চাকরি হারালে, লে-অফ বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও বীমার টাকা পাবেন প্রবাসী শ্রমিকরা। এছাড়া বিদেশ যাত্রার সময় থেকে পরবর্তী এক মাসের জন্য কর্মীরা স্বাস্থ্য বীমা সুবিধা পাবেন।
প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশীদের বীমা সুবিধা-সংক্রান্ত খসড়া নীতিমালায় এ বিধান রাখা হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। চলতি বছরই এ নীতিমালা চূড়ান্ত হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
খসড়া নীতিমালায় প্রবাসী কর্মীদের বীমার আওতায় আনতে বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য বেশকিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করা রয়েছে। প্রবাসীদের বীমাসেবা দিতে আগ্রহী বীমা কোম্পানিকে অবশ্যই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির শর্ত পূরণ করতে হবে। এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠানের পূর্ববর্তী পাঁচ বছরের ক্রেডিট রেটিং ভালো, লাইফ ফান্ড ও মোট সম্পদের পরিমাণ সন্তোষজনক, যথেষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগ ও নগদ তহবিল আছে, গত তিন বছর যেসব প্রতিষ্ঠান সন্তোষজনক লভ্যাংশ ও পলিসি বোনাস দিয়েছে, আর্থিকভাবে সক্ষম সেসব বীমা প্রতিষ্ঠানই প্রবাসী কর্মীদের বীমাসেবা দিতে পারবে।
জানা যায়, খসড়া প্রবিধানে বীমার সর্বোচ্চ অংক ৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) অধিভুক্ত কমিটি সিআরসি প্রিমিয়াম হার নির্ধারণ করবে। এককালীন সর্বনিম্ন বীমা অংকের ওপর শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ হারে প্রিমিয়াম পরিশোধ করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের ভ্যাট ও কর যোগ করতে হবে।
খসড়া নীতিমালায় প্রবাসী কর্মীদের বীমার মেয়াদ প্রচলিত আইনে এক বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুই বছর পর্যন্ত সময় বাড়ানো যেতে পারে। সেক্ষেত্রে নবায়ন প্রিমিয়াম প্রযোজ্য হবে না। এছাড়া বীমা গ্রাহকের বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ থেকে ৫৮ বছর পর্যন্ত।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় বীমা দাবি না পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশকিছু কারণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রবাসী কর্মী নিজের ইচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিলে অথবা শারীরিক অক্ষমতা ও স্বাস্থ্যগত কারণে চাকরি থেকে অব্যাহতি পেলে বীমা দাবি পাবেন না। এছাড়া নিজের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে চাকরি হারালে বা প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও তিনি প্রাপ্য বীমা দাবি থেকে বঞ্চিত হবেন।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রবাসী শ্রমিক কর্মরত প্রতিষ্ঠান থেকে স্বাভাবিক নিয়মে চাকরি হারালে বা ওই প্রতিষ্ঠান লে-অফ কিংবা বন্ধ হয়ে গেলেও বীমার টাকা পাবেন। পাশাপাশি বীমা চালাকালে কোনো গ্রাহক মৃত্যুবরণ করলে সেক্ষেত্রে বীমা অংকের শতভাগ পরিশোধ করা হবে। এছাড়া অঙ্গহানির ক্ষেত্রেও শতভাগ দাবি পরিশোধের বিধান রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বিদেশগামী ও প্রবাসী শ্রমিকদের শতভাগ বীমার আওতায় আনতে খসড়া নীতিমালা তৈরির জন্য চলতি বছরের জানুয়ারিতে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়। এ উপকমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে ছিলেন আইডিআরএর এক সদস্য। উপকমিটির সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) মনোনীত প্রতিনিধিরা। এছাড়া প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দুজন উপসচিবও এ উপকমিটিতে রয়েছেন।
এর আগে ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো প্রবাসী বীমা অনুমোদনের উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু প্রক্রিয়াগত জটিলতাসহ কয়েকটি কারণে দীর্ঘদিন ধরে এ উদ্যোগ আটকে থাকে। ওই সময় এ-সংক্রান্ত একটি খসড়া নীতিমালাও তৈরি হয়েছিল। খসড়া নীতিমালায় এ বীমার আওতায় বীমাগ্রহীতার সন্তানের জন্য শিক্ষাবৃত্তি, বিদেশে মৃত্যুবরণকারী শ্রমিকের মরদেহ ফিরিয়ে আনা ও সমাহিত করা ছাড়াও পরিবারকে অর্থসহায়তা দেয়ার নিয়ম রাখা হয়। বীমার মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় এক বছর, তবে তা নবায়নযোগ্য। প্রবাসী কর্মীর চাকরির সময় বাড়ানো হলে নতুন করে আরেকটি বীমা করা ও এককালীন প্রিমিয়াম পরিশোধের নিয়মও রাখা হয়েছিল ওই খসড়া নীতিমালায়।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩১ জন বাংলাদেশীর কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০১৫ সালে বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছিল ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮১ জন বাংলাদেশীর। সে হিসাবে গত বছর চাকরি নিয়ে বিদেশ গমন বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৩১ শতাংশ।
২০১৬ সালে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি নারী কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে। গত বছর ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮ জন নারীকর্মী চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৭১৮। ২০১৬ সালে ওমানে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৪৭ জন কর্মী গেছেন। প্রবাসী বাংলাদেশীর কর্মসংস্থানে ওমানের পরই রয়েছে সৌদি আরব। গত বছর ১ লাখ ৪৩ হাজার ৯১৩ জন কর্মী চাকরি নিয়ে সৌদি আরবে গেছেন। এ বিষয়ে বিআইএর চেয়ারম্যান শেখ কবীর হোসেন বলেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও আইডিআরএ যৌথভাবে আমাদের মতামত নিয়ে নীতিমালাটি করেছে, যা শিগগিরই চূড়ান্ত হবে বলে জেনেছি।
তিনি বলেন, ভাগ্য ফেরানোর আশায় প্রবাসে যাওয়া শ্রমিকের অনেকেই ফেরেন লাশ হয়ে। এতে বিপদে পড়ে যায় তার পরিবার। এসব বিবেচনা থেকেই বিদেশগামী ও প্রবাসী সব শ্রমিককে শতভাগ বীমার আওতায় আনার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মূলত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী এ নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে।





