স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় গ্রাম্য সালিশে এক যুবককে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গ্রাম্য সালিশে হাজার হাজার লোকের উপস্থিতিতে ওই যুবককে জুতাপেটা করা হয়।
এ সময় সালিশ দেখতে স্কুলমাঠ লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। জায়গা না পেয়ে অনেকে আবার গাছ ও ভবনের ছাদে ওঠে।
ঘটনার বিবরনে প্রকাশ , নবম শ্রেণির এক ছাত্রী প্রতিদিন স্থানীয় একটি কোচিং সেন্টারে প্রাইভেট পড়তে যেত । গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় কোচিং সেন্টার থেকে বাড়ি ফিরছিল সে। ফেরার পথে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে মেয়েটি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। এ সময় একই গ্রামের আলম নামের এক যুবক মেয়েটিকে একা পেয়ে মুখ চেপে ধরে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। মেয়েটি নিজেকে রক্ষা করার জন্য আলমের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সে আলমের হাতে কামড় দিয়ে নিজেকে মুক্ত করে দৌড়ে বাড়িতে গিয়ে ওঠে।
বাসায় ফিরে মেয়েটি এ ঘটনা তার মাকে জানায়। মা বিষয়টি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য গোলজার হোসেনকে জানান। পরে তাঁর সহযোগিতায় আমিরগঞ্জ ফাঁড়িতে গিয়ে পুলিশকে ঘটনা জানানো হয়।
তৎক্ষণাৎ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হলেও এসআই আমিনুল হক আলমকে আটক না করে ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করার জন্য বাড়ির লোকজন ও ইউপি সদস্য গোলজার হোসেনকে ‘পরমর্শ’ দিয়ে আসেন।
এ ঘটনার পর মেয়েটির পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। এরপর এলাকাবাসী মিলে সিদ্ধান্ত নেয় নিজেরাই বিচার করবে এই ঘটনার।
এরই প্রেক্ষিতে গতকাল শনিবার বিকেলে রায়পুরার আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এই ব্যতিক্রমি সালিশ অনুষ্ঠিত হয়। ওই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন খান, ইউপি সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা মিলে এই সালিশ করেন।
সালিশ দেখতে স্কুলমাঠ লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। জায়গা না পেয়ে অনেকে আবার গাছ ও ভবনের ছাদে ওঠে।
আমিরগঞ্জ ইউপির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন বলেন, ‘মেয়েটির বাবা বর্তমানে বিদেশে রয়েছেন। বাড়ির কেউ মামলা করার সাহস পাচ্ছে না। তাই আমরা এলাকার ইউপি মেম্বার ও গণ্যমান্য ব্যক্তি নিয়ে সালিশের মাধ্যমে ঘটনার মীমাংসা করে দিয়েছি।’
সালিশে যুবক আলম ভূঁইয়াকে (২২) দুই লাখ টাকা ও জুতাপেটার শাস্তির রায় ঘোষণা করেন চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন। সবার সামনে আলমকে জুতা দিয়ে পিটিয়ে রায় বাস্তবায়ন করেন তাঁর বড় ভাই রাজু ভূঁইয়া। সালিশে জরিমানার টাকা বকেয়া রাখা হয়। এজন্য এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন জানান, আইনগতভাবে এই সালিশের কোনো ভিত্তি নেই। তবে নির্যাতিত স্কুলছাত্রী, তার পরিবারের লোকজন ও এলাকাবাসী সালিশের রায় মেনে নিয়েছেন। তাঁরা সালিশের বিচারকদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।
চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন বলেন, ছাত্রীটি নিজের দুঃসাহসিকতায় ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু পুলিশ বখাটের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা না নিয়ে রহস্যজনক কারণে মীমাংসা করার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে। এত বড় অপরাধ করেও যদি বখাটেরা পার পেয়ে যায় তাহলে আর কোনো মা-বাবা মেয়েদের স্কুলে পাঠাবে না।
থানায় অভিযোগ দিয়েও বিচার না পাওয়া প্রসঙ্গে মেয়েটির পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, আমিরগঞ্জ ফাঁড়িতে গিয়ে বিষয়টি জানানোর সময় আলমের বড় ভাই রাজু ভূঁইয়া ফোনে এসআই আমিনুল হকের সঙ্গে কথা বলেন। ওই ফোন পেয়ে স্কুলছাত্রীর মাকে ফাঁড়িতে রেখেই আমিনুল হক ঘটনা তদন্তে মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। সেখানে মেয়ের মুখ থেকে ঘটনা শোনেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই আমিনুল হক বলেন, ‘ওই ঘটনা তেমন কিছু না, আলম মেয়েটির মুখ চেপে ধরে ছিল, মেয়েটি ছুটে চলে গেছে। পরে আর কিছুই হয়নি।’





