২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য বিশাল ব্যয়ের ‘নির্বাচনী’ বাজেট আসছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, অভ্যন্তরীণ ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ধীরগতি, রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা, বিনিয়োগে মন্দা এ রকম বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে সরকার আগামী অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আয়ে থাকছে বড় ঘাটতি। প্রবৃদ্ধির হার নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গতিও ছিল মন্থর। এই অবস্থার মধ্যেও সরকার বিশাল অঙ্কের বাজেট দিয়ে আরও বড় চ্যালেঞ্জ নিচ্ছে।
‘উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের’ শিরোনামে আগামী বৃহস্পতিবার পহেলা জুন জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।বাজেটের সম্ভাব্য আকার হতে পারে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার বাড়ছে ৬৭ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে বৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৫১ শতাংশের বেশি। বাজেটের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব আয় ও ঘাটতির পরিমাণও বাড়ছে।
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে জনপ্রত্যাশা পূরণের চেষ্টাই থাকবে এ বাজেটে। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোসহ বেশকিছু জনবান্ধব উদ্যোগের ঘোষণা দেবেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট ঘোষণার আগে সব ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে নতুন ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আইন বাস্তবায়নের ইস্যুটি। ব্যবসায়ী ও অর্থমন্ত্রণালয়ের বিপরীতমুখী অবস্থান রয়েছে এ ইস্যুতে। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রীর দিকেই তাকিয়ে আছেন। এছাড়া ব্যাংকে আমানতে আবগারি শুল্ক প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার খবরটিও এখন আলোচনায়। ব্যাংকের সুদের হার কমে যাওয়ার পর নতুন করে আবগারি শুল্ক আরোপের খবরে উদ্বেগে ব্যাংকে আমানতকারীরা।
জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকার আগামী অর্থবছরটি পুরো পাবে। যে কারণে এ বাজেটেই সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের একটি বড় চাপ রয়েছে। এরপরের ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের অর্ধেক বাস্তবায়ন করতে পারবে সরকার। কেননা ২০১৮ সালের ডিসেম্বরেই জাতীয় নির্বাচন। ফলে ওই বাজেটে সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এ কারণে বাজেটে সরকার কোনো পক্ষের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক ও আইএফএফের নানা শর্তও নমনীয়ভাবে বিবেচনায় নিচ্ছে। আবার ভ্যাট আইনের মতো একটি কঠিন আইন বাস্তবায়নের আগে যথাসম্ভব ছাড় দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে সামাজিক উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার বাড়ানোর পরিকল্পনা নিচ্ছে। সরকারের অগ্রাধিকার পাওয়া প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দিকেও বেশি নজর রয়েছে। এসব মিলিয়ে আগামী বাজেটে সরকার একদিকে যেমন জনতুষ্টির চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ব্যবসায়ী, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে একটি আপসমূলক সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে।
বাজেটের সম্ভাব্য আকার হতে পারে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার বাড়ছে ৬৭ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা।বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও ঋণ পরিশোধে বরাদ্দ রাখা হবে ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ভর্তুকি বাবদ থাকছে ৯ হাজার কোটি টাকা। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দরপতন এবং সরকার কয়েক দফায় গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে নতুন অর্থবছরে ভর্তুকির পেছনে সরকারের অর্থ খরচ কম হবে।
প্রবৃদ্ধির হার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ৭ দশমিক ৪ শতাংশের লক্ষ্য থাকছে বাজেটে। সাময়িক হিসাবে চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছর লক্ষ্য ছাড়িয়ে ৭ দশমিক ২৪ ভাগ হয়েছে প্রবৃদ্ধি। আসছে বাজেটে বৈদেশিক ঋণ এবং অনুদানের ওপর থেকে নির্ভরতা কমাতে অভ্যন্তরীণ আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ থাকবে। সঞ্চয় উত্সাহিত এবং পেনশনারদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আপাতত সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানো হচ্ছে না। তবে বাজেটের পরে কমানোর ঘোষণা আসবে। জিনিসপত্রের দাম সহনীয় রাখতে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা হবে।
এডিপির আকার ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা
আসছে নতুন অর্থবছরে মেগা প্রকল্পগুলো দৃশ্যমান হওয়া শুরু করবে। এ জন্য জাতীয় অগ্রাধিকার বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রেখে নতুন অর্থবছরের এডিপির আকার চূড়ান্ত করা হয়েছে। অগ্রাধিকার ফাস্ট ট্র্যাকের প্রকল্প সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এবারের বাজেটে। এজন্য চলমান আট মেগা প্রকল্পে ৩৩ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এডিপির আকার অনুমোদন হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৪ কোটি টাকা যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৩৮ দশমিক ৫১ ভাগ বেশি। পদ্মা সেতু, পদ্মা সেতুর রেল সংযোগসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকছে পরিবহন খাতে। সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া খাতগুলোর মধ্যে পরিবহন খাতে ৪১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ২৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। বিদ্যুত্ খাতে ১৮ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা (১২.৩০%), শিক্ষা ও ধর্ম খাতে ১৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা (১০.৮৭%), ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ণ খাতে ১৪ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা (৯.৭৫%), বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে ১৪ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা (৯.৪২%), পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী প্রতিষ্ঠান খাতে ১৩ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা (৮.৫৮%), স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ খাতে ১০ হাজার ২০১ কোটি টাকা (৬. ৬৫%) এবং কৃষি খাতে ৬ হাজার ৬ কোটি টাকা (৩.৯২%) রয়েছে। নতুন অর্থবছরে এডিপিতে সব মিলিয়ে প্রকল্প সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৩১১টি।
ঘাটতি বাড়ছে
নতুন বাজেট ঘাটতি হবে মোট দেশজ উত্পাদনের (ডিজিপি) ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে বাজেটে ঘাটতি রয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। আগামী বছর তা ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
সামাজিক নিরাপত্তা বলয় বাড়ানো হবে
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দও বাড়ছে। মাসিক ভাতার পরিমাণ একশ’ থেকে দুইশ’ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। সেই সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের বছরে দুটি উত্সব ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসছে বাজেটে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে।




