নিজের ভাগ্য বদলাতে ৩১১ বাংলাদেশী শ্রমিক পাড়ি দিয়েছিলেন সুদূর সৌদি আরবে। সেখানে অনেকটা কেনাবেচার মতোই তাদের অবৈধভাবে অন্য প্রতিষ্ঠানে ইজারা দিয়েছিল নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান।

ইজারা নেয়া প্রতিষ্ঠানে আবার নতুন করে লোক নেয়া হলে চাকরি হারান এরা সবাই। চাকরি হারানোর পর নিয়োগকারী মূল প্রতিষ্ঠানও তাদের কোনো দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানায়। কর্মহীনতার মধ্য দিয়েই এদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে ইকামা (রেসিডেন্ট পারমিট), পাসপোর্ট ও ভিসা নবায়নসহ অন্যান্য খরচ।

একটি বাড়িতে গাদাগাদি করে রাখা হয় সাড়ে তিনশর বেশি শ্রমিককে, যেখানে তাদের জন্য টয়লেট ছিল মাত্র তিনটি। অধিকাংশের বিরুদ্ধে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নানা অভিযোগ ইস্যু করে রাখায় তাদের এখন অন্যত্র কাজেরও কোনো সুযোগ নেই। স্থানীয় শ্রম আদালতে এ নিয়ে মামলা করা হলেও, নিয়োগকর্তা প্রতিষ্ঠানের অসহযোগিতায় এর কোনো নিষ্পত্তিও হচ্ছে না। এ অবস্থায় সৌদি আরবে অত্যন্ত মানবেতরভাবে দিনাতিপাত করছেন ৩১১ বাংলাদেশী শ্রমিক।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশী দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরবের মেসার্স আল নাদা ২০১০ সালে স্থানীয় আরেকটি প্রতিষ্ঠান ইনিশিয়ালের কাছে ৪৫০ জন বাংলাদেশী শ্রমিক ইজারা দেয়। এ ইজারা কার্যক্রম সম্পন্ন হয় আল নাদার বাংলাদেশী প্রজেক্ট সুপারভাইজার আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে। দৈনিক ১২ কর্মঘণ্টা কাজের বিনিময়ে ইনিশিয়ালে এসব কর্মীর মাসিক বেতন ধরা হয় পদক্রম অনুসারে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল। এর মধ্য থেকেও প্রতি বছর প্রত্যেক কর্মীর কাছ থেকে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ইকামা নবায়ন বাবদ ৮৫০ রিয়াল, পাসপোর্ট নবায়ন বাবদ ৩০০, ছুটির টিকিট ও ভিসা বাবদ ৩ হাজার ২০০ এবং ফাইনাল এক্সিট বাবদ ২ হাজার ১০০ রিয়াল করে আদায় করতেন আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী।

গত বছরের জুলাইয়ে নিজস্ব শ্রমশক্তি আমদানি শুরু করে ইনিশিয়াল। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল নাদা কোম্পানির কাছ থেকে ইজারা নেয়া সব কর্মীকে ছাঁটাই করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। চাকরি হারিয়ে শুরু হয় শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপন। চাকরি হারানো কর্মীদের কোনো দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানায় আল নাদা। এর পর থেকে স্থানীয় বাংলাদেশী কনস্যুলেটের অদূরে নাজলা এলাকায় একটি ছোট্ট ভিলায় গাদাগাদি করে থাকতে দেয়া হয় ৩৬৭ শ্রমিককে। শেষ পর্যন্ত এ পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে কাজ, বেতন, খাবার, উপযুক্ত আবাসন, পানি ও বিদ্যুত্ সরবরাহের আবেদন জানিয়ে স্থানীয় বাংলাদেশ কনস্যুলেটে যোগাযোগ করেন শ্রমিকরা।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৫ আগস্ট জেদ্দার লেবার কোর্টে একটি মামলা করে বাংলাদেশ কনস্যুলেট। এর পর সেখান থেকে কয়েকজন বাংলাদেশী শ্রমিককে আটক করে দেশে পাঠিয়ে দেয় সৌদি পুলিশ। বর্তমানে চারটি গ্রুপে মোট ৩১১ জন কর্মীর মামলা জেদ্দা লেবার কোর্টে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ নিয়ে এরই মধ্যে পাঁচটি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতার কারণে এখনো চূড়ান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। সর্বশেষ গত ৪ মে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে কাউন্সেলর মো. আলতাফ হোসেন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এসব কর্মীর দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনার জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়।

ভুক্তভোগী শ্রমিকদের দুর্ভোগের বিষয়ে কাউন্সেলর মো. আলতাফ হোসেন তার চিঠিতে বলেন, ‘অসহায় কর্মীরা বেকারত্বের কারণে বেতন, খাবার, পানি, বিদ্যুত্ সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে গত জুলাই থেকে আজ অবধি মানবেতর জীবন অতিবাহিত করছে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে লেবার কোর্টসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অব্যাহতভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে কনস্যুলেটের সহায়তায় একটি কোম্পানিতে ৬০ জন কর্মীর সাময়িক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কর্মীরা যাতে স্বেচ্ছায় অন্যত্র ট্রান্সফার হতে না পারেন, সেজন্য নিয়োগকর্তা অধিকাংশ কর্মীর বিরুদ্ধে ‘পলায়ন করা বা হুরুব’-এর অভিযোগ এবং ‘ফাইনাল এক্সিট’ ইস্যু করে রেখেছে। বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল ও জেদ্দার বাংলাদেশী কমিউনিটির সহায়তায় এসব অসহায় শ্রমিকের জন্য খাবার, বিদ্যুত্ ও বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।’ সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মিশন ও কল্যাণ) মোহাম্মদ আজহারুল হকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সৌদি আরব সফরকালে এসব শ্রমিকের আশ্রয় নেয়া ভিলাটি পরিদর্শন করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আল নাদার সদর দপ্তর জেদ্দা থেকে ৮০০ কিলোমিটার দূরে আসির প্রদেশের আবহা শহরে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটির মালিক একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালু রয়েছে প্রায় ২০ বছর ধরে। প্রতিষ্ঠানটি মূলত সৌদি আরবের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থায় শ্রমিক সরবরাহের কাজ করে থাকে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও শ্রমিক নির্যাতনের কারণে আল নাদা স্থানীয় পর্যায়ে এরই মধ্যে বেশ কুখ্যাতি অর্জন করে নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট জনশক্তির ৯৫ শতাংশই বাংলাদেশী।

জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্র জানায়, মালিকের অনৈতিক কর্মকাণ্ড, শ্রমিক নির্যাতন ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানবাধিকার লংঘনের কারণে সৌদি আরবের অন্যতম খারাপ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত আল নাদা। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সাধারণ শ্রমিকদের বেতন দিত মাত্র ৩০০ সৌদি রিয়াল করে। এছাড়া শ্রমিকদের কাছ থেকে ইকামা বাবদ বছরে ৮৫০ রিয়াল আদায় করত। শ্রমিকদের ছুটি ভাতা, উড়োজাহাজের টিকিট দেয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা কখনই দেয়া হয়নি। নিজের স্বল্প বেতন থেকেই খাবার নির্বাহ করতে হতো কর্মীদের। এছাড়া তাদের পানি, বিদ্যুত্ ও অন্যান্য খরচের ব্যয়ভারও এ মজুরি থেকেই বহন করতে হতো। উপরন্তু কোম্পানির কোনো গাড়ি নষ্ট হলে, তার মেরামত খরচও কর্মীদের দিতে বাধ্য করা হতো। এমনকি কোনো শ্রমিক মৃত্যুবরণ করলে সহকর্মীদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে তার মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হতো।

এছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে ছুটিছাঁটা বলেও কোনো বিষয় নেই। পাঁচ-ছয় বছর ধরে কাজ করার পর অনেক চেষ্টায় প্রজেক্ট সুপারভাইজারকে ঘুষ দেয়া ছাড়া তাদের ভাগ্যে কোনো ছুটি জুটত না। কালেভদ্রে কেউ ছুটি পেয়ে গেলেও, তার ফেরত আসার নিশ্চয়তা হিসেবে অন্তত তিনজন সহকর্মীকে লিখিত জামিন নিতে বাধ্য করা হতো। কর্মীদের আবাসন ব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। ৩০০ জন শ্রমিকের একটি ভিলায় টয়লেট মাত্র তিনটি। আর এ অনৈতিক শ্রমশোষণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হতো বাংলাদেশী সুপারভাইজার আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরীর মাধ্যমে।

দূতাবাস সূত্র জানায়, আল নাদার বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকেই শ্রমিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। ২০০৮ সালে কর্মীদের শ্রমাধিকার হরণ ও বিভিন্ন সমস্যার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আবহায় কোম্পানির সদর দপ্তর ও শ্রমিকদের ভিলা পরিদর্শন করে বাংলাদেশ কনস্যুলেট। পরিদর্শনে এসব সমস্যার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। এর পর বিষয়টি কোম্পানির মালিককে মৌখিকভাবে অবহিত করে কনস্যুলেট। একই সঙ্গে কর্মীদের শ্রমাধিকার নিশ্চিতের অনুরোধ জানিয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি নোট ভারবালও পাঠানো হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সে সময় আল নাদার মালিক সৌদি পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্থানীয় বাংলাদেশী কনস্যুলেটের বিরুদ্ধে কোম্পানির শ্রমিক ভিলায় হামলার অভিযোগ করে। পরবর্তীতে কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে এক নোট ভারবালের মাধ্যমে এ মিথ্যা অভিযোগের জবাব দেয়া হয়। বিষয়টিকে আমলে নিয়ে সৌদি সরকার সবগুলো সরকারি প্রকল্পে আল নাদার কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়। ওই বছরই প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে নতুন ভিসা ইস্যুও বন্ধ করা হয়।

শ্রমিকদের অন্য প্রতিষ্ঠানে ইজারা দেয়ার বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দলের এক সদস্য বলেন, এভাবে শ্রমিকদের ইজারা দেয়ার কোনো বৈধতাই নেই। বাংলাদেশ দূতাবাসই এর অনুমতি দেবে না। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ওই সময় আল নাদায় কোনো কাজ ছিল না। এর পরও আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী নামে এক বাংলাদেশীর সহায়তায় কোম্পানিতে কয়েকশ বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়, যারা মোটা অংকের টাকা খরচ করে সৌদি আরব গেছেন। কিন্তু এখন সেখানে কোনো কাজ না থাকায় তারা অসহায় হয়ে পড়েছেন। তাদের নামে মামলা থাকায় অন্য কোনো কোম্পানিতেও কাজের সুযোগ করা যাচ্ছে না। আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী নামে ওই বাংলাদেশী এখন দেশেই পলাতক রয়েছে। তাকে খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।