হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও গত সাড়ে ৪ বছরে কারাগারে এক দিনও জরুরি ওষুধ পাননি বাবা-মা খুনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ঐশী রহমান।

আদালতের নির্দেশে গঠিত মেডিকেল বোর্ড ঐশীকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাতে এবং ওষুধ খাওয়াতে বলেন। যা এক দিনের জন্যও পালন করেনি কারা কর্তৃপক্ষ। তবে কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখানো কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ খাওয়ানোর জন্য হাইকোর্টের কোনো নির্দেশনা তারা পাননি। এদিকে খুনের ঘটনার সময় ঐশী অপ্রাপ্তবয়স্ক হলেও তাকে জালিয়াতি করে প্রাপ্তবয়স্ক দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ ঐশীর আইনজীবীর। 

জানতে চাইলে ঐশীর আইনজীবী সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী যুগান্তরকে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মেডিকেল বোর্ড ঐশীর মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি হাইকোর্টকে জানান, ঐশীকে সাইকো থেরাপি দিতে হবে এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে- যে নির্দেশ ফলো করেনি কারা কর্তৃপক্ষ। ‘মিটাজিপিন ১৫ এমজি’ নামের একটা ওষুধ তাকে খাওয়ার জন্য প্রেসক্রাইব করা হলেও ওই ট্যাবলেট এক দিনও ঐশীকে খাওয়ানো হয়নি। কারাগারের ভেতরে কিংবা বাইরে এনে এক দিনও ঐশীকে মনোবিজ্ঞানী দেখানো হয়েছে- এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, আমাদের আইনে আছে, একজন মানসিক রোগী কিংবা অসুস্থ লোকের বিচার করা যাবে না। সে ক্ষেত্রে ঐশীকে প্রথমে সুস্থ করে তারপর বিচার কাম্য। কিন্তু তার সেই চিকিৎসা হয়নি। এছাড়া ডাক্তার রিপোর্ট দিয়েছেন, সে অ্যাজমার রোগী। হত্যাকাণ্ডের পরপরই তার বাড়ি থেকে একাধিক ইনহেলার জব্দ করা হয়। এ বছরের ১০ এপ্রিল ঐশীর মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে দুই বিচারপতি তাকে আদালতে আনেন। সেদিনও তিনি ইনহেলার নিয়ে এসেছেন। বিচারপতি জিজ্ঞাসা করলে ঐশী বলেছেন, হাতে ইনহেলার।
ঐশীর চিকিৎসা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাশিমপুর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহজাহান আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, হাইকোর্টের ‘চিকিৎসা প্রদান করতে হবে’ মর্মে কোনো নির্দেশনা আমরা পাইনি। আর এমনিতে তার (ঐশী) তেমন কোনো সমস্যা নেই। গুরুতর কোনো অসুখের সিম্পটম এখানে এসে ধরা পড়েনি। হাজতবাসকালীন কোনো চিকিৎসা দেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঐশীর আগে থেকেই অ্যাজমা আছে। সে ইনহেলার ব্যবহার করে।
ঐশীর আইনজীবী আরও বলেন, ঐশীর আপন দাদি ও আপন মামা পাগল। ঐশী তিন বার আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল। একবার গলায় দড়ি নিতে গিয়ে দড়ি ছিঁড়ে পড়ে যায়। একবার ৪০টা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ও আরেকবার তেলাপোকা মারার ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। দু’বারই হাতপাতালে নিয়ে তাকে সেভ করা হয়। এছাড়া ঐশীর কাছে দুই বিচারপতি জানতে চেয়েছিলেন- তোমার কি করতে ইচ্ছে করে। ঐশী বলেছিল, আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করে। এমতাবস্থায় তার চিকিৎসা করানোটা জরুরি ছিল। ঘটনার সময়ও সে মানসিকভাবে সুস্থ ছিল না।
সুজিত চ্যাটার্জি বলেন, ঐশী অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাকে প্রাপ্তবয়স্ক দেখাতে যারা চেষ্টা করেছেন, তারা আদালতে সাক্ষ্য দেননি। বিদ্যালয়ে ঐশীর বাবার দাখিল করা জন্মসনদ অনুসারে ঘটনার সময় ঐশী বয়স ছিল ১৬ বছর। অর্থাৎ সে অপ্রাপ্তবয়স্ক। আর পুলিশ খুলনার পুরাতন অস্তিত্ববিহীন একটি ক্লিনিক থেকে সংগ্রহ করা জন্মসনদ দিয়ে বলেছে ঐশী সাবালিকা। তিনি বলেন, জরুরি চিকিৎসা না পাওয়া এবং নাবালিকাকে জালিয়াতি করে সাবালিকা বানানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে ঐশীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব। হাইকোর্ট বিভাগ যে বিষয়গুলো আলোচনায় এনেছেন, সে বিষয়গুলোতে আমরা আরও প্রতিকার পেতে পারি। যদি ঘটনার সময় ঐশী মানসিকভাবে সুস্থ না- এ পর্যবেক্ষণ যদি হাইকোর্ট দেন, তাহলে তো হত্যার জন্য তাকে দায়ী করতে পারেন না। আর তার বয়স ঠিকমতো নির্ধারণ হয়নি। যদি তার বয়স ঘটনার সময় ১৬ হয় তাহলে তার বিচার হবে শিশু আদালতে। সেখানে ১০ বছরের উপর শাস্তির বিধান নেই। এ জালিয়াতি হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি মেডিকেল বোর্ড রিপোর্টে, যেখানে দেখানো হয়েছে তার (ঐশীর) বয়স ১৯ বছর। যারা রিপোর্টটি দিয়েছেন আইন অনুসারে তাদের আদালতে সাক্ষ্য দিতে হবে কিভাবে তিনি বয়স নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু কেউ সাক্ষ্য দেননি এবং সরকারপক্ষ এর যুক্তিসঙ্গত কোনো ব্যাখ্যাও দেয়নি।
ঐশীর আইনজীবী আরও বলেন, এ মামলার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ঐশীর ভাই ওহি। সেও সাক্ষ্য দেয়নি। ঐশীর নিজেরও যে স্বীকারোক্তি, আমরা মনে করি, কোর্ট তা বিবেচনায় নেয়নি। ওহি পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিলেও তাকে কোর্টে উপস্থাপন করা হয়নি। ঐশীর জবানবন্দি অনুসারে, মাকে হত্যার সময় বাধা দেয় ওহি। এতে ওহিকে বাথরুমে আটকে রাখে ঐশী। সে ক্ষেত্রে ওহি এ ঘটনা দেখেছে। আর শুরুতেই বলেছি, এতটুকু বাচ্চা মেয়ের একার পক্ষে খুন করা সম্ভব নয়। হয়তো অন্য কেউ ছিল।
এদিকে একটি সংস্থার পক্ষ থেকে ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর হাইকোর্টে রিট পিটিশন (নম্বর ৯০৯৪/১৩) করা হয়। সেখানে বলা হয়, ঐশীর মানসিক অবস্থা ও শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করানো হোক। এ রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ মেডিকেল বোর্ড গঠনের আদেশ দেন। সোমবার হাইকোর্ট রাজধানীর চামেলীবাগে স্ত্রীসহ পুলিশ পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের দেয়া তাদের মেয়ে ঐশী রহমানের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন। একই সঙ্গে ঐশীকে পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ডও দেয়া হয়। ২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানীর মালিবাগের চামেলীবাগের বাসা থেকে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (পলিটিক্যাল শাখা) ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন তাদের মেয়ে ঐশী রহমান গৃহকর্মী সুমীকে নিয়ে রমনা থানায় আত্মসমর্পণ করে। ২০১৪ সালের ৯ মার্চ ঐশীসহ ৪ জনকে অভিযুক্ত করে পৃথক দুটি চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে পুলিশ। গত বছরের ৬ মে ঐশীসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত। দুটি খুনের জন্য পৃথক দুটি চার্জ গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর ঐশীকে মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার তিন নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। দুটি অপরাধের জন্য আলাদা করে ঐশীকে দু’বার ফাঁসি ও দু’বারে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। মামলার অন্য আসামি ঐশীর বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে খুনের ঘটনার পর ঐশীকে আশ্রয় দেয়ার অপরাধে ২ বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।