প্রস্তাবিত বাজেটে বাড়তি আবগারি শুল্ক, বাড়তি ভ্যাট এবং সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো নিয়ে সংসদে অর্থমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা হয়েছে।

বিরোধীদলীয় সাংসদদের পাশাপাশি সরকারদলীয় সাংসদরাও অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করেন। শুধু তাই নয়, অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ করার দাবিও এসেছে সংসদ থেকে। এতেকরে চাপের মুখে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত।

গত সোমবার জাতীয় সংসদে কড়া ভাষায় অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। বাজেটের নানা ত্রু টি, ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক নিয়ে বক্তব্য দেন আরও অন্তত ১০ জন সাংসদ।

অর্থমন্ত্রীর কথাবার্তায় সরকার বিব্রত মন্তব্য করে সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ সাংসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, অর্থমন্ত্রীর কিছু কথাবার্তায় সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। আগেও তিনি অর্থমন্ত্রীকে কথা কম বলার পরামর্শ দিয়েছেন জানিয়ে সেলিম বলেন, আপনার বয়স হয়ে গেছে, কখন কী বলে ফেলেন ঠিক থাকে না।

প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক বাড়ানোর বিষয়ে অনড় থাকায় অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ‘আপনার দায়িত্ব বাজেট পেশ করা। এই সংসদের ৩৫০ জন জনগণের প্রতিনিধি ঠিক করবেন জনগণের কল্যাণে কোনটা থাকবে, কোনটা থাকবে না। আপনি একগুঁয়েমি সিস্টেম বন্ধ করেন, কথা কম বলেন।’

ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাবের সমালোচনা করে সেলিম বলেন, এই সামান্য টাকার জন্য গোটা জাতির কাছে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে খারাপ ধারণা তৈরি হবে। আবগারি শুল্ক আগের অবস্থায় রাখার দাবি জানিয়ে হানিফ বলেন, অর্থমন্ত্রী কী কারণে কার স্বার্থে ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক করেছেন, জানা নেই।

মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, বাজেট নিয়ে সারা দেশে আলোচনার ঝড় চলছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এটা নির্বাচনী বাজেট নয়। তাহলে মাননীয় অর্থমন্ত্রী কবে নির্বাচনী বাজেট দেবেন? ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রস্তাবের বিরোধিতা করে সরকার দলের এই সদস্য বলেন, অর্থমন্ত্রী ভ্যাট আরোপ করেছেন গণহারে। পৃথিবীর ইতিহাসে এক বছরে ৩০ শতাংশ বাড়তি ভ্যাট আহরণের নজির নেই। এটা যৌক্তিক নয়।

ব্যাংকখাতে লুটপাটের অভিযোগ এনে হানিফ বলেন, বেসিক ব্যাংককে এক হাজার কোটি টাকা মূলধন দেওয়া হচ্ছে। কার টাকা কেন দিচ্ছেন? তাঁরা দুর্নীতির জন্য লুটপাট করবে আর মূলধন দিতে হবে আমাদের? প্রয়োজনে এই ব্যাংকগুলোর বিষয়ে নতুন করে চিন্তা করা হোক। সরকারি টাকা এভাবে লুটপাট করতে দেওয়া যাবে না।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট দিয়ে অর্থমন্ত্রী নির্বাচনের আগে জনগণকে ‘বিভ্রান্ত’ করছেন বলে মন্তব্য করেন সরকারি দলের আরেক সাংসদ সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে আল্লাহ তাঁকে (অর্থমন্ত্রী) সুযোগ দেবে কি না জানি না। কিন্তু যাদের আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেবে, তাঁরা যাতে নির্বাচন করতে পারে সেটা খেয়াল করতে হবে।’

আবুল কালাম ব্যাংক হিসাবে বাড়তি আবগারি শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি করে বলেন, এমনিতে সুদ কম। এর ওপর শুল্ক বাড়ালে তা হবে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। সুদ এমনিতেই কম। সঞ্চয়পত্রে সুদের হার না কমানোর দাবি জানিয়ে আবুল কালাম বলেন, ১০ শতাংশ বাড়ালে খরচ হবে এক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু উপকার পাবে লাখ লাখ মানুষ। এটা সিনিয়র সিটিজেনরা পান। তাঁরা কোথাও হাত পাততে পারে না। অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ঋণ খেলাপিদের বিশাল লিস্ট দিছেন। কই তাদের তো ধরতে পারেন না। ব্যাংকের টাকা পাচার বন্ধ করতে পারছেন না। আর নিম্নমধ্যবিত্তের ওপর কর চাপিয়ে দিচ্ছেন।’

এদিকে আবগারি শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তে অর্থমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা করে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে বাবলু বলেন, ট্যাক্স পেয়ারের দুই হাজার কোটি টাকা উনি ব্যাংকিং খাতের ঘাটতি পূরণে দিচ্ছেন। মানুষের টাকা দিয়ে লুটপাটের টাকা পূরণ করছেন। এটা কোনো নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। এটা অনৈতিক কাজ। উনি নৈতিকতা ও আইনবিরোধী প্রস্তাব কীভাবে করেন? লুটের টাকার ঘাটতি’ পূরণে করদাতাদের দেওয়া অর্থ খরচের অধিকার অর্থমন্ত্রীর নেই মন্তব্য করে বাবলু বলেন, “এর জন্য তো উনাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। অর্থমন্ত্রীকে এ জন্য আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। উনার বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল চার্জ আনা উচিত বলে আমি মনে করি।

অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে বিরোধী দলের এই সংসদ সদস্য বলেন, আপনি বিদায় নিন। পদত্যাগ করুন। সম্মানের সাথে বিদায় নিন। আপনার অনেক বয়স হয়েছে। আপনাকে সম্মান করি। বিদায় নিয়ে ষোল কোটি মানুষকে মুক্তি দিন।