পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না রহমানকে হত্যার দায়ে মেয়ে ঐশী রহমানের শাস্তি কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে।
আজ সোমবার ঐশী রহমানের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ আজ এ রায় দেয়।
রায়ের শুরুতেই আদালত এ মামলার বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ দেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘এ মামলার আসামি ঐশী রহমানকে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। আমরা এ বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ প্রদান করব।’
পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ‘সভ্য দেশগুলো মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন করে না। দিনের পর দিন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সে হিসেবে মানুষ সভ্য হয়ে ওঠেনি। প্রাথমিক শিক্ষিত থেকে উচ্চশিক্ষিত সকল স্তরেই অপরাধের প্রবণতা বেড়ে গেছে। বিচার বাস্তবতায় আমাদের দেশের ফাঁসির দণ্ড বাতিল করার পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। আমাদের দেশ এখনো সভ্য দেশগুলোর মতো সেই পরিমাণ উন্নত হয়নি।’
আদালত আরো বলেন, ‘ঐশী রহমানের দণ্ড কমানোর জন্য তাঁর পক্ষের আইনজীবীরা বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষও নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরেছেন। সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেখা যায়, একজন সন্তান কর্তৃক পিতামাতা হত্যাকাণ্ড সামাজিক অবক্ষয় ছাড়া আর কিছু নয়। তবে ঐশী রহমানের মানসিক পরীক্ষা এবং ডাক্তারি সনেদের পরিপ্রেক্ষিতে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের সময় তাঁর বয়স ছিল ১৯ বছর।’
বিচারক পর্যবেক্ষণে আরো জানান, ‘ঐশীর মামা, দাদি এরা বংশগতভাবেই মানসিক রোগী ছিল। পরীক্ষাকালে জানা যায়, ১৪ বছর বয়স থেকেই ঐশী রহমান সিসা, অ্যালকোহল, গাঁজা এবং ইয়াবা সেবন করত। এ কারণে সে ছিল আশাহীন ও সাহায্যহীন। এবং আদালতের কাছে সে বলেছে, বাবা-মাকে হত্যার পর এ বিষয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই।’
এর আগে গত ৭ মে এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে ঐশী রহমানের করা আপিলের ওপর শুনানি নিয়ে রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেছিলেন আদালত।
এর আগে ঐশী রহমানকে ২০১৫ সালের ১৫ নভেম্বর দুবার মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আদালত। প্রত্যেক মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে ২০ হাজার টাকা করে মোট ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়, অনাদায়ে দুই বছর কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর অন্যটি সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে।
২০১৫ সালের ৬ ডিসেম্বর ২৫টি যুক্তি দেখিয়ে ঐশী রহমান রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন।
২০১৪ সালের ৯ মার্চ ঐশীকে প্রধান আসামি করে তিনজনের বিরুদ্ধে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক আবুল খায়ের।
পরে গত বছরের ৩০ নভেম্বর ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ বি এম সাজেদুর রহমান তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এ মামলায় বিভিন্ন সময়ে ৪৯ সাক্ষীর মধ্যে ৩৭ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন।
২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানীর মালিবাগের চামেলীবাগের বাসা থেকে পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না রহমানের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পরের দিন ১৭ আগস্ট নিহত মাহফুজুর রহমানের ছোট ভাই মো. মশিউর রহমান রুবেল পল্টন থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ওই দিনই পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করেন ঐশী।





