ক্যাপ্টেন তানভীর ছালাম শান্ত পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালীশুরী ইউনিয়নের সিংরাকাঠী গ্রামের মোল্লা বাড়ির মো. ছালাম মোল্লার একমাত্র ছেলে। আদরের নাতি শান্তর এই অকালমৃত্যু কোনোভাবেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না দাদা আজিজ মোল্লা (৮৩)।

বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে যখন তানভীরের দাফনের প্রস্তুতি চলছিল তা শুনেই বাউফল উপজেলার কালীশুরী ইউনিয়নের সিংরাকাঠী গ্রামের বাড়িতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন দাদা আজিজ মোল্লা।

খবরটা শুনে তিনি অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। তানভীরের মৃত্যুতে তাঁর দাদা শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। বারবার সবাইকে অনুরোধ করছিলেন ঢাকায় নিয়ে যেতে। শেষবারের মতো নাতিকে দেখতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত নাতির শোক সইতে না পেরে নিজেও ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল নয়টার দিকে তানভীরের দাদা মো. আবদুল আজিজ মোল্লা মারা যান। বারবার আহাজারি করে শুধু বলছিলেন, ‘তোরা আমাকে ঢাকায় নিয়ে চল। আমি আমার কলিজার টুকরা নাতিটাকে শেষ দেখা দেখব। আহাজারি করে বলছিলেন, আল্লাহ, তুমি আমার নাতিকে না নিয়ে আমাকে নিতে।’

‘তানভীরকে ঢাকায় দাফন করেছেন তাঁর স্বজনেরা। এখন তাঁরা আবার ছুটছেন তানভীরের দাদাকে দাফন করার জন্য। বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক।’বলে জানাচ্ছেন এলাকার মানুষেরা।

প্রবল বর্ষণে রাঙামাটিতে পাহাড়ধসের সময় উদ্ধারকাজ করতে গিয়ে গত মঙ্গলবার নিহত হয়েছেন তাঁর নাতি সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মো. তানভীর ছালাম ওরফে শান্ত। প্রিয় নাতির মৃত্যুর খবর পেয়ে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেলেন দাদা মো. আবদুল আজিজ মোল্লা (৯০)।

ফাইল ফটোতে দাদার সাথে তানভীর
নিহত তানভীরের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালিশুরি ইউনিয়নের সিংহেরাকাঠি গ্রামে।

আজ বেলা ১১টার দিকে সিংহেরাকাঠি গ্রামের ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে শত শত মানুষ সেখানে উপস্থিত। বাড়ির ভেতর থেকে আসছে কান্নার আওয়াজ। সব স্বজন ঢাকায় গেছেন তানভীরকে শেষ বিদায় জানাতে। আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বনানীর সামরিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে। প্রিয় নাতির দাফনের আগেই মারা গেলেন দাদা।

তানভীরের বাবা আবদুস ছালাম মোল্লা বলেন, ‘সুখের সংসার বলতে যা বোঝায়, এর সবই ছিল আমার সংসারে। একমাত্র আদরের ছেলেকে হারালাম। সেই শোকে বাবাও চলে গেলেন। এই শোক কেমন করে সহ্য করব।’ এ কথাগুলো বলতে বলতে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন।

তানভীরের ছোট চাচা মোজাম্মেল হক বলেন, ‘সবার আদরের ছেলে তানভীরের আকস্মিক মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে পুরো পরিবার। তানভীরের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া একমাত্র বোন সেতু নির্বাক হয়ে গেছে। আমার বাবার বয়স হলেও তিনি সুস্থ ছিলেন। তানভীরের মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পেরে আমার বাবাও মারা গেছেন। শোকে সবাই যেন এখন পাথর হয়ে গেছেন।’
তানভীরের ছোট চাচী ঝর্না বেগম জানান, তানভীরের মৃত্যু সংবাদ শোনার পড় থেকেই অস্থির হয়ে ওঠেন তিনি। তানভীরের মৃত্যুর খবর শুনে অনেকেই গ্রামের বাড়িতে আসছেন। তাদের সবার সাথে বারবার তানভীরের স্মৃতি বিজড়িত নানা কথা বলে চোখের পানি ফেলছিলেন তিনি।

এর আগে বুধবার বিকেলে নিহত ক্যাপ্টেন তানভীরের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা হয় তার সাথে। সেই সময়ে তিনি ঘরের সামনে বারান্দায় একা আপন মনে বসে ছিলেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তানভীরের নানা কথা বলে বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পরেন। আর বিছানার পাশে তানভীরের বিয়ের কার্ড খুঁজছিলেন।

তানভীরের চাচা মো. আবদুর রব রাকিব জানান, শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে বাউফলের কালিশুরী ইউনিয়নের সিংহেরা কাঠি গ্রামে তানভীরের তৈরি মসজিদে তার দাদার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে পিতা আর পুত্রকে হারিয়ে পুরোপুরি নির্বাক ইঞ্জিনিয়ার মো. ছালাম মোল্লা।

বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আজিজ মোল্লার চার ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। দুই মেয়ে ও ছোট ছেলে এলাকায় থাকেন। বাকি তিন মেয়ে ও তিন ছেলে পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন। বাড়িতে সবাই পৌঁছানোর পর কাল শুক্রবার তানভীরের দাদার দাফন হতে পারে।

উল্লেখ্য, গত ১৩ জুন মঙ্গলবার কয়েকদিনের প্রবল বৃষ্টিতে রাঙামাটিতে পাহাড় ধসে শতাধিক মানুষ নিহত হন। বন্ধ হয়ে যায় রাঙামাটির রাস্তাঘাট। আটকা পড়েন শতশত মানুষ। উদ্ধার করতে গিয়ে আবার পাহাড় থেকে মাটি ধসে পড়লে চাপা পড়েন সেনাসদস্যরা। আর এতে প্রাণ হারান মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, ক্যাপ্টেন তানভীরসহ ৫ সেনাসদস্য। এরা হলেন- করপোরাল মোহাম্মদ আজিজুল হক, সৈনিক মো. শাহিন আলম ও সৈনিক মো. আজিজুর রহমান।

তানভীর ২০০৯ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমীতে যোগদান করেন। ৬৪তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদী কোর্সের মাধ্যমে কমিশন লাভ করেন তিনি। পরে ক্যাপ্টেন পদমর্যাদায় পদোন্নতি পান। ২০১৬ সালে ২ সেপ্টম্বর জয়পুরহাট জেলার নাজিয়া সুলতানাকে বিয়ে করেন তিনি।