধে দেওয়া আইন না মানলে, তারা কি ব্যবস্থা নিচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রায়ই নৌ আদালত থেকে অভিযান পরিচালনা করা হয় এবং ঈদের সময় বিশেষ টিম নামানো হয়। আর অতিরিক্ত যাত্রী বহনের জন্য যাদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের জামিন কোনো ভাবে মঞ্জুর করা হয় না। তা ছাড়া যেসব লঞ্চের অবস্থা খারাপ বা চলার অযোগ্য বলে মনে হয় সেগুলোকে বালিত ঘোষণা করা হয়। চলতি বছর রমজান মাসে মোট ৪টি লঞ্চকে বালিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাস মোট ৪০৫টি নৌ দুর্ঘটনা ঘটনা ঘটেছে। যার বিপরীতে মামলা হয়েছে ৩২১টি। যার মধ্যে রায় হয়েছে ২৬৭টি মামলার। যাতে ১৮৬ জনের জেল জরিমানা হয়েছে। আর এখনো ৫৪টি মামলার বিচার কাজ চলছে।